একলা বলো রে

English   |   Bangla

সিবিআই বনাম সিভিসি: রক্ষকরা ভক্ষক হলে আমাদের কে রক্ষা করবে?

একা সুপ্রিম কোর্ট আর কতদিন আইন রক্ষা করে যাবে!

 |  4-minute read |   08-11-2018
  • Total Shares

লাতিন ভাষায় একটা কথা আছে: quis custodiet ipson custodies. এর মোটামুটি বাংলা তর্জমা: জিম্মাদারের জিম্মাদার কে হবে?

দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ধরণের গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতির মামলা তদন্ত করে থাকে যে সংস্থা, সেই সংস্থাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে তার প্রেক্ষিতেই রয়েছে এই প্রশ্নের অবতারণা।

১৯৪৬ সালের দিল্লি পুলিশ এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্টের অধীনে সিবিআই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

সাধারণত, সিবিআই তদন্তে কেন্দ্র ও রাজ্য দুই সরকারেরই সম্মতি প্রয়োজন হয়।

তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, যে কোনও রাজ্যের হাইকোর্ট বা দেশের শীর্ষ আদালত মনে করলে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে।

সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ মামলায় দেশের বিভিন্ন আদালতকে সিবিআইয়ের উপরই ভরসা করতে দেখা গিয়েছিল। যদিও বিচারক লোধা একবার সিবিআইকে 'খাঁচায় বন্দি তোতা' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

১৯৪৬ সালে সিবিআই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। আর, ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্স কমিটির সঙ্গে সংস্থাটিকে যুক্ত করে দেওয়া হয় যাতে সিবিআইয়ের হাতে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়ার উপর কেউ হস্তক্ষেপ না করতে পারে।

 

body1_110818084334.jpgসিবিআই কি সত্যিই খাঁচায় বন্দি তোতা?

২০০৩ সালে লোকাযুক্ত করে (পরে লোকপাল আইন ২০১৩) ঘোষণা করা হয়েছিল যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী নেতা বা সর্ববৃহৎ বিরোধী দলের নেতা, দেশের মুখ্য বিচারপতি কিংবা তাঁর কোনও মনোনীত ব্যক্তি সিবিআই অধিকর্তা নিয়োগ করবেন। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া, "কার্যকালের মেয়াদ, ন্যায়পরায়ণতা এবং দুর্নীতির মামলা তদন্তে অভিজ্ঞতা"র উপর ভিত্তি করে হবে।

উল্টোদিকে, প্রসিকিউশনের অধিকর্তাকে কেন্দ্রীয় সরকারি আধিকারিক ও অন্যান্য আধিকারিক সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় সরকারের একটি কমিটি নিয়োগ করে।

এই ব্যবস্থা কিন্তু অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ।

অধিকর্তার নেতৃত্বে যে দলটি গঠিত হয় সেই দলটির কাঁধেই গণতান্ত্রিক আইন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব বর্তায়।

এই ধরণের তদন্তের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলোর শুধুমাত্র বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) ছাড়াও আর কোনও বিশেষজ্ঞ দল নেই।

২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল অবধি আন্না অভিযানের সময় লোকপাল নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল তার মূল লক্ষ্যই ছিল সিবিআইয়ের স্বাধীনতা।

২০০৩ সালের সিভিসি আইন অনুযায়ী সিবিআই ও সিবিসি স্বায়ত্তশাসিত দুটি সংস্থা।

১৯৯৮ সালের হাওলা মামলার পরে সুপ্রিম কোর্ট সরকারের হস্তক্ষেপ থেকে সিবিআইয়ের নিষ্কৃতি পাওয়ার উপর জোর দিয়েছিল এবং সিবিআইয়ের তরফ থেকে বলা হয়েছিল যে এই সিবিআই মামলায় কোনও রকম আগাম সরকারি অনুমতির প্রয়োজন নেই।

এর আগের লোকপাল বিলগুলোতে (১৯৭৯ থেকে ২০১০) আমলারা লোকপালের আওতা থেকে মুক্তি লাভের সবরকম চেষ্টা করতেন।

এর পর আবার হাওলা মামলার পর শুধুমাত্র তদন্তের ক্ষেত্র ছাড়া তদারকির বালাই একেবারে উঠে গিয়েছিল। সিবিআইয়ের স্বায়ত্তাধিকার রক্ষার সবরকম ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমান সঙ্কট 

বর্তমান অচলাবস্থার সূত্রপাত ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর। সেদিন সিভিসি 'অবসর-নিতে-চলা' সিবিআই অধিকর্তা আলোক ভর্মার ডানা ছেঁটে দিয়ে নাগেশ্বর রাওকে অধিকর্তার দায়িত্ব সামলাতে নিয়োগ করেছিল।

সিভিসির কি এই ক্ষমতা রয়েছে?

প্রথমত প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী নেতা এবং দেশের প্রধান বিচারপতি (কিংবা তাঁর মনোনীত কেউ) সমৃদ্ধ একটি কমিটি সিবিআইয়ের অধিকর্তাকে নিয়োগ করে।

থমাস মামলায় দেশের শীর্ষ আদালতও নীতিপরায়ণ নিয়োগ পদ্ধতির উপর জোর দিয়েছিল। অর্থাৎ নিয়োগ পদ্ধতিতে কোনও রকম শর্টকাট বরদাস্ত করা চলবে না।

দ্বিতীয়ত, একজন অধিকর্তার মেয়াদ মাত্র দু'বছর।

তৃতীয়ত, তদারকি মানে ডানা ছেঁটে ফেলে বরখাস্ত করা নয়।  

অবশ্য দোষী সাব্যস্ত হলে বা অযোগ্য মনে করা হলে বিষয়টিকে প্রকৃত নিয়োগকারীদের নজরে আনতে হবে।

এক্ষেত্রে ডানা ছেঁটে ফেলার প্রক্রিয়াটি বেআইনি ভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।

কিন্তু কে আর পরোয়া করে?

এই মুহূর্তে, সিবিআইয়ের বিশেষ অধিকর্তা আস্থানার সঙ্গে বরখাস্ত হওয়া অধিকর্তা আলোক ভার্মার একটি ঠান্ডা যুদ্ধ লেগেছে।

২০১৬ সালের ২ ডিসেম্বর যখন আস্থানাকে সাময়িক অধিকর্তা হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল তখন সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে নিয়োগ প্রক্রিয়া যেন সঠিক হয়।

এরই মাঝে, ২০১৭ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারী ভার্মা সিভিসির পছন্দের সিবিআইয়ের অধিকর্তা হয়ে গেলেন।

আস্থানা আবার গুজরাট ক্যাডারের এবং কেন্দ্রের খুব ঘনিষ্ঠ।

২০১৭ সালের ২১ অক্টোবর ভার্মা এক চিঠি মারফত অভিযোগ তুলেছিল যে স্টার্লিং বায়োটেক মামলায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে ৩.৬৮ কোটি টাকা নিয়েছেন আস্থানা।

এর পর ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর সিবিআই একটি মামলা রুজু করেছিল। এই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল যে একটি মামলার নিষ্পত্তির জন্য হায়দরাবাদের ব্যবসায়ী সতীশ সানার কাছ থেকে ২ কোটি টাকা নিয়েছিলেন আস্থানা।

body-111_110818084558.jpgআধিকারিকরা নিযুক্ত হচ্ছেন, দ্রুত বহিষ্ওকৃতও হচ্ছেন, এখানে এখন চূড়ান্ত অব্যবস্থা

উল্টোদিকে আস্থানাও ভার্মার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যা বর্তমানে সিভিসি তদন্ত করছে।

এই তদন্ত প্রক্রিয়ার সিবিআই আধিকারিকদের ইচ্ছেমতো সরানো ও নিয়োগ করা হচ্ছে।

সবমিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জটিল।

গলদ কোথায়?

এটা অবশ্য গল্পের অর্ধেকটা। এর ফলে সিবিআইয়ের ভাবমূর্তিতে ধাক্কা লেগেছে এবং সিবিআইয়ের উপর আস্থা হারিয়েছে মানুষ।

ভার্মার বিরুদ্ধে তদন্তের সময় সিভিসি প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি একে পট্টনায়ককে নিয়োগ করেছিল। ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট এই নিয়োগের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানায় সিভিসির আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে।

২৩ অক্টোবর ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হন নাগেশ্বর রাও। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয় তিনি যেন কোনও রকম গুরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা নীতিনির্ধারক সিদ্ধান্ত না নেন। তাঁর কাজ শুধু মাত্র সংস্থাটিকে 'ফাঙ্কশনাল' রাখা।

২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল অবধি আন্না-বিদ্রোহ চলাকালীন সিবিআই ও সিভিসিকে যথেষ্ট সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু, বর্তমানে দুটি সংস্থাই ভিতর থেকে ভেঙে পড়েছে।

তার মানে কি সিবিআই ও সিভিসি দুটি সংস্থাই আদতে খাঁচায় বন্দি তোতা? রক্ষক ভক্ষক হয়ে উঠলে আমাদের কে রক্ষা করবে?

আইন রক্ষার মূল রক্ষক হয়ে উঠেছে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু দেশের শীর্ষ আদালত একাই বা কত টানবে?

(সৌজন্যে: মেল টুডে)

লেখাটি পড়ুন ইংরেজিতে

Writer

RAJEEV DHAVAN RAJEEV DHAVAN

Supreme Court lawyer.

Comment