একলা বলো রে

English   |   Bangla

নতুন করে কেন সংরক্ষণের প্রয়োজন হল?

১৯৫২ সালের নির্বাচনে যে প্রতিশ্রুতি ও ইস্যু ছিল, ২০৫২ সালেও তাই-ই থাকবে

 |  3-minute read |   10-01-2019
  • Total Shares

মানব সভ্যতার ইতিহাসে দেশ গঠনের প্রক্রিয়া যদি একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যায়, তা হলে একটা বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায় যে, দেশ গঠন হয় দেশবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। দেশবাসীর এই সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তার জন্য যে প্রয়োজনীয় মানসিকতা সেটা তৈরি করতে হয় দেশের নেতাদের।

সাত দশক হয়ে গেল ভারত স্বাধীন হয়েছে কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট তৎকালীন দেশনেতারা দেশগঠনের যে যে চ্যালেঞ্জগুলো লিপিবদ্ধ করেছিলেন, ২০১৯ সালে তার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।

এর মাঝে বেশ কয়েকজন দেশনেতাকে আমরা ভগবান বানিয়েছি। বিভিন্ন দিনে তাঁদের ছবিতে ফুলমালা চড়ানো অবশ্যকর্তব্য। তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তারস্বরে বিতর্ক হয় দেশগঠনে সেই সব ভগবানরূপী দেশনেতাদের অবদান নিয়ে। কিন্তু দেশ চলছে গড্ডলিকা প্রবাহে। তার সর্বশেষ উদাহরণ উচ্চবর্ণের জন্য সংরক্ষণ। ভারত প্রমাণ করেছে যে সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে মুখোশটাকে বাঁচিয়ে রাখতে ভোটে জেতাই হল প্রথম এবং শেষ উদ্দেশ্য।

ambedkar-dailyobangl_011019081810.jpgভীমরাও আম্বেদকর ভারতের সংবিধান রচনার অন্যতম প্রধান কারিগর। (ছবি সৌজন্য: ইন্ডিয়া টুডে)

ভীমরাও আম্বেদকরের সমালোচনা করার ধৃষ্টতা আমার নেই, কিন্তু গত সাত দশকে ভারত প্রমাণ করেছে যে সংরক্ষণ কোনও সমস্যার বিন্দুমাত্র সমাধান করতে পারেনি।

কিন্তু ভারত এটাও প্রমাণ করেছে: সংরক্ষণ কিছু রাজনৈতিক নেতার রাজনীতি নামক পেশাকে জিইয়ে রাখার অন্যতম হাতিয়ার। ঠিক যেমন কৃষিঋণ মকুব অথবা কেন্দ্র বা বিভিন্ন রাজ্য সরকারের বিভিন্ন রকম তথাকথিত জনকল্যাণমূলক প্রকল্প। এক সময় বিজেপি দাবি করত যে তারা পার্টি উইদ ডিফারেন্স। কিন্তু ভোটে জেতার অঙ্ককে সামনে রেখে সংরক্ষণের মতো একটা ব্যর্থ প্রকল্প তারা গাজরের মতো ঝোলাতে বাধ্য হল রাহুল গান্ধীর কৃষকদরদী ভেকটাকে মোকাবিলা করার জন্য।

এটা যেমন শুনে অট্টহাসি হাসতে ইচ্ছা করে যখন বুধবার রাজস্থানের জনসভায় পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে রাহুল গান্ধী ঘোষণা করেন যে কৃষিঋণ মকুব কৃষকের সমস্যা  মেটামোর প্রথম পদক্ষেপ। ঠিক কেমনই অবাক লাগে যখন রাত ১০টা পর্যন্ত রাজ্যসভায় বিজেপির নেতারা সংরক্ষণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা করেন।

baksi_rahulpti_011019081728.jpgরাহুল গান্ধী: স্বাধীনতার পরে পাঁচ দশক ক্ষমতা ছিল তাঁর পরিবারের হাতেই। (ছবি: পিটিআই)

সাত দশকের মধ্যে প্রায় পাঁচ দশক রাহুল গান্ধীর পরিবার ভারত শাসন করেছে। তারপর তিনি দেশবাসীকে স্তোকবাক্য শোনাচ্ছেন যে কৃষিঋণ মকুব করাটা কৃষিপ্রধান ভারতের কৃষক সমস্যা সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ।

পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেও সংরক্ষণ প্রথা চালু আছে কিন্তু তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সেই সংরক্ষণ প্রথাকে অপব্যবহার করে ভারতের মতো একগুচ্ছ রাজনীতির দোকানদার তৈরি হয়নি। শুধুমাত্র ভোটকে সামনে রেখে একই ফাঁদে পা দিল বিজেপি নেতৃত্ব।

সংরক্ষণ যাঁদের রাজনৈতিক হাতিয়ার, তাঁরা ছাড়া ভারতের যে কোনও মানুষ এক কথায় বিশ্বাস করেন যে সংরক্ষণ বা কৃষিঋণ মকুব – এই ধরনের জনমোহিনী বা পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি কখনোই কোনও উন্নয়নশীল দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে পারেন না অথবা দেশগঠনে দেশবাসীর অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে পারে না।  

এটা ঠিক যে ভারত গরিব দেশ। এটা ঠিক যে ভারতের সমস্যার বৈচিত্র্য অনেক জটিল এবং এটাও ঠিক যে আজ ভারতের জনসংখ্যা ভারতের সম্পদ হওয়ার বদলে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

bak-inside_011019081955.jpgসংসদ ভবন: ১৯৫২ থেকে এখনও পর্যন্ত বদলায়নি নির্বাচনের ইস্যু! (ছবি: এএফপি)

কিন্তু কেন এই জনবিস্ফোরণ ঘটল এবং কেন এই বিশাল জনসম্পদকে আমরা জনসম্পদ হিসাবে ব্যবহার করতে পারলাম না, সেই জবাবদিহি কে করবে?

পাঁচ বছর অন্তর ভোটে জেতাই যদি একমাত্র উদ্দেশ্য হয় তা হলে এই দাবি উঠতেই পারে ভোট প্রক্রিয়া বন্ধ করে অন্য কোনও ভাবে দেশ পরিচালনার ব্যবস্থা করা হোক। মিথ্যা এবং ধ্বংসাত্মক প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিধানসভা বা লোকসভায় সংখ্যা জোগাড় করে নেওয়াটাই যদি একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তা হলে যতই গর্ব করা হোক না কেন, ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র কোনও দিনই সাফল্যের শিখরে উঠতে পারবে না এবং ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচনে যা যা প্রতিশ্রুতি ও ইস্যুগুলোকে নিয়ে নির্বাচন হয়েছিল, ২০৫২ সালেও তাই-ই হবে, দেশ যে তলানিতে থাকবার তাই থেকে যাবে।

Writer

PRASENJIT BAKSI PRASENJIT BAKSI @baksister

The writer is a veteran journalist.

Comment