প্রধানমন্ত্রী পদে এখন বিরোধীদের প্রথম পছন্দ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
তিনি যে মোদী-বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব দিতে চান, তা কংগ্রেসকে অস্বীকার করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন
- Total Shares
কালীঘাটের কালী মন্দির তো ছিলই, ঢিল ছোড়া দূরত্বে অবস্থিত হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনও এখন শহরের একটি দ্রষ্টব্য স্থান। দোরগোড়ায় ২০১৯ সাধারণ নির্বাচন। তাই গোটা দেশ জুড়ে রাজনৈতিক ঝড় বয়ে চলেছে। ঠিক এই মুহূর্তে মমতার কালীঘাটের বাসভবন কিন্তু দেশের অন্যতম রাজনৈতিক তীর্থকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। মমতা নিজে অবশ্য গোটা পশিমবঙ্গকে নিজের বাসভবন বলেই মনে করেন।
দেশের বহু রাজনৈতিক নেতাই এখন মমতার খোঁজ করছেন।যখনই কেউ এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মমতার সঙ্গে একবার সাখ্যাত করে যান। মুখ্যমন্ত্রীর দরজা অবশ্য সকলের জন্য খোলাই রয়েছে, এমনকি তা চির-প্রতিদ্বন্ধী সিপিএমের জন্যও।
এনসিপির শীর্ষ নেতা শরদ পাওয়ারের প্রতিনিধি হিসেবে কয়েক সপ্তাহ আগে প্রফুল্ল পটেল মমতার সঙ্গে দেখা করে গেছেন। তেলাঙ্গনার মুখ্যমন্ত্রী কে কেন্দ্রশেখর রাও রাজ্য সদরদপ্তরে এসে মমতার সঙ্গে মমতার নেতৃত্বে অ-কংগ্রেসি ফেডারেল ফ্রন্ট নিয়ে আলোচনা করে গেছেন।
টিডিপির শীর্ষ নেতা এন চন্দ্রবাবু নাইডু সর্বপ্রথম এনডিএ ছাড়বার পরে মমতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শিবসেনা ইতিমধ্যেই মমতাকে সমর্থন করবে বলে জানিয়েছে। রাম জেঠমালানীর (যাঁকে বিজেপি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল) নেতৃত্বে একটি দল ইতিমধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছায়া-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছে।
স্বভাবতই, মমতা যারপরনাই খুশি। মনে মনে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও এই মুহূর্তে কোনওরকম অভিব্যক্তি প্রকাশে নারাজ তিনি। "আমি নেহাতই চুনোপুঁটি। ইংরেজিতে যাকে বলে লিস্ট ইম্পরট্যান্ট পার্সন বা এলআইপি। আমি ঠিক যেন সেই রামায়ণের কাঠবিড়ালীটা যে রামচন্দ্রকে সেতুবন্ধনে সাহায্য করেছিল।"
তবে হাজার চেষ্টা করলেও মমতা মাঝে মধ্যেই তাঁর ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ করে ফেলছেন। বিভিন্ন জনসভায় তিনি বলে ফেলছেন, "নিজেদের মতো করেই প্রতিবেশীদের ভালোবাসতে শিখুন।" তিনি বোঝাচ্ছেন যে ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও উত্তরপ্রদেশকে ভালোবাসাটা কতটা প্রয়োজনীয়।
একদিকে তিনি যেমন তাঁর দলের সদস্য সমর্থকদের পঞ্চায়েতে আসন সংখ্যা বাড়াবার জন্য অনুরোধ করছেন, অন্যদিকে তিনি তাঁদের দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে তো রীতিমতো বিজেপির বিরুদ্ধে রণহুঙ্কারও দিচ্ছেন, "আগে দিল্লি সামলা, পরে ভাবিস বাংলা"।
বিজেপির বিরুদ্ধে মমতার রণহুঙ্কার, "আগে দিল্লি সামলা, পরে ভাবিস বাংলা"
এর কোনওটাই কিন্তু ফাঁকা আওয়াজ নয়। দলের অভ্যন্তরীণ বৈঠকেও তিনি দলীয় কর্মীদের বলেছেন, "আপনারা পঞ্চায়েতে মনোনিবেশ করুন, আমি দিল্লি সামলাচ্ছি।"
কংগ্রেসকে অস্বীকার করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে আগামী নির্বাচনে তিনি মোদী-বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব দিতে চান। তিনি যে রাহুলকে খুব একটা পাত্তা দেন না তা এখন সকলেই জানেন। মমতা নিজেও খুব ভালো করে জানেন যে মোদী বিরোধী শিবিরে কংগ্রেস থাকা মানে রাজীব-পুত্রই সেই শিবিরের নেতৃত্ব দেবেন।
তেলাঙ্গনার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন যে বিজেপির বিকল্প কোনওমতেই কংগ্রেস হতে পারবে না। "দুটি দলের রাজনৈতিক দর্শন ভয়ঙ্কর যা দেশের জন্য ক্ষতিকারক।"
মমতা মনে করেন, যে মঞ্চটি এনডিএকে চ্যালেঞ্জ জানাবে সেখানে প্রত্যেক শরিককে সমান হতে হবে, কেউ যেন 'বড় ভাইয়ের' ভূমিকা পালন করতে না পারে। কিন্তু কংগ্রেসকে নিলে তা কখনও সম্ভব হবে না। সনিয়া থাকলে এক কথা ছিল, কিন্তু রাহুলের গল্পটা একেবারে অন্যরকম। চন্দ্রবাবু নাইডু, শরদ পাওয়ার, মমতা বন্দোপাধ্যায়, মায়াবতী বা নবীন পট্টনায়কের সঙ্গে এক পংক্তিতে তাঁকে এখনও রাখা যাবে না।
অন্য দলগুলোও কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাতে নারাজ। তবে এই দলগুলো এও মনে করছে যে নির্বাচন শেষে কংগ্রেস নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অবস্থাতে থাকবে না। গুজরাট আর কয়েকটি উপনির্বাচন ছাড়া কংগ্রেস এখনও অবধি খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। গুজরাটের ক্ষেত্রেও হার্দিক প্যাটেল ও জিগনেশ মেভানির মত আঞ্চলিক নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
উলটোদিকে, দল নির্বিশেষে মমতার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাঁর সঙ্গে অন্য দলের নেতৃত্বের ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। তারপর তিনি বামফ্রন্ট সরকারের তিন দশকের রাজত্ব গুঁড়িয়ে দিয়ে পশ্চিমবাংলায় সরকার গঠন করেছেন। লোকসভায় মাত্র একটি সাংসদ দিয়ে শুরু করে তৃণমূল এখন সংসদে তৃতীয় বৃহত্তম দল।
নোটবন্দি নিয়েও তিনিই একমাত্র মোদীর বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন। কংগ্রেসের মতো ঘরে বসে রাজনীতি করেননি। মমতা সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর তাই তো দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী পদে তিনিই এখন বিরোধীদের প্রথম পছন্দ।

