একলা বলো রে

English   |   Bangla

কোন সাতটি কারণে কলকাতার হলুদ অ্যাম্বাসাডরকে ট্যাক্সি হিসাবে পছন্দ-অপছন্দ দুই-ই করি

জটায়ুর সবুজ অ্যাম্বাসাডর চাপতেন ফেলুদা, 'কাহানি'র বিদ্যাও হলুদ ট্যাক্সিতে শহর ঘুরেছেন

 |  6-minute read |   04-12-2018
  • Total Shares

জোর তর্ক চলতেই পারে। সুন্দরবনের ডোরাকাটা বাঘ, নাকি কলকাতার হলুদের উপর নীল দাগ দেওয়া অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি - কোনটা আগে বিলুপ্ত হবে।

এক বন্ধু একদিন মজা করে বলেছিল, "কলকাতার হলুদ ট্যাক্সির অবস্থা অনেকটা সাঁতরাগাছি ঝিলের পরিযায়ী পাখিদের মতো। লোকে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকে। অথচ তাদের সংখ্যা দিনকে দিন কমছে।" মন্তব্য শুনে পক্ষী বিশারদ যারপরনাই ক্ষুদ্ধ, "কে বলল পরিযায়ীদের সংখ্যা কমছে। কমছে না বাড়ছে তা ঠিক করবে কে? কোনও দিনও গণনা করে নির্দিষ্ট কোনও সংখ্যা ঠিক করা হয়নি। যার উপর নির্ণয় করে ভবিষ্যতে ঠিক করা যাবে সংখ্যা বাড়ল না কমল।"

ট্যাক্সির ক্ষেত্রে সেই সমস্যা নেই। বছর পাঁচেক আগেও কলকাতা ও শহরতলিতে হলুদ অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সির সংখ্যা ছিল তিরিশ হাজারের উপরে। ট্যাক্সি সংগঠনগুলোর দাবি বর্তমানে সেই সংখ্যা কুড়ি হাজারেরও নীচে। এই সংখ্যা দিনকে দিন যে ভাবে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে তাতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই শহরের রাজপথ থেকে অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি বিলুপ্ত হবে।

অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সির সঙ্গে কলকতার নাড়ির টান। অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি ঘিরেই শহরবাসীর ভালোবাসা, শহরবাসীর নস্টালজিয়া। কিন্তু এর পরেও এই ট্যাক্সি হারিয়ে যাচ্ছে কেন?

আসুন দেখে নেওয়া যাক, অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সির প্রতি আমাদের পছন্দ ও অপছন্দের কারণগুলি।

প্রথমে আসি পছন্দের কারণগুলোতে।

ঐতহ্যশালী অ্যাম্বাসাডর

বাঙালির প্রিয় গোয়েন্দা লালবাজারের গোয়েন্দা দপ্তরে চাকরি করেন না। তাঁর নাম প্রদোষচন্দ্র মিত্র। বাঙালি অবশ্য তাঁকে ফেলুদা নামেই ডাকতে পছন্দ করেন। তা, সেই ফেলুদা, শহরের ঘটে যাওয়া লোহমর্ষক মামলাগুলো কিন্তু অ্যাম্বাসাডরে চেপেই সমাধান করতেন। বন্ধু তথা বিশিষ্ট রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস লেখক লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ুর অ্যাম্বাসাডরে। সবুজ রঙের সেই অ্যাম্বাসাডরের হর্ন জাপানি। ফেলুদার ভাষায়, 'হাড় কাঁপানি', 'কান জ্বালানি'।

সবুজ না হয়ে হোক না হলুদ রঙের। হর্নটা নাইবা বা জাপানি হল। শহরের মিটার ট্যাক্সির সিংহভাগই তো অ্যাম্বাসাডর। তাই তাদের জৌলুসই আলাদা।

ভুলে যাবেন না যে শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বলিউডের সিনেমাতেও এই হলুদ অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সির বিপুল উপস্থিতি। 'কাহানি'-র বিদ্যা বালান যখন এই শহরে পা দিলেন তখন বিমানবন্দর থেকে শরৎ বোস রোডের গেস্ট হাউসে অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি চেপেই এসেছিলেন।

