কংগ্রেস-সিপিএম ব্রাত্য থাকবে, ২০১৯ লোকসভায় তৃণমূলের টক্কর শুধুই বিজেপির সঙ্গে
স্বাধীনতার ৭০ বছর পর এই প্রথম বাংলার রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে গেরুয়া শিবির
- Total Shares
পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি ক্রমশই বদলে যাচ্ছে। ২০১৬ সালের বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফল থেকে ক্রমশ রং পাল্টাচ্ছে রাজ্য রাজনীতির। গত বিধানসভা নির্বাচনে অনুযায়ী বিজেপি চতুর্থ স্থানে শেষ করেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালেই কোচবিহার লোকসভার উপনির্বাচন থেকে বিরোধী পরিসরে স্থান বদল হয়েছে। কংগ্রেস এবং বামেদের পিছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছে বিজেপি। সাম্প্রতিক কয়েকটি উপনির্বাচন এবং পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধী ভোটাররা বিজেপিকেই বেছে নিয়েছেন।
২০১৬ সালের কোচবিহার লোকসভার উপনির্বাচন থেকেই স্পষ্ট হয়েছে কংগ্রেস ও বামেদের ভোটারদের মধ্যে যে অংশটি তীব্র তৃণমূল বিরোধী তাঁরা তৃণমূলকে জব্দ করতে বিজেপিতে আশ্রয় নিয়েছেন। সাম্প্রতিক উপনির্বাচনগুলিতে দেখা গিয়েছে যে হারে বামেরা ভোট হারাচ্ছে ঠিক সেই হরে বিজেপির ভোট বাড়ছে। বামেদের হারানো ভোটে একটা ছোট অংশ তৃণমূলে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, বামেদের হারানো ভোটে পুষ্ট হচ্ছে বিজেপি।
নয়ের দশকের শেষ থেকে সিপিআইএম নেতৃত্ব কর্মী সমর্থকদের তৃণমূল বিরোধিতাই শিখিয়ে এসেছে। ফলে, তাঁদের মধ্যে তৃণমূল বিরোধিতাই হল পাখির চোখ। ২০১১ সালে রাজ্যপাট হারায় সিপিএম। তার দু'দশক আগে থেকেই পার্টি হয়ে উঠেছিল প্রশাসন নির্ভর। গণ সংগঠনগুলো ক্রমশই সরকার টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে বাঁধা গতের আন্দোলন ছাড়া আর কিছুই করেনি। পার্টির ছোট মাঝারি বড় নেতারাও প্রশাসনকে ব্যবহার করেই রাজনৈতিক জমি ধরে রাখায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। বামপন্থী দলের জনভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামোর বদলে দলের সংগঠন প্রশাসনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। ফলে, সরকার পড়ে যেতেই সংগঠনও তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ে।
বঙ্গ রাজনীতিতে ব্রাত্য থাকবে কংগ্রেস-সিপিএম [ছবি: পিটিআই]
রাজনৈতিক পালা বদলের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক, কৃষক ও যুব সংগঠনের বামপন্থী সাইনবোর্ড তৃণমূল কংগ্রেসের সাইনবোর্ডে পাল্টে যায়। যে কর্মীসমর্থকরা ভোল পাল্টালেন না তাঁদের উপর রাজনৈতিক আক্রমণ বাড়তে থাকল কিন্তু দল তাঁদের সুরক্ষা দিতে পারল না। বামপন্থী কর্মী সমর্থকদের এই অংশটি দলের উপর আস্থা হারিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে জব্দ করার আশায় বিজেপিতে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে। ফলে, বিরোধী পরিসরের ব্যাটনটা গেরুয়া শিবিরেই চলে গিয়েছে। আর, এখান থেকেই রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলাতে শুরু করেছে।
দিল্লিতে বিজেপি উৎখাতের ডাক দিয়ে ১৯ জানুয়ারি ব্রিগেড সমাবেশ ডেকেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পাল্টা সভা ব্রিগেডই ডেকেছে বিজেপি। এই দ্বৈরথে কংগ্রেস এবং বামেরা ব্রাত্য। এই দুই দলের শক্তি যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে ব্রিগেডে সমাবেশ ডাকা তাঁদের কাছে বিলাসিতাই বলা যায়। যত লোকসভা নির্বাচন এগিয়ে আসবে ততই রাজ্য রাজনীতির রংও বদলাতে থাকবে।
বিজেপির উত্তর ভারতের রাজনীতি ক্রমশ রাজ্যে ঢুকতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই রাম নবমী ও হনুমান জয়ন্তীর আড়ালে সেই রাজনীতির রং আমরা কিছুটা দেখেছি। পুজোর পরেই রাজ্য জুড়ে রথযাত্রার কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছে বিজেপি। লালকৃষ্ণ আডবাণী যখন দলে মধ্যে গগনে ছিলেন সেই সময় দলের সংগঠন এবং জনভিত্তির হাতিয়ার হয়েছিল রথযাত্রা। আজ দলে আদবানি ব্রাত্য হলেও পশ্চিমবঙ্গে ভোট বাড়াতে সেই রথযাত্রাকেই হাতিয়ার করতে যাচ্ছে বিজেপি।
রামনবমী ও হনুমান জয়ন্তীর আড়ালে গেরুয়া রাজনীতির রং পশ্চিমবঙ্গেও দেখা গিয়েছে [ছবি: পিটিআই]
পাশাপাশি রাজ্যের জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সক্রিয় হয়েছে সঙ্ঘ পরিবার। ১৯৯৮ সাল থেকে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুল খুলতে শুরু করেছিল সঙ্ঘ। পশ্চিমবঙ্গে সেই স্কুলের সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে তিনহাজার। যেখানে যেখানে এই স্কুলগুলো তৈরি হয়েছে সেখানে সামাজিক স্তরেও তাদের প্রভাব বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ছয়ের দশক থেকে সিপিএম গণসংগঠনের মাধ্যমে সামাজিক জীবনচর্যায় ঢুকে পড়া শুরু করেছিল। সঙ্ঘ পরিবারও গত কুড়ি পঁচিশ বছর ধরে সামাজিক সংগঠনের আড়ালে জনভিত্তি তৈরির কাজ সুরে করেছে। তফসিলি জাতি ও উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে তার ফলও কিছুটা মিলতে শুরু করেছে।
পঞ্চায়েত নির্বাচনে আদিবাসী ও তফসিলি জাতি উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় বিজেপি ভালো ফল করেছে। এই সবের উপর দাঁড়িয়ে অমিত শাহরা লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ২২টি আসন জেতার লক্ষ্য যাত্রা তৈরি করেছে। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বদ্যোপাধ্যায়ও মনে হয় এই পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেছেন। তাই ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে রাজ্যের আদিবাসী ও জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে ধারাবাহিক কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছেন।
আগামী লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী যে বিজেপি তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলায় এই ছবি কখনও দেখা যায়নি।

