৭৫ বছরে হাওড়া ব্রিজ, গোড়া থেকে এখন
পুরোনো ও নতুন, দুই সেতুর কথা ধরলে বয়স এখন দেড়শো ছুঁই ছুঁই
- Total Shares
হাওড়ার ব্রিজ চলে মস্ত সে বিছে/হ্যারিসন রোড চলে তার পিছে পিছে...
৭৫ বছরে হাওড়া ব্রিজ, মানে নতুন ব্রিজ। তবে পুরোনো আর নতুন, দুই সেতুর হিসাব মেলালে হাওড়া ব্রিজ আসলে দেড়শো ছুঁই ছুঁই করছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সহজপাঠ বইয়ে যে কবিতাটি লিখেছেন, সেটি আসলে ওই পুরোনো সেতুটাকে নিয়েই। নতুন সেতু হওয়ার পরে পুরোনো সেতুটি, মানে সেই পন্টুন ব্রিজটি খুলে ফেলা হয়, যত দূর জানা যায়, পুরোনো সেতুর অংশ কাজে লাগানো হয়েছিল খিদিরপুর ব্রিজের মতো কয়েকটি সেতুর বিভিন্ন অংশে।
শুরুতেই একটা কথা না বললেই নয়, ১৮৭৪ সালের যে দিন এই সেতুর উদ্বোধন হয়েছিল, ১৮৭০ সালের সেই দিনই কলকাতা বন্দর আইন পাস হয়। দিনটা ১৭ অক্টোবর।
১৮৭০ সালে কলকাতা বন্দরের জন্য আইন তৈরি হয়। তার পরে প্রথম হাওড়া ব্রিজ তৈরি হয় ১৮৭৪ সালে। এই সেতু তৈরি হয় শুধু বন্দর নয়, একই সঙ্গে কলকাতা ও কলকাতাবাসীদের কথা মাথায় রেখেও। ততদিন এই জায়গা পারাপারের জন্য ভরসা ছিল নৌকা-স্টিমারের মতো জলযানই।
কলকাতা বন্দর ও দুই সেতুর যোগসূত্র প্রথম স্থাপিত হল একটি পন্টুন ব্রিজের মাধ্যমে। পন্টুন ব্রিজ হল ভাসমান সেতু। এই সেতুর নকশা করেন স্যর ব্র্যাডফোর্ড লেসলি, সেই সময় তিনি রেলের মুখ্য ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ২৫ বছরের জন্য তৈরি হলেও প্রায় পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই চালু ছিল এই সেতু। প্রথম হাওড়া ব্রিজ পুরোপুরি খুলে ফেলা হয় ১৯৪৫ সালে।
পুরোনো সেতুর কথা
জাহাজ যাওয়ার সময় এই সেতুর মাঝের অংশ খুলে ফেলা হত। পরে জুড়ে দেওয়া হত। সেই সময়ের বিভিন্ন সংবাদপত্রে ছোট্ট একটা জায়গা থাকত, যেখানে সেতু বন্ধ হওয়া ও জোড়ার সময় দেওয়া থাকত। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ চাইতেন যাতে মূলত রাতের দিকেই সেতু খোলা হয়, তাতে দিনের বেলায় লোকে স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করতে পারেন।
পন্টুন ব্রিজ বা পুরোনো ব্রিজ (সৌজন্য: কলকাতা বন্দরের লেখ্যাগার)
১৮৫৪-৫৫ সালে হাওড়া থেকে রেল পরিষেবা চালু হয়ে যায়। তাই চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই সেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুরোনো লোকজনের কাছে শুনেছি, সেই সময় সেতুর দু-পাশে খাবার বিক্রির দোকান গজিয়ে উঠেছিল। কলকাতা বন্দরের নিরাপত্তা উপদেষ্টা তথা হেরিটেজ কোঅর্ডিনেটর গৌতম চক্রবর্তী বলেন, “সেই সময় যাঁরা সেতু পার হতেন, তাঁরাও খবর রাখতেন কখন সেতু খোলা থাকবে।” কোনও প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, অনেকেই মনে করেন, বেতারেও নির্ঘণ্ট জানানো হত।
