ভাড়া বৃদ্ধির রাজনীতি: 'গণপরিবহন রাজনীতির' প্রভাব ২০১৯ লোকসভার ভোট বাক্সে পড়বেই

শুধুমাত্র ভাড়া বাড়িয়ে বা প্রকল্প ঘোষণা করে 'খুশি' করা যাবে না ট্যাক্সি চালকদের, চাই বাড়তি কিছু

 |  3-minute read |   31-10-2018
  • Total Shares

বাস মালিকদের গোসা হয়েছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি যেখানে আকাশছোঁয়া সেখানে বাস ভাড়া বৃদ্ধির কোনও নামগন্ধ নেই রাজ্য সরকারের।

মাস কয়েক আগে (জুন মাসে) অবশ্য বাস ও ট্যাক্সি ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছিল। কিন্তু বাস মালিকদের অভিযোগ ট্যাক্সি ভাড়া যতটা বৃদ্ধি পেয়েছে তার তুলনায় বাস ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণ নিতান্তই কম। প্রতি স্টেজে মাত্র এক টাকা করে।

২০১১ সালে তৃণমূল সরকারের আসার পর সরকারি বাস ভাড়াও নানান ভাবে বাড়ানো হয়েছে। বাকি পরে রইল অটো রিক্সা। অটোর ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করে ট্রেড ইউনিয়নগুলো। আর কলকাতার অটো রুটগুলোর প্রায় সবকটাই তৃণমূলের দখলে। অথচ, তারাও নিজেদের খেয়াল খুশি মতো ভাড়া বাড়িয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি জনগণের সুবিধার্থে ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে থাকে তাহলে সেই সরকার যে দল নিয়ন্ত্রণ করছে সেই দলের শ্রমিক সংগঠন কী ভাবে নিজেদের ইচ্ছে মতো যখন তখন অটো ভাড়া বৃদ্ধি করে চলেছে?

body_103118013630.jpgপরিবহন ভাড়া নিয়ে রাজনীতি এই রাজ্যে বহুদিন ধরেই হয়ে আসছে [ছবি: পিটিআই]

আসলে, এ এক জটিল রাজনৈতিক অঙ্ক। আর দীর্ঘ দু'দশক ধরেই বঙ্গ রাজনীতিতে এক গুরত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে আসছে রাজ্যের গণপরিবহন ভাড়া। সামনে ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন। আর, তার আগে, সব পক্ষকে খুশি করতে গণপরিবহন ভাড়া নিয়ে কিছুটা রাজনীতি হবে তা তো স্বাভাবিক। বাম জমানতেও হয়েছে। তৃণমূল শাসনেও এর নিদর্শন রয়েছে।

২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর সুব্রত বক্সী প্রথম পরিবহন মন্ত্রী হন। কিন্তু দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্রের উপনির্বাচন জিতে সাংসদ হয়ে যাওয়ার পর ম্যাশ কয়েকের মধ্যে পরিবহন দপ্তরের দায়িত্ব আসে মদন মিত্রের হাতে। মদন মিত্র বহুদিন ধরে ট্যাক্সি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তাই অনেকেই ভেবেছিলেন পরিবহন মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বোধহয় ট্যাক্সি মালিকদের সুবিধাগুলোকে প্রাধান্য দেবেন।

কিন্তু তিনি উল্টো পথে হাঁটলেন। সংগঠনগুলোর ভাড়া বৃদ্ধির আর্জিতে সাড়া তো দিলেনই না। উল্টে, যাত্রী প্রত্যাখ্যান করলে জরিমানার পরিমান রাতারাতি ৩,০০০ টাকা করে দেওয়া হল তাঁর আমলে। এর খেসারতও দিতে হয়েছে।

২০১৪ সালের অগাস্ট মাস থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ অবধি কম করে ১১দিন কোনও ট্যাক্সি চলেনি মহানগরের বুকে। অথচ, মালিকরা এই আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেননি। ট্যাক্সি চালকদের এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সিটু। কিন্তু শহরের ট্যাক্সি চালকদেরসিংহভাগ গো-বলয়ের আর তাই অনেকেই মনে করেন এই আন্দোলন সফল করতে পিছন থেকে মদত দিয়েছিল বিজেপিও।

এই পরিস্থিতিতে ট্যাক্সি চালকদের খুশি করতে আসরে নামতে হল স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ২০১৫ সালের পুরসভা নির্বাচন ও ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন ঠিক আগেই, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে, যাত্রী প্রত্যাখ্যান জরিমানা কমিয়ে দিলেন তিনি। রাতারাতি ৩,০০০ টাকা থেকে তা আবার নেমে এল মাত্র ১০০ টাকায়। এছাড়া, চালকদের জন্যে সরকারি স্বাস্থ্য বীমা ও অবসরোত্তর ভাতার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে ৬০ বছর পূরণ করলে একজন ট্যাক্সি চালক মাসে ১,৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। তাঁর মৃত্যুতে তাঁর পরিবারবর্গকে ৭৫০ টাকা করে দেওয়া হবে।

body1_103118013728.jpgট্যাক্সি চালকদের খুশি করতে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকেও আসরে নামতে হয়েছিল [ছবি: রয়টার্স]

মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণাগুলো অনেকেই সেই সময় 'রাজনীতির গন্ধ' পেয়েছিলেন। দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে শহর বসবাসকারী গো-বলয় থেকে আগত ট্যাক্সি চালকদের ভোট যাতে বিজেপির ঝুলিতে না যায় তিনি সেটাই নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। কিছুটা সফলও হয়েছিলেন।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে আবার শুরু হয়ে গেল গণপরিবহন ভাড়া নিয়ে রাজনীতি। নির্বাচনের বছর খানেক আগে সরকার বাস ও ট্যাক্সি ভাড়া বৃদ্ধি করল। অবশ্য, কেন্দ্রীয় সরকারের ঘরে বন্দুক ঠেকিয়ে। সরকারের বক্তব্য জ্বালানির ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির জেরে সরকার নাকি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।

কিন্তু বিধি বাম। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এখনও বেড়েই চলেছে। আবার আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাস মালিকরা। ট্যাক্সি মালিকরাও যে কোনও মুহূর্তে আন্দোলনে নেমে পড়তে পারেন। তাঁরাও বুঝে গিয়েছে নির্বাচনের আগের সময়টাই দাবি আদায়ের সেরা সময়। ওদিকে সরকার আবার জনগণকেও চটাতে চাইবে না। এখন দেখতে হবে জনগণ ও পরিবহন মালিক এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সরকার সব পক্ষকে 'খুশি' করতে পারে কিনা।

তবে শুধুমাত্র 'ভাড়া রাজনীতি' দিয়ে চালকদের কিন্তু খুশি করা যাবে না। শহরের বেশ কিছু অঞ্চলে অহরহ ট্রাফিক আইন ভাঙলেও পুলিশের তরফ থেকে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অথচ, ট্যাক্সি চালকদের অভিযোগ, ট্র্যাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানার টাকা মেটাতে তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। আর, ট্যাক্সি চালকদের এই ক্ষোভটাই কিন্তু বিজেপির তুরুপের তাস হয়ে উঠতে পারে।

একটা কথা অনস্বীকার্য। এ রাজ্যে গণপরিবহন নিয়ে রাজনীতির প্রভাব যে ভোট পড়বেই। রাজনীতির ক্ষীর কোন দলটি খাবে তার উত্তর জানতে আর মাত্র কয়েক মাসের অপেক্ষা।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

ARPIT BASU ARPIT BASU @virusfound007

Arpit Basu is the Special Correspondent with the India Today Group’s fact check team. With more than one-and-a-half decade's experience in print and digital media, he has reported on aviation, transport, crime, civic and human interests issues. His sting operation on how precious Aviation Turbine Fuel, meant for Kolkata airport, was pilfered and sold in local market as ‘white kerosene’ received widespread acclaim. Arpit has worked with reputed media houses like The Times of India and Hindustan Times and had received letter of appreciation for reporting during the Phalin cyclone in Odisha in 2013.

Comment