চার দশক আগের জরুরি অবস্থার কথা তুলে কোথায় লাভ বিজেপির

এক ঢিলে অনেক পাখি মারার জন্য চিন্তা করেই এই প্রসঙ্গ তুলেছে কেন্দ্রের শাসকদল

 |  7-minute read |   02-07-2018
  • Total Shares

জরুরি অবস্থা। চার দশক আগের এক ঘটনা খুঁচিয়ে তুলে কতটা লাভ করতে পারবে বিজেপি? এমন এক সময়ের কথা তারা খুঁচিয়ে তুলছে, যার স্মৃতি হয় বিলীয়মান, না হয় সেই সময়ের কথা আধুনিক প্রজন্ম শুধুমাত্র শুনেছে বা বড়জোর পড়েছে।

নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে দ্বিতীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন সুরেশ প্রভু। ট্রেন সময় মতো চালালোর জন্য তিনি নাকি খোঁজ-খবর করা শুরু করেছিলেন, জরুরি অবস্থার সময়ে কী ভাবে ট্রেন সময়ে চলত। অর্থাৎ একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে সেই সময় নিয়মানুবর্তিতা ছিল বেশ আঁটোসাঁটো। তবে প্রশ্ন হল আইনশৃঙ্খলা কেমন ছিল, আইন ছিল নাকি শুধুই শৃঙ্খল ছিল? উত্তর যাই হোক, এই এক জরুরি অবস্থা দিয়ে চার বছর ধরে ওঠা সব অভিযোগের যুৎসই জবাব দিতে পারছে বিজেপি। আরও স্পষ্ট করে বললে, অভিযোগগুলো তোলার সুযোগ পাওয়াই মুশকিল হবে লোকসভায় প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের পক্ষে।

 emergencyhindufrontp_070218083316.jpgদেশজুড়ে জারি হল জরুরি অবস্থা

কেন এই প্রসঙ্গ

প্রশ্নটা হয়তো উঠত না, যদি না নরেন্দ্র মোদীকে বারে বারে একনায়ক বলে খোঁচা দেওয়া হত। তাঁর আমলকে সুপার ইমার্জেন্সি বলা না হত। ইন্দিরা গান্ধীর জমানায় একটা কথা প্রচলিত ছিল যে, তাঁর মন্ত্রিসভায় একজন মাত্র পুরুষ রয়েছেন...। এই উক্তির মধ্য দিয়ে নারীদের অবমাননা করা হয়নি, আসলে ইন্দিরা গান্ধীকে একনায়ক বলে বর্ণনাই করা হয়েছে। জরুরি অবস্থা শিথিল হওয়ার পরে এমন কয়েকটি কার্টুন প্রকাশিত হয়, যার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় ইন্দিরা গান্ধীর আসলে ছিলেন হিটলারি মানসিকতার। নরেন্দ্র মোদীকে একনায়ক হিসাবে তুলে ধরার যে চেষ্টা বিরোধীরা করছে, অঙ্কুরে তার বিনাশ ঘটাতেই এই প্রচার, তাতে সন্দেহ নেই। অর্থাৎ ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে নরেন্দ্র মোদীকে একনায়ক বা স্বৈরাচারী বলে প্রচার করার পরিকল্পনা প্রায় এক বছর আগেই ভেস্তে দেওয়া এই প্রচারের অন্যতম লক্ষ্য।

তিন জমানা, কোণঠাসা বিরোধী

১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পরে প্রথম লোকসভা ভোটে কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। তার এত দিন পরে ২০১৪ সালে আবার কোনও দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গড়ল, এ বার বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী হলেন মোদী। ক্ষমতায় আসার পরে প্রথম যে কাজটি বিজেপি করল, তা হল কাউকেই বিরোধী নেতার পদ না দেওয়া।

সাংবিধানিক ভাবে কেউ এই পদ দাবি করতে পারেনি, কারণ বিরোধী দলনেতা হতে গেলে একটি দলের যে ন্যূনতম আসন দরকার তা কোনও দলেরই ছিল না। বিজেপির যুক্তি ছিল, প্রথমবার নির্বাচনের পরে যখন জওহরলাল নেহরু সরকার গড়েন, তখনও কাউকে প্রধান বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেওয়া হয়নি।

নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মন-কি-বাত বলেন, কিন্তু শোনেন না। সংসদে এমনও টিপ্পনি শোনা গেছে যে, প্রধানমন্ত্রীর মন-কি-বাত সংসদও শুনতে চায়, উনি শুধু বেতারে মনের কথা না বলে সংসদেও কিছু বলুন! বিরোধীদের তোয়াক্কা তিনি করেন না বলে বারে বারেই অভিযোগ উঠেছে।

indira__070218083436.jpegইন্দিরা গান্ধী

এই অভিযোগেরও মোক্ষম জবাব জরুরি অবস্থা। সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করার সঙ্গে সঙ্গেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে গ্রেপ্তার করা হয় জয়প্রকাশ নারায়ণ, অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবাণী প্রমুখ। কংগ্রেস জমানায় কী ভাবে বিরোধী কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল তা নিয়ে একবার খোঁচা মারলে নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের আক্রমণ ভোঁতা হয়ে যাবে।

গান্ধী পরিবার ও বিরোধী রাজনীতি

প্রচারের জেরে একটা কথা কিছু দিন আগে লোকে একরকম বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। কারাগারে বন্দি অটলবিহারী বাজপেয়ী নাকি ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীকে, এক বার নয়, বারে বারে। একই কথা প্রচারিত হয়েছিল তৎকালীন শরসঙ্ঘচালক বালাসাহেব দেওরাসের নামেও, তিনি নাকি ইন্দিরা গান্ধীকে সহায়তার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে অবশ্য এর স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে শোনা যায় না। সবটাই প্রচার। তাই যাঁরা নরেন্দ্র মোদীকে প্রচারসর্বস্ব নেতা ও মিথ্যার ফেরিওয়ালা বানাতে চাইছেন, তাঁদের কাছে গিয়ে কংগ্রেস জমানার সেই প্রচার তুলে ধরতে পারেন নরেন্দ্র মোদী। 

বাজপেয়ী বিজেপির এমন একজন নেতা যাঁকে এখনও কেউ সাম্প্রদায়িক তকমা দিতে পারেনি। তিনি লখনৌ লোকসভা কেন্দ্র, যেখানে অধিকাংশ ভোটারই অহিন্দু, সেখানে তিনি পরাজিত করেন সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী রাজ বব্বরকে। এটা ২০০৪ সালের কথা। দ্বিতীয় লোকসভা থেকে তিনি ভোটে জিতে আসছেন। বাজপেয়ীর প্রতি ভারতবাসীর যে শ্রদ্ধা ও আবেগ আছে, সেই আবেগের জায়গায় নাড়া দিয়ে কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন মোদী।

বিরোধী কণ্ঠ রোধ করতে কংগ্রেস কী করেছে, সে কথা তুলে ধরার পাশাপাশি পরিবারতন্ত্রের কথাও উঠবে। জওহরলাল নেহরুর মৃত্যুর পরে ১৩ দিনের জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী হন গুলজারিলাল নন্দ। তারপরে প্রধানমন্ত্রী হন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। তাসখন্দে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে নানা জন নানা সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন। তাঁর মৃত্যুর পরে আবার ১৩ দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন নন্দ। তারপরে ইন্দিরা গান্ধী। তখন অনেক প্রবীণ কংগ্রেসী নেতাই তাঁকে মেনে নিতে পারেননি।

mods-body_0626180736_070218083611.jpgনরেন্দ্র মোদী: জরুরি অবস্থা এখন বিজেপির মোক্ষম অস্ত্র

কংগ্রেস প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর প্রার্থীকে বিবেক ভোটে জিতিয়ে আনেন ইন্দিরা। তারপরে কংগ্রেসে ভাঙন এবং কার্যত ইন্দিরার এক নায়ক হয়ে ওঠা ও তার পরে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে দেশজুড়ে বিপ্লবের ডাককে কণ্ঠ রোধ করা, এই সব প্রসঙ্গই টেনে এনে প্রচার করতে পারেন নরেন্দ্র মোদী।