রাতের দিকে জাহাজ পথ চিনবে কী করে? উত্তরে গৌতম চক্রবর্তী বলেন, “রাতের দিকে বয়াগুলোতে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল, যাতে জাহাজগুলি দিক নির্ণয় করতে পারে, পথ চিনতে পারে। প্রচণ্ড গতির জোয়ার সামলাতে না পেরে অনেক সময় জাহাজ বেসামালও হয়ে যেত।”
১৯০৬ সালে পোর্ট কমিশন একটি কমিটি নিয়োগ করে। তারা আবিষ্কার করেন যে এই সেতুতে সবচেয়ে বেশি যানটি চলাচল করে সেটি হল গরুর গাড়ি।
বয়ার আলো, কলকাতা বন্দরের লেখ্যাগারে রক্ষিত
নতুন সেতু, কেন অনন্য
চাপ বাড়ার ফলে নতুন একটি সেতুর প্রয়োজনীয়তা কলকাতা বন্দর প্রথম অনুভব করে ১৯০৫ সালে। চেয়ারম্যান চিঠিও দেন প্রাদেশিক সরকারকে। ১৯২৬ সালে হাওড়া ব্রিজ আইন তৈরি হয়। ১৯৩৪-৩৫ সালে যখন কাজ শুরু হবে, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা প্রায় বাজতে চলেছে। এদিকে প্রচুর ইস্পাত দরকার।
এত বড় সেতু এই প্রথম সৃষ্টি হল দেশজ ইস্পাত দিয়ে। মেক ইন ইন্ডিয়ার এতবড় উদাহরণ পাওয়া মুশকিল, সেই সময়ের নিরিখে তো বটেই। গৌতম চক্রবর্তী বলেন, তখন টাটা আয়রণ অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি এই ব্রিজের জন্য একটি বিশেষ ধরনের ইস্পাত তৈরি করলেন। টিসক্রম (tiscrom) নামে এই ধাতুসংকর তৈরি হল শুধুমাত্র এই সেতুর জন্য। প্রিস্ট্রেসড বা লাগানোর পরে বেঁকে যাবে না এমন প্রায় ২৩.৫ হাজার টন ইস্পাত তৈরি হল হাওড়া ব্রিজের জন্য। মোট ২৬ হাজার টন ইস্পাত লেগেছিল।
তিনি জানান, ব্রেথওয়েট, বার্ন ও জেসপ, এই তিনটি প্রতিষ্ঠান তখন একত্রিত হয়েছিল শুধুমাত্র এই ব্রিজ তৈরির জন্য, নাম হয়েছিল বিবিজে। সেতুর ফ্যাব্রিকেশনের দায়িত্ব তাঁরা নিলেন।
নির্মীয়মান সেতু (সৌজন্য: কলকাতা বন্দরের লেখ্যাগার)
এই সেতুর জন্য প্রথম যে কমিটি ১৯২১ সালে তৈরি হয় তার চেয়ারম্যান ছিলেন স্যার আরএন মুখার্জি। এ ছাড়াও ছিলেন কলকাতা বন্দরের চেয়ারম্যান ক্লিমেন্ট হিন্ডলি, কলকাতা বন্দরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ম্যাকগ্লেশন, উপদেষ্টা ছিলেন ব্যাসিল মট প্রমুখ। এর পরে কমিটির পর কমিটি তৈরি হয়। তবে চিফ ইঞ্জিনিয়ার প্রস্তাব করেন একটি সাসপেনশন ব্রিজ গড়া হোক। নতুন করে পন্টুন ব্রিজের প্রস্তাবও করা হয়েছিল সেই সময়।
ছেলেবেলায় অনেকে প্রশ্ন করতেন, হাওড়া ব্রিজে কটা নাট-বল্টু আছে? উত্তর, একটাও নেই। এই ধারনা একেবারেই ঠিক নয়। গৌতম চক্রবর্তী বলেন, নাটবল্টু আছে, তবে খুব কম। তৈরির সময় এটি ছিল বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম সাসপেনশনটাইপ ব্যালান্সড ব্রিজ, কানাডা ও স্কটল্যান্ডের পরে। এখন অবশ্য ষষ্ঠ। বিশ্বের ব্যস্ততম সাসপেনশন সেতুগুলির মধ্যেও এটি অন্যতম।