দেশের প্রথম 'মেড ইন ইন্ডিয়া' অটোমোবাইল পণ্য। 'মেক ইন বেঙ্গল' ও বলা যেতে পারে। অ্যাম্বাসাডরের কারখানা তো এই বাংলার হুগলি জেলার উত্তরপাড়ার হিন্দ মোটরে। আবেগপ্রবণ বাঙালির 'সেন্টু' তো থাকবেই।

ভারতের গাড়ি ভারতেরই জন্য

ওলা উবেরে কোন কোন মডেলের গাড়ি চলে? উত্তর একটাই। যে কোনও মডেলেরই। মারুতির সুইফট ডিজাইয়ার থেকে শেভ্রোলে - কোনও কিছুই বাদ যায় না।

সেদিক থেকে শহরের মিটার ট্যাক্সির অধিকাংশই অ্যাম্বাসাডর। এদের মধ্যে সিংহভাগ হলুদ। কিন্তু আবার সাদার উপর নীল দাগ দেওয়া অ্যাম্বাসাডরও রয়েছে। আর, ভারতীয় রাস্তার জন্য অ্যাম্বাসাডরের থেকে উপযুক্ত গাড়ি পাওয়া দায়। তা সে যতই নামী দামি বিদেশী অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো এ দেশে শোরুম খুলুক না কেন।

বর্ষা নামার মুখে পুরসভা রাস্তা খুঁড়েছে। পরিণাম কী হতে পারে তা শহরবাসী মাত্রই জানেন। কুছ পরোয়া নেহি! মোদের অ্যাম্বাসাডর রয়েছে।

body1_120418032951.jpgকলকাতার অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি সাবলীল প্রবেশ বলিউডেও [ছবি: এ এফপি]

সারচার্জ নেই

ওলা উবেরের ভাড়া ক'প্রকার? ভবিষ্যতে যদি বাচ্ছাদের সাধারণ জ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এই প্রশ্নটি আসে তাহলে আমি কিন্তু অবাক হব না।

ভাড়ার কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। যাদবপুর টু ধর্মতলার ভাড়া কোনও দিন ১২০ টাকা তো পরের দিন ২৪০ টাকা। নসিব ভালো থাকলে তার পরেরদিন মাত্র ১০০ টাকাতেও আপনি যাদবপুর থেজে ধর্মতলা পৌঁছেয়ে যেতে পারেন। কোনও সভ্য দেশে এই নিয়ম থাকতে পারে না। যেখানে একই পরিষেবার জন্য একেক দিন একেক রকমের টাকা চাওয়া হচ্ছে। আর কোনও কারণ ছাড়াই।

এবার আসুন ভর সন্ধ্যাবেলায়। হয়তো ধর্মতলায় অফিস সেরে আপনি যাদবপুরে নিজের বাড়ি ফিরছেন। পরদিন ছুটি। তাই, বাড়ি ফিরে, স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরে আসবেন। তাড়াহুড়োতে একটা ওলা বা উবের বুক করবেন। আড়াইশো টাকা মতো গচ্চা যাক না, আজ একটু আনন্দ করে নিই।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আপনার ধারণা ভুল বলে প্রমাণিত হবে। মোবাইল স্ক্রিনে যখন দেখতে পাবেন ধর্মতলা টু যাদবপুর ভাড়া এখন ৬৫০ টাকা। এর পিছনে অবশ্য কারণ দেখাবে যে ডিম্যান্ড হাই। ডিম্যান্ড যে হাই তা আমি আপনি নির্ণয় করতে পারব না। ওলা-উবের কর্তৃপক্ষও নির্ণয় করে বলে মনে হয় না। পুরোটাই যেন মন মর্জি।

ট্যাক্সির সেই সমস্যা নেই সরকার ভাড়া ঠিক করে দেয়। চাপুন মিটার অন করুন। গন্তব্যস্থলে পৌছিয়ে দেখে নিন মিটারে কত টাকা দেখাচ্ছে। ভাড়া দিয়ে নেমে যান।

কী বললেন?

