কেরলের কমরেডরা বঙ্গ ব্রিগেডের ৭৮ সালের লড়াইকে আজ সামনে রেখে এগোতে পারেন

সেই প্রথম ভারতবাসী দেখে ছিল মানুষের বিপদে একটি রাজনৈতিক দলের মরণপণ ভূমিকা

 |  4-minute read |   27-08-2018
  • Total Shares

খবরের কাগজ ও টিভির পর্দায় রোজই এখন বন্যা বিধ্বস্ত কেরলের ছবি। সেখানকার বাম সরকার এবং বন্যা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে দেশের অগণিত মানুষ। ত্রাণের সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন সমাজসেবী সংগঠন, কেন্দ্রীয় সরকার, সাধারণ মানুষ এমনকি কয়েকটি রাষ্ট্রও।

বন্যা দুর্গত কেরলে ছবি দেখতে দেখতে মনে পড়ল ১৯৭৮ সালের পশ্চিমবঙ্গের বন্যার কথা। সেই সময় আমার বয়স ছিল আট বছর। তাই চোখে দেখার অভিজ্ঞতা নেই কিন্তু রয়েছে কানে শোনা অদম্য লড়াইয়ের কথা। ১৯৭৮ সালে রাজ্যের প্রথম বামফ্রন্ট সরকারে বয়স ছিল এক বছর। ১৯৭৮ সালে ভারতে যে অভিনব ও যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল তা হল পঞ্চায়েত নির্বাচন।

সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের ২০টি জেলার জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ন'কোটি। এই জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বেশি মানুষ বাস করতেন গ্রামাঞ্চলে। সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত নির্বাচন করেছিল। পশ্চিমবঙ্গই ছিল প্রথম রাজ্য যেখানে পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রথম রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছিল। সেই পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়েছিল বামফ্রন্ট। তখন রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত দলীয় চিঠিতে বলেছিলেন, "পঞ্চায়েত হল এমন এক অস্ত্র যা সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারলে বিরোধীদের কচুকাটা করা যাবে। আর, তা না করতে পারলে, নিজেদেরই কাটা পড়তে হবে।"

body1_082718041602.jpgবন্যা দুর্গত কেরলে ছবি দেখতে দেখতে মনে পড়ল ১৯৭৮ সালের পশ্চিমবঙ্গের বন্যার কথা

সেই সময় দলের মুখপত্র গণশক্তিতে দলের কর্মী ও সমর্থকদর বন্যাত্রাণে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে ছিলেন প্রমোদ দাশগুপ্ত। গণশক্তিতে তিনি বলে ছিলেন, "পশ্চিমবঙ্গে কোটি কোটি মানুষ বন্যা কবলিত। তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বন্যা ত্রাণে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। দুর্গত মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ।"

১৯৭৮ সালে ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টি শুরু হয়ে ছিল। বৃষ্টি চলেছিল চার-পাঁচদিন। ওই কয়েকদিনে বৃষ্টি হয়ে ছিল ৯৪৪.৭ মিলিমিটার। কোথাও কোথাও জল উঠেছিল ১৮ ফুট। বন্যা দুর্গত মানুষের সংখ্যা ছিল দু'কোটিরও বেশি। যে বন্যা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ মানুষের প্রতি বছরের সঙ্গী ছিল সেই বন্যাই প্রত্যক্ষ করে ছিল ১৯৭৮ সালে কলকাতা, শহরতলি, হাওড়া, ব্যান্ডেল, তারকেশ্বর, কাটোয়া, বর্ধমান, কৃষ্ণনগর, ডায়মন্ড হারবারের শহুরে এলাকা।