প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করেন মোটামুটি দু-লক্ষ পথচারী। গাড়ি চলে লাখখানেক। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এখানে ট্রামও চলেছে।
ট্রাম ও উদ্বোধনের কথা
আজকাল যে ভাবে সেতু উদ্বোধন হয়, এই সেতু মোটেই সেই ভাবে উদ্বোধন হয়নি। এই সেতু উদ্বোধন করে একটি যাত্রীবিহীন ট্রাম গাড়ি, অন্ধকার রাতে। মনে রাখতে হবে, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। আর এই সেতুতে কালো রংও মাখানো হয়নি। সেটা ১৯৪৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি।
সেতুর ভার কমাতে এখানে প্রথমে ট্রাম ও পরে বড় লরি চলাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
হাওড়া ব্রিজে ট্রাম, ছবি সৌজন্য: সৌভিক মুখোপাধ্যায়
ঝড়ঝাপটা ও আশঙ্কা
অনেক ঝড়ঝাপটা আর আশঙ্কার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে দুই হাওড়া ব্রিজই, তবে একই ভাবে বেঁচেও গিয়েছে। প্রথম হাওড়া ব্রিজটি উদ্বোধনের আগেই শহরে আছড়ে পড়ে সাইক্লোন, ১৮৭৪ সালের ২০ মার্চ। তাতে শহর তছনছ হয়ে যায় ক্ষতি হয় নির্মীয়মাণ সেতুরও। তারও পরে ইজেরিয়া নামে একটি জাহাজ এই সেতুতে ধাক্কা মারে। তখন গঙ্গায় যেমন জোয়ার-ভাটা খেলত ব্যাপক ভাবে, তেমননি উল্টো দিকে জাহাজও অত উন্নত ছিল না। তারই ফলে এই ধাক্কা। গৌতম চক্রবর্তী বলেন, “আমি এমনও নিদর্শন পেয়েছি যে অনুশীলন সমিতির যে বিপ্লবী শাখা ছিল, তাঁরাও চেষ্টা করেছিলেন এই সেতুটিকে ধ্বংস করার।”
নির্মীয়মান সেতু (সৌজন্য: কলকাতা বন্দরের লেখ্যাগার)
যখন এই সেতু তৈরি হচ্ছে তখন তার প্লিন্থের একটা বড় অংশ পড়ে যায়। তার ফলে আশপাশে ভূকম্পনও অনুভূত হয়। কলকাতা শহরের ভূকম্পন মাপরার যন্ত্রেও সেটি ধরা পড়ে।
নির্মীয়মান সেতু (সৌজন্য: কলকাতা বন্দরের লেখ্যাগার)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই সেতু কি লক্ষ্য ছিল? উত্তরে গৌতম চক্রবর্তী বলেন, “১৯৪৩ সালে কলকাতায় একের পর এক বোমা পড়েছে। কিন্তু জাপানিরা তো এই সেতুতে বোমা ফেলেনি! ডিসেম্বরে উজ্জ্বল আকাশে উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রার মতো তারা এল, এই উজ্জ্বল বস্তুটিকে তারা দেখতে পায়নি বলতে চান? আমরা তো কালো রং করিনি হাওড়া ব্রিজকে। তাদের মাথায় ছিল অন্য কিছু। তাদের মাথায় ছিল কিং জর্জেস ডক, এখন যার নাম হয়েছে নেতাজি সুভাষ ডক। তখন আমেরিকার সেনারা বন্দরেই ঘাঁটি গেড়েছিল। জাপানি বোমাবর্ষণের প্রায় পুরোটাই ধারণ করে খিদিরপুর ডক।”
কিছুদিন আগেও একটি জাহাজ হাওড়া ব্রিজে ধাক্কা মেরেছিল তার নাম ছিন এমভি মণি, তাতেও সেতুর ক্ষতি হয়েছিল। বহু ঝড়ঝাপটা সহ্য করেই এখনও টিঁকে রয়েছে হাওড়া ব্রিজ।