চালকরা অধিকাংশ সমে বাড়তি কিছু দিতে বলে। না হয় দিলেন। ওলা উবেরের সারচার্জের সিংভাগ তো অ্যাপ ক্যাব কর্তৃপক্ষ খেয়ে নেয়। চালক ও গাড়ির চালক প্রায় কিছুই পায় না। এখানে না হয় গরিব চালক কিছু পেল। হাজার হোক তিনিই তো গাড়ি চালিয়ে আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন।

সবজান্তা চালক

সম্প্রতি, একটি ছবি ফেসবুকে খুব জনপ্রিয় হয়েছে। এক ল্যাম্বারগিনির চালক রাজভবনের সামনে দাঁড়িয়ে এক হলুদ ট্যাক্সির চালকের কাছে পথ জানতে চাইছেন। ছবিটি প্রতীকী। এডিটিংয়ের কারসাজিও হতে পারে। কিন্তু বার্তাটা বেশ পরিষ্কার। কলকাতা পুরসভার কর্মীদের থেকেও হলুদ ট্যাক্সির চালকরা এই শহরের পথ ঘাট সম্পর্কে অনেক বেশি ওয়াকিবহাল।

কলকাতার ট্যাক্সি চালকদের সঙ্গে ট্যাক্সি মালিকদের সম্পর্ক বরাবরই মধুর। তাই তো এক জন কী বড় জোর দু'জন চালক বছরের পর বছর একটি ট্যাক্সিই চালিয়ে যান। বস্তুত, শহরের অপেক্ষাকৃত নতুন চালকরা, মানে ইয়ং জেনারেশন চালকরা, ওলা-উবের বেশি চালান। অ্যাপ ক্যাবগুলোতে এমনও প্রচুর মালিক আছেন যাঁরা নিজেরাই চালকের ভূমিকা পালন করেন। সে দিক থেকে হলুদ ট্যাক্সির চালক যে অনেক বেশি অভিজ্ঞ সে বিষয় কোনও সন্দেহ নেই।

হলুদ ট্যাক্সির চালককে রাস্তা বলে দিতে হচ্ছে এমন নিদর্শন নেই বললেই চলে। হলুদ ট্যাক্সির চালকদের জিপিএসের প্রয়োজন পড়ে না। শহরের মানচিত্র তাঁদের মাথাতেই আঁকা থাকে।

এবার আসি অপছন্দের কারণগুলোতে।

body_120418033122.jpgশীততাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকা আর যাত্রী প্রত্যাখ্যানের জন্য জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে হলুদ ট্যাক্সি [ছবি: রয়টার্স]

যাত্রী প্রত্যাখ্যান

বেঙ্গল ট্যাক্সি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সচিব বিমল গুহ একদিন দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। শহরে সর্দারজি (শিখ) ট্যাক্সি চালকরা হারিয়ে গেছেন বলে। সত্যি তো, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি অবধিও শহরের পথে শিখ ট্যাক্সি চালক চোখে পড়ত। বিমল গুহর কথায়, "ট্যাক্সি বলেই হাঁক পাড়তেই সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়তেন। তারপর, চালকের আসনে বসেই বাঁ-হাত বাড়িয়ে দিয়ে পিছনের বাঁদিকের দরজা খুলে দিতেন। ট্যাক্সিতে যাত্রী চাপার পরেই তাঁর গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন।"

আজ সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই। শহরের বুকে শিখ চালকরা এখন অমাবস্যার চাঁদ। আর তাই যাত্রীদের আর ট্যাক্সিতে চেপে গন্তব্য জানানোর উপায় নেই। আগে থেকে গন্তব্য বলতে হবে। চালকের গন্তব্য পছন্দ হলে যাবে। না হলে, অন্য ট্যাক্সি দেখুন। ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গির মতো ব্যাধিও কোনও দিন ট্যাক্সি চালকদের প্রত্যাখ্যান ব্যাধিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।