১৯৭৮ সালের বন্যা লোকমুখে ইতিহাস হয়ে আছে, আজও তা ভোলেনি বাংলার মানুষ। সেই ৪০ বছর আগে সেচ ও নিকাশি ব্যবস্থা এবং বাঁধের জল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এতটা উন্নত ছিল না। কেন্দ্রীয় সরকারেরও এখনকার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার করার মতো সক্ষম ও সবল বাহিনী ছিল না। আকাশ পথে ত্রাণ জোগানোর মতো তেমন উন্নত হেলিকপ্টারও ছিল না।

body_082718041654.jpgসে বার ত্রাণ বিলিতে সিপিএম পরিচালিত পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে দুর্গতরা কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেনি [ছবি: ইন্ডিয়া টুডে]

পঞ্চায়েতে সদ্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত সিপিএম পার্টি মানুষের পরিত্রাতার ভূমিকায় নেমে ছিল। গ্রামবাংলা জুড়ে দুর্গত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পার্টির কর্মী ও সমর্থকরা। সিপিএমের দলীয় নথি বলছে ত্রাণ দিতে গিয়ে ৪২০জন পার্টিকর্মীর মৃত্যু হয়ে ছিল। তার আগে পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের ভরসা ছিল রামকৃষ্ণ মিশন ও ভারত সেবাশ্রমের মতো সংগঠনগুলি। সেই প্রথম ভারতবাসী দেখে ছিল মানুষের বিপদে একটি রাজনৈতিক দলের মরণপণ ভূমিকা। যার রাজনৈতিক ফসল দীর্ঘদিন ধরেই সিপিএমের গোলায় উঠেছিল।

একই সঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারে সেই এক বছর বয়েসেই বন্যা ঘিরে কেন্দ্র রাজ্য বিরোধের সূত্রপাত হয়ে ছিল। কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণের অভিযোগ তুলে ছিল সিপিএম। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র বলে ছিলেন, "দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে না কেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিমাতৃসুলভ আচরণ করছে।"

কেন্দ্র রাজ্য এই বিরোধের জের আরও দেড় দশক গড়িয়ে ছিল।

body2_082718041732.jpgকেরলের কমরেডরা বঙ্গ ব্রিগেডের ৭৮ সালের সেই লড়াইকে আজ সামনে রেখে এগোতে পারেন [ছবি: পিটিআই}

১৯৭৮ সালে বন্যা মোকাবিলায় মহাকরণে সর্দলীয় বৈঠক ডেকে ছিলেন জ্যোতি বসু। সেই বৈঠকে ইন্দিরা কংগ্রেসের কোনও প্রতিনিধি যাননি। বিধানসভায় বন্যার ভয়াবহ ক্ষয় ক্ষতির পরিসংখ্যান দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। তিনি বলে ছিলেন, "সমস্ত জেলা থেকে এখনও সব খবর পাওয়া যাচ্ছে না। বন্যার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এক কোটিরও বেশি মানুষ বন্যা পীড়িত বলে প্রাথমিক হিসেবে পাওয়া গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত পাওয়া হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ ৬৪ কোটি টাকা। কেন্দ্রের কাছে ৩০ কোটি টাকা সাহায্য চাওয়া হয়েছে। কেন্দ্র তেমন ভাবে সাড়া দেয়নি।"

সে বার ত্রাণ বিলিতে সিপিম পরিচালিত পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে দুর্গতরা কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেনি ,রাজনৈতিক রং না দেখে ও এতটাই স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে ছিল সিপিএম পরিচালিত পঞ্চায়েত।

আজ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে কেরল ব্রিগেড দমিয়ে রেখেছে বঙ্গ ব্রিগেডকে। তবে কেরলের কমরেডরা বঙ্গ ব্রিগেডের ১৯৭৮ সালের সেই লড়াইকে আজ সামনে রেখে এগোতে পারেন।

তাঁদের সামনেও কিন্তু দুর্গত মানুষকে এখন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনার লড়াই। এই সময় ১৯৭৮ সালের বন্যা মোকাবিলায় যে পশ্চিমবঙ্গকে দেখা গিয়ে ছিল তা তাঁদের সামনে ধ্রুবতারা হতে পারে।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

BISWAJIT BHATTACHARYA BISWAJIT BHATTACHARYA

Veteran journalist. Left critic. Political commentator.

Comment