পরিচয়ের প্রমাণের আড়ালে আধার আসলে নজরদারির অস্ত্র
সব ক্ষেত্রেই আধার সংযুক্তিকরণ ভবিষ্যতে সমস্যার কারণ হতে পারে
- Total Shares
প্রথমদিকে অবশ্য নজরদারি করার জন্য আধার চালু হয়নি। ২০০৯ সালে আধার শুধুমাত্র পরিচয়ের প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করবার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যার ফলে দেশের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে আরও স্বচ্ছতা আনা যাবে। কতকটা সে জন্যই প্রযুক্তির নাম ‘আধার’ রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে যে ভাবে এই প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য বদলে ফেলে তা চটজলদি চালু করা হল, তাতে মনে হচ্ছে এই সংযুক্তিকরণ সত্যিসত্যিই দ্রুত চালু হয়ে যাবে। আধারের অনেকগুলো সমস্যা রয়েছে। কিন্তু প্রধান সমস্যা হল, এই প্রযুক্তি সরকার ও আমলাদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা দিয়ে দিয়েছে। তাই সংযুক্তিকরণের পরিবর্তে তার উল্টোটা করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে চলেছে এই আধার।
শুরুর দিনগুলোতে একবারের জন্যেও আঁচ করা যায়নি যে আধার একদিন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠবে। কিন্তু ২০১৮ সালে আধার প্রতিটি নাগরিকের উপর নজরদারি করার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অনেকেই যুক্তি দিয়েছিলেন আধার নাকি দেশের দুর্নীতি রোধ করতে সাহায্য করবে। এই দশকের শুরুতেই সেই তর্কের নিস্পত্তি হয়ে গেছে।
২০১২ র পরে, বিশেষ করে ২০১8 র পরে, আধারের পরিধি এতটাই বেড়েছে যে তা সূচনার সময় কল্পনাও করা যায়নি। এর কারণ আধার বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ইউআইডিএআই-এর (এই সংস্থাটি আধার প্রযুক্তির দায়িত্বে) হাতে। আধার প্রক্রিয়াকেও যথাসম্ভম গোপনীয় ও অস্বচ্ছ করে ফেলা হয়েছে।
আধার এমন এক ভয়ানক অস্ত্র যা দিয়ে প্রতিটি নাগরিকের উপরে নজর রাখতে পারে রাষ্ট্র
এবার আধারকেন্দ্রিক দুটি মজার তথ্যে আসা যাক।
এক নম্বর: আপনি কি জানেন যে আধার আইন, ২০১৬ অনুযায়ী ইউআইডিএআই-কে কোনও জবাবদিহি করতে হবে না? কিন্তু, আইন অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিকরা আধারের অপব্যবহার হলে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবে না।
দু’নম্বর মজার তথ্য। আপনি কি জানেন আধার কোনও দিনও পরিচয়পত্র হিসেবে গণ্য করা হয়নি? শুরুর দিকে আধারের প্রচলন শুধুমাত্র জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা মাথায় রেখে। যেমন বহুকাল থেকেই এদেশে রেশন তোলার জন্য রেশন কার্ড বাধ্যতামূলক ছিল। তাও সরকার যখন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী রায়ের পরে যেখানে শীর্ষ আদালত জানিয়েছিল যে আধার কখনোই বাধ্যতামূলক করা যাবে না।
কিন্তু ২০১৫ সালের পরে সব রকম বাধাই ভেঙে পড়ল। এর মধ্যেই, আধার আর শুধুমাত্র জনকল্যাণ প্রকল্পের প্রাপকদের চিহ্নিতকরণের প্রযুক্তি রইল না। আধার এ দেশের নাগরিকদের সব ব্যাপারে সংযুক্ত করার মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। ২০১৮ সালে এসে আপনি যদি সরকারি নির্দেশিকা দেখেন, তা হলে বুঝতে পারবেন যে আপনি যাই করতে যান না কেন, সব কিছুতেই আধার সংযুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক। রেশন কার্ডের মতো এখন আর শুধু জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য আধারের ব্যবহার সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফোন চালু রাখতে হলেও আধার বাধ্যতামূলক।
ব্যাঙ্কের পরিষেবা পেতে গেলে ৩১শে মার্চ অবধি আধার বাধ্যতামূলক নয়। সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি চলছে। সম্প্রতি এই সংযুক্তিকরণ অনির