রক্ষণাবেক্ষণ ও সৌন্দর্যায়ন
সামান্য গুটখা কী ভাবে ক্ষতি করতে পারে একটি সেতুর? কয়েক বছর আগের একটি রিপোর্টে দেখা গিয়েছে যে সেতুর থামের নিচের অংশে যে ৬ মিমি গার্ড ছিল, তার ৩ মিমির উপর ক্ষয়ে গিয়েছে গুটখার কল্যাণে। লোককে সচেতন করা যায়নি। এখন থামের গোড়াগুলি ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
১৯৬৫ সালে এই সেতুর নাম হয় রবীন্দ্র সেতু (ছবি: সুবীর হালদার)
গৌতম চক্রবর্তী বলেন, “এমনও দেখা গেছে পাখির বিষ্ঠার ফলেও ক্ষতি হচ্ছে সেতুর। তাই এই সেতুতে পাখিকে বাসা বাঁধতে দেখলেই তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ জন্য আলাদা একটি দলও আছে। সেতুর উপর ও নীচ, দুই দিকই আমাদের সমান ভাবে দেখতে হয়। হাওড়া ব্রিজের নীচ দিয়ে গেলে দেখা যাবে মস্ত বড় সবুজ একটা বেল্ট রয়েছে, ওটি আসলে জাহাজের পথ নির্দেশক, কোন পথে জাহাজ গেলে সেতুর ক্ষতি হবে না। সব জলযানকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের সব দিকই রক্ষণাবেক্ষণে নজর দিতে হয়।”
চার-পাঁচ বছর অন্তর এই সেতু রং হয় সিসা-বিহীন রং দিয়ে। সে জন্য ২৬,০০০ লিটার রং প্রয়োজন হয়, সময় লাগে সাড়ে সাত মাস। ২০১৪ সালে শেষ বার রং করা হয়েছিল। ২০০৬ সালে এই সেতু প্রথম আলোকিত করা হয় চেয়ারম্যান অনুপ চন্দের উদ্যোগে। প্রথমে কথা ছিল তাপস সেন সেই কাজ করবেন। কিন্তু তাঁর প্রয়াণের পরে তাঁর ছেলে এই কাজ শেষ করেন। টেন্ডারের মাধ্যমে ফিলিপস সেই বরাত পেয়েছিল। বর্তমান চেয়ারম্যান বিনীত কুমার এখন সেখানে এলইডি আলো লাগানোর ব্যবস্থা করছেন, তাতে সেতুটি আরও সুন্দর ভাবে দু-পাড়ের বাসিন্দার কাছে কাছে ধরা দেবে।
রাতের আলোয় হাওড়া ব্রিজ (ছবি: সুবীর হালদার)
এখন সব মিলিয়ে বছরে আন্দাজ ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা মতো খরচ হয় এই সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।
সাংস্কৃতিক যোগ
এই সেতুর সঙ্গে জুড়ে আছে সংস্কৃতিও। পুরোনো সেতুর কথা না হয় বাদই দেওয়া হল, নতুন সেতুর সঙ্গেও যোগ রয়েছে সাংস্কৃতির। ১৯৫৩ সালে বিমল রায়ের দো বিঘা জমিন, ১৯৫৮ সালে শক্তি সামন্তের হাওড়া ব্রিজ অথবা সেই একই বছর সত্যজিৎ রায়ের পরশ পাথরে দেখা গিয়েছে এই সেতুকে।
ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি থেকে পালিয়ে, মৃণাল সেনের নীল আকাশের নীচে প্রভৃতি ছবিতে বারে বারে ফিরে এসেছে এই সেতু। রাজ কাপুরের একাধিক ছবিতে দেখা গেছে এই সেতুকে। নিকোলাস ক্লোদসের দি বেঙ্গলি নাইটস, রোনাল্ড জফের সিটি অফ জয় প্রভৃতিতেও এই সেতু উজ্জ্বল ভাবে উপস্থিত।
১৯৬৫ সালে এই সেতুর নাম হয় রবীন্দ্র সেতু।
লেখাটি পড়ুন ইংরেজিতে