আর তাই তো আকাশ ছোঁয়া ভাড়া হেঁকেও ওলা-উবের শহরের বুকে জমিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের বালাই নেই

এক পারিবারিক আড্ডায় এক বন্ধু সেদিন বলছিল যে এয়ার কন্ডিশনার এখন আর বিলাসিতা নয়, আব্যশিক। আড্ডায় উপস্থিত সকলেই সম্মতি জানিয়ে মাথা দোলালেন। কলকাতার গ্রীষ্মকালের গরমে এখন টেঁকা দায়। ভর দুপুরের রাস্তায় বেরোলে শরীর তো ত্রাহি ত্রাহি করে। তাই তো, সেই সময়ে, বেসরকারি রুটের বাস ফাঁকা থাকে। আর একই রুটের সরকারি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাস একেবারে হাউসফুল। লোকে গ্যাঁট থেকে অতিরিক্ত কড়ি খরচ করতে রাজি। শুধুমাত্র, এক ঝলক ঠান্ডা বাতাসের প্রত্যাশায়।

ঠিক এই কারণেই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে হলুদ অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি। শহরের একটিও অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত নয়। কয়েকটি সাদা-নীল শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সি রয়েছে যার সংখ্যা মেরেকেটে হাজার চারেক হবে। অর্থাৎ, দূরবীণ দিয়ে খুঁজতে হবে।

উল্টোদিকে, অ্যাপ ক্যাবের প্রত্যেকটি ট্যাক্সিই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং, গ্রীষ্মের কলকাতায় চাহিদা তুঙ্গে।

সুরক্ষা

কর্পোরেট অফিসগুলোর কর্মী বা আধিকারিকদের এখন অনেক বেশি ফিল্ড জব করতে হয়। সময় বিশেষে তাঁদের সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে ট্যাক্সিতে চাপতে হয়। কিন্তু হলুদ ট্যাক্সিতে প্রিন্টার থাকলেও আদালতের আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বিল দেওয়া হয় না। সে দিক ঠেলে ওলা বা উবের সঙ্গে সঙ্গে ই-মেলে বিল পাঠিয়ে দেয়। যা জমা দিয়ে অফিস থেকে টাকা চেয়ে নিতে পারেন সংশ্লিষ্ট কর্মী বা আধিকারিক।

দুই, ব্যস্ত সময়ে বাসে ভিড়। কিংবা পায়ে হেঁটে বাস স্ট্যান্ডে যেতে ইচ্ছে করছে না। পকেটে খুব বেশি টাকাও নেই। অ্যাপ ক্যাবে বিকল্প উপায় রয়েছে। শেয়ারে যেতে রাজি থাকলে কম খরচে শীততাপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে যাওয়া যাবে। সময় একটু বেশি লাগবে, এই যা।

সবচেয়ে বড় বিষয় আমাদের হলুদ ট্যাক্সির চেয়ে অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি অনেক কম সুরক্ষিত। সবচেয়ে বড় কথা পুরোটাই অ্যাপের মাধ্যমে হচ্ছে বলে সবকিছুই নথিভুক্ত থাকে। আপনি চাইলে আপনার বন্ধু বা আত্মীয়রা আপনার গত যাত্রার বিবরণ তাৎক্ষণিক ট্র্যাক করতে পারবে। সুতরাং যাত্রা শুভ তো বটেই, একই সঙ্গে নিরাপদও।

আমার আপনার পছন্দ-অপছন্দের হলুদ অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সির সাতকাহন। এখন দেখতে হবে কলকাতাবাসীর পছন্দ জয়ী হয় নাকি শহরবাসীর অপছন্দ চিরকালের জন্য বিলীন করে দেয় শহরের ঐতিহ্য অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সিগুলোকে।

সময় হলেই জবাব পাবেন।

Writer

ARPIT BASU ARPIT BASU @journoarpitbasu

The writer is the chief sub editor, DailyO

Comment