নির্বাচন জয়ের অভিযানের অঙ্গ হিসেবেই কি জামাত-ই-ইসলামির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল বিজেপি?

কাশ্মীরে জামাতের ৩০০টি স্কুলে, এক লক্ষ পড়ুয়া রয়েছে তাদের কী হবে?

 |  4-minute read |   11-03-2019
  • Total Shares

সৌভাগ্যবশত, ২০১৪ সাধারণ নির্বাচনের সময়ে কাশ্মীর কোনও ইস্যুই ছিল না। সেই নির্বাচনে মূলত অর্থনীতি ও ইউপিএ সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া দুর্নীতিগুলোকে হাতিয়ার করে বিজেপি ও দলের মুখ্য প্রচারক নরেন্দ্র মোদী কংগ্রেসের আসন সংখ্যা মাত্র চুয়াল্লিশে নামিয়ে এনেছিল।

আফজাল গুরুর ফাঁসি হওয়া সত্ত্বেও সেই নির্বাচনে কাশ্মীর সংক্রান্ত কোনও ইস্যু তৈরী হয়নি।

আমরা কাশ্মীরিরা মনে করি সে নির্বাচনে মোদী যে ভাবে জয়লাভ করেছিলেন তাতে তিনি আলোচনার মাধ্যমে কাশ্মীর সমস্যার নিষ্পত্তি ঘটাতে পারতেন। সেই কারণেই, বিজেপির সঙ্গে আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও, আমরা বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধতে রাজি হয়েছিলাম।

কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দল বিজেপি এই জোটের মর্মটা বুঝতে পারেনি। তারা আলোচনার পথে না হেঁটে আমাদের উপর জোর করে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। কোনও প্রমান ছাড়াই তারা হুরিয়ত ও জামাত-ই-ইসলামিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বিজেপির এই আচরণের বিরোধিতা করার ফলেই বিজেপির সঙ্গে আমাদের জোট ভেঙে যায়।

body_031119083903.jpgআমরা ভেবেছিলাম প্রধানমন্ত্রী আমাদের সমস্যার সমাধান করবে [ছবি: রয়টার্স]

এবার ২০১৯ সালে আসা যাক। সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগেই প্রধানমন্ত্রী 'পাইলট প্রজেক্টের' কথা ঘোষণা করলেন। তিনি বলেছেন, যারা সন্ত্রাসবাদীদের মদত দিচ্ছে তাদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হবে। 'পাইলট প্রজেক্ট' বলতে তিনি নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে ভারতীয় বায়ুসেনার এয়ার স্ট্রাইকের কথা বুঝিয়েছেন। আর, বাস্তবে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত তো কাশ্মীর উপত্যকায় ও মুসলমান অধ্যুষিত জম্মুতে প্রায়শই হয়ে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রী কি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, প্রশাসন কিংবা উন্নয়নের কথা ভুলে গেছেন? নাকি, এই বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর কিছু করার নেই বলেই তিনি কাশ্মীর (পড়ুন কাশ্মীরি) ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উঠে পড়ে নেমেছেন?

হুরিয়ত নেতৃত্ব ও কিছু পিডিপি নেতার নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে উপত্যকায় এই লড়াই শুরু করেছেন তিনি। খবরের প্রকাশ, রাজ্য জুড়ে কিছু ছাত্র, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের উপরও আক্রমণ করা হয়েছে। কিন্তু এই খবরগুলোকে পাত্তাই দেওয়া হচ্ছে না। শাসক দল এই খবরগুলোকে গুজব বলে উড়িয়ে দিতে চাইছে। প্রধানমন্ত্রী এই নিয়ে কোনও দুঃখ প্রকাশও করেনি। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টকে আসরে নামতে হয়েছে। আর একটি রাজ্যের রাজ্যপালের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বও কাশ্মীরি পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে চেয়েছিলেন। তিনি অবশ্য শেষ পর্যন্ত সফল হননি।

body2_031119084054.jpg

এই পরিস্থিতিতে জামাত-ই-ইসলামির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আমার মতে এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের তরফ থেকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোদীকে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরতেও এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

আমার মতে, এই নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত পুরোমাত্রায় অগণতান্ত্রিক এবং এই সিদ্ধান্তকে আইনে চোখে চ্যালেঞ্জ জানানো যেতে পারে।

বিজেপি মনে করছে যে সীমান্তরেখার ওপারে এয়ার স্ট্রাইক করে তারা নতুন জীবন লাভ করবে। এমনিতেই, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তাদের পারফর্মেন্স বেশ খারাপ। কিন্তু, তারা যখন এয়ার স্ট্রাইকের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন তারা ভুলে গেলেন যে পাকিস্তানও প্রত্যাঘাত করতে পারে। এই একটি সিদ্ধান্ত নিয়েও বিজেপি সরকার কাশ্মীর ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে গেল।

এর আগে কখনই দু'দুটি পরমাণু শক্তির অধিকারী রাষ্ট্রকে একে ওপরের বিরুদ্ধে এতটা রনং-দেহি ভূমিকায় দেখা যায়নি।

body1_031119084015.jpgএয়ার স্ট্রাইক করা হল পাকিস্তান সীমান্তের ওপারে, পাকিস্তানও প্রত্যাঘাত করতে পারে [ছবি: রয়টার্স]

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যখন আলোচনার কথা বলছেন, তখন বিজেপি সরকার জামাত-ই-ইসলামির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে কাশ্মীরিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে কাশ্মীর ইস্যুকে আরও জলঘোলা করতে চাইছে। কয়েকটি সংখ্যার দিকে মনোনিবেশ করা যাক - জামাত কাশ্মীর জুড়ে ৩০০টি স্কুল চালায়। আর, এই স্কুলগুলোতে প্রায় এক লক্ষ পড়ুয়া রয়েছে। তারা এখন কী করবে?

প্রায় দু'দশক হতে চলল জামাত-ই-ইসলামির সদস্যরা অস্ত্র পরিত্যাগ করে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় কাশ্মীর সমস্যার সুরাহা করতে চাইছে। ১৯৯৮ সালের পর থেকেই জামাত সদস্যদের বিরুদ্ধে একটিও এফআইআর দায়ের করা হয়নি। এই সময় থেকেই জামাত কাশ্মীরে শিক্ষার প্রসারের চেষ্টা করে চলেছে। এই স্কুলগুলো সরকারি নথিভুক্ত এবং এনসিইআরটি-র সিলেবাস মেনেই এই স্কুলগুলোর পাঠ্যক্রম ঠিক করা হয়।

জামাতের বিরুদ্ধে কোনও খারাপ অভিযোগও ওঠেনি। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্ত এই সংগঠনকে নতুন করে সমস্যায় ফেলে দিল। এর পরিণাম ভালো নাও হতে পারে।

অধিকাংশ কাশ্মীরিরা যে প্রশ্নটা করছে আমিও সেই প্রশ্নটি করতে চাইছে - এই সিধানগুলো কি বিজেপির নির্বাচন জয়ের অভিযানের অঙ্গ? আমাদের কিন্তু উত্তর চাই।

লেখাটি পড়ুন ইংরেজিতে

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUHAIL BUKHARI SUHAIL BUKHARI @suhail_bukhari

Author is spokesperson, Peoples Democratic Party and media adviser to Mehbooba Mufti.

Comment