ক্ষমতা কুক্ষিগত করা

নরেন্দ্র মোদী একাই সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ শোনা যায়। এই অভিযোগের মোক্ষম জবাবও সেই জরুরি অবস্থা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে কী ভাবে সংবিধানের অপব্যবহার করা যায়, তা দেখিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর ভূমিকাও প্রবল ভাবে সমালোচিত হয়েছিল।

সঞ্জয় গান্ধী তখন অতি-সাংবিধানিক ক্ষমতা ভোগ করেছেন। পরিবার পরিকল্পনার নামে ১৯৭৫-৭৭ সালে কুড়ি মাসে এক কোটিরও বেশি মানুষকে নাসবন্দি করা হয়েছিল। সেই সময় সংবিধানের অপব্যহার বা গণতন্ত্র হত্যা করার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে বিজেপি।

সেই সময় পুরো ক্ষমতাই ছিল ইন্দিরা গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধীর হাতে। বিজেপির অভিযোগ, মনমোহন সিং পুতুল-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ক্ষমতা ছিল গান্ধী পরিবারের হাতেই। তাই পরিবারতন্ত্র নিয়েও তিনি আক্রমণ করতে পারেন।  

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

সংবিধানে ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার কতটা রক্ষিত হচ্ছে সেই প্রশ্ন উঠছে বারে বারে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল সেন্সর বোর্ড, যা এখন সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন নামে পরিচিত। তাদের কাজ কোন ছবি কোন পর্যায়ভুক্ত তা বিচার করে এ, ইউ/এ, এস প্রভৃতি শংসাপত্র দেওয়া অথবা তা দিতে অস্বীকার করা।

সাম্প্রতিক কালে বিতর্ক শরু বাজপেয়ী জমানায় তৈরি ওয়ার অ্যান্ড পিস  ছবি থেকে ২১টি অংশ কেটে বাদ দিতে বলা নিয়ে। এখন পদ্মাবতী ছবির দীর্ঘ ঈ-কার বাদ দেওয়া, গো-শব্দ বাদ দেওয়ার মতো নানা ঘটনা ঘটছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমেও প্রভাব বিস্তার করে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর দল বিজেপি।

indira-sanjay_062616_070218084308.jpgইন্দিরা গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধী

এর যোগ্য জবাব হতে পারে কিসসা কুর্সি কা  ছবিতে ৫১টি অংশ বাদ দিতে বলা হয়েছিল। তখনও জরুরি অবস্থা জারি করা হয়নি। অমৃত নাহাতা সেই প্রস্তাবকে অবস্তব বলে মনে করেছিলেন। তখনও ছবিটি পাঠানো হয়েছিল সংস্কৃতি মন্ত্রকে এবং সেটি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।

দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা জারির ফরমানে যে দিন সই করলেন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ, সেই রাতে দিল্লির বিভিন্ন সংবাদপত্র দপ্তরে লোডশেডিং করিয়ে দেওয়া হয় যাতে পরের দিন কোনও বিরূপ সংবাদ প্রকাশিত হতে না পারে। তখন খবরের কাগজ ছাড়া বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যম বলতে আকাশবাণী ও দূরদর্শন— দুই-ই সরকারের অধীনে। তা তা নিয়ে সমস্যা ছিল না। ২০ মাস ধরে চলতে থাকল সংবাদপত্রের উপরে নজরদারি।

সেই সময়ে শক্তিশালী সংবাদপত্র দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয় থেকে বিভিন্ন শব্দ সেন্সর করার পরে সেই অংশ সাদা রেখে পরের দিন সংবাদপত্র প্রকাশ করা হয়। শঙ্করস উইকলি বন্ধ হয়ে যায়। কার্টুনিস্ট শঙ্কর ছিলেন জওহরলাল নেহরুর সুহৃদ, তাই ইন্দিরা তাঁর পত্রিকায় কলম চালাবেন, সম্ভবত তা তিনি মেনে নিতে পারেননি।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা নিয়ে যে সব অভিযোগ সম্প্রতি উঠেছে, তারও জবাব এই জরুরি অবস্থার দিন মনে করিয়ে দেওয়া।

আবার কি জরুরি অবস্থা?

১৯৭৪ সাল থেকেই দেশ জুড়ে যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, তা যখন দানা বাঁধছে, তখনই সেই মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করলেন ইন্দিরা গান্ধী। ক্ষমতা হারানোর ভয় করছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। এখন কি নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতা হারানোর ভয় পাচ্ছেন বা তা থেকে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন?

deoras-inside_063018_070218084638.jpgবিজেপির দাবি, তখন প্রতিবাদ করেছিল সঙ্ঘ পরিবার। হুইল চেয়ারে দেওরস

নরেন্দ্র মোদী ভয় পাচ্ছেন কিনা সেটি অন্য প্রসঙ্গ, তবে দেশে আবার যে জরুরি অবস্থা জারি হবে না,সে কথা হলফ করেই বলা যায়। বিশ্বজোড়া ইন্টারনেটে এখন খবর হাতের মুঠোয়। একদলীয় শাসনের মতো সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা এখন বেশ মুশকিল, অন্তত ভারতের প্রেক্ষিতে। তা ছাড়া সেই অবস্থার কথা মনে করিয়ে, খোঁচা মেরে আরও একবার ক্ষমতায় ফিরতে চাইবেন নরেন্দ্র মোদী, তিনি চাইবেন না নিজের রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দিতে।

উত্তরপ্রদেশে জোটে ধাক্কা

জরুরি অবস্থার অবসানের পরে দেশে জনতা সরকার তৈরি হয়েছিল। সেই জনতা দলের বিভিন্ন শাখা এখন সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, বিজেপি, বিজু জনতা দল, জনতা দল (সেকুলার) সহ অনেকেই। বিজেপি ছাড়া বাকি দলগুলি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারে আগামী লোকসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে, কর্নাটকে তাদের এক মঞ্চে দেখাও গেছে।

বিজেপি জনতা দলের এই সব শাখা-প্রশাখা যদি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধতে যায়, তা হলে পুরোনো কথা মনে করিয়ে বারে বারে তাদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে বিজেপি। তাই উত্তরপ্রদেশে তাদের জোটের পথে কাঁটা হতে পারে সেই ইমার্জেন্সির পুরোনো ক্ষত। এতে জোটের প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার পথে বাধা পেতে পারে কংগ্রেস।

কর্নাটকে কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে যে কুমারস্বামী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, সেই কুমারস্বামীর বাবা তথা জনতা দল সেকুলারের প্রধান এইচডি দেবগৌড়াও এখনই মনে করতে শুরু করেছেন, উত্তরপ্রদেশে জোট হবে শুধুমাত্র সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজপার্টির। ইমারজেন্সির কালোদিনের দায়, গণতন্ত্র হত্যার কাদা তাঁরা গায়ে মাখতে চাইছেন না।

বরুণ গান্ধীর আরও কোণঠাসা অবস্থা

সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে যে বিজেপিতে কোণঠাসা বরুণ গান্ধী এবার কংগ্রেসে যোগ দিতে পারেন। তাঁর মা তথা সঞ্জয় গান্ধীর স্ত্রী মানেকা গান্ধী নামে মন্ত্রী হলেও দলে তাঁর তেমন কদর নেই। বরুণেরও তথৈবচ অবস্থা। এখন বরুণ যদি কংগ্রেসে ফেরেন তা হলেও সেই জরুরি অবস্থা তাঁর পিছু ছাড়বে না। মানেকা কী করতে চলেছেন তা নিয়ে এখনও অবশ্য কোনও খবর নেই সংবাদমাধ্যমে।

যাই ঘটুক, বরুণ গান্ধী এখন বিজেপিতে থাকলেও কোণঠাসাই থাকবেন, আর কংগ্রেসে যোগ দিলেও খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রীর ঔদ্ধত্য বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে তিনি বিজেপিকে আক্রমণ করতে গেলেই তাঁর বাবার প্রসঙ্গ তুলবে বিজেপি। তার মোক্ষম জবাব খুঁজতে হবে বরুণ গান্ধীকেও।

এক কথায় জরুরি অবস্থা হল এমন এক পাখি যে পাখি দিয়ে বিজেপি বহু পাখিই মারতে পারছে। তাই এই জরুরি অবস্থার কথা তুলে বিজেপির রাজনৈতিক লাভ যে হচ্ছে এবং এটি যে যথেষ্ট ভাবনা-চিন্তা করেই করা হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

বিরোধীরাই মোদীর সম্পদ

২০১৪ সালে ভোটের আগের কথা ভাবুন। চা-ওয়ালা বলে নরেন্দ্র মোদীকে বিদ্রুপ করতেই কী ভাবে তাকে কাজে লাগালেন। এই চা-ওয়ালা ইস্যু ও মোদীর নিজের অব্রাহ্মণ হওয়াকে কাজে লাগালেন। বললেন এ থেকেই প্রমাণ হচ্ছে বিজেপি শুধু উচ্চবর্ণ ও ধনীদের দল নয়। দেশ জুড়ে শুরু করলেন চায়ে পে চর্চা । মোদী-হাওয়ার তেজ বাড়ল। খোঁচা বাড়ল পরিবারতন্ত্র নিয়ে। তারপরে রাহুল গান্ধীকে পাপ্পু নাম দিয়ে প্রচার শুরু হল। কিন্তু গুজরাট ভোটের সময় কমিশন স্পষ্ট করে দিল, সোজাসুজি-ইঙ্গিত-- কোনও ভাবেই পাপ্পু নাম ব্যবহার চলবে না। সেই সময় বিরোধীরাই ইমার্জেন্সি, সুপার ইমার্জেসি এ সব বলতে শুরু করল। চা-ওয়ালার মতো সেটাকেও কাজে লাগালেন মোদী।

ফেরা যাক ১৯৭৪ সালে। আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন জেপি, মানে জয়প্রকাশ নারায়ণ। পাটনা থেকে সেই ডাক ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে। বিপ্লব ঘটাতে চলেছেন জর্জ ফার্নান্ডেজ। তখনই দেশ জরুরি অবস্থা জারি হল। সব দলকে এক ছাতার তলায় এনে একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দেওয়াতে সক্ষম হলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ। পরাজয় ঘটল ইন্দিরা গান্ধীর। আর এখনও বিরোধীরা বলছেন দেশে সুপার ইমার্জেন্সি চলছে। তাই তাঁরাও চাইছেন একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দিতে, নরেন্দ্র মোদীকে পরাজিত করতে। একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দিলে তাঁকে পরাজিত করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু জোট গড়ার মতো নেতা কই? 

রাহুল গান্ধী যে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ, তা বারে বারেই প্রমাণিত হচ্ছে। কর্নাটকে কংগ্রেস বিপরুল ভাবে পরাজিত হয়েছে, যদিও সেখানে সরকার গড়া হয়েছে তাদের সমর্থনে। কিন্তু তাঁর মাকে বিদেশে চিকিৎসা করতে নিয়ে যাওয়া নিয়ে তিনি যে টুইট  করেছিলেন, তার পরেও তাঁকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল। 

দেশে বাকি আঞ্চলিক দলের প্রধানদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তীব্র বাসনা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। তাঁরা সকলেই প্রধানমন্ত্রী হতে চান। কিন্তু কোন দলের ৪০টির বেশি আসনে জেতার ক্ষমতা আছে? ৮০ আসনের উত্তরপ্রদেশে জোট হলে, কোনও একটি দলের ভাগে ৪০টির বেশি আসন পড়বে না, অন্তত এখনও পর্যন্ত সম্ভাবনা তেমনই। মহারাষ্ট্রে এনসিপির এমন ক্ষমতা নেই যে ৪৮টি আসনের মধ্যে ৪০টির বেশি আসনে জিতবে। এর বাইরে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোনও রাজ্যে ৪০টির বেশি আসনই নেই। তাই বিরোধীরা যদি সেই সময় জনতা দলের মতো কোনও সংগঠন তৈরি করতে না পারে তা হলে জোট গড়া মুশকিল হবে। আর একজন জেপি থাকলে হয়তো বিজেপিকে হেলায় হারাতে পারত অ-বিজেপি শক্তি।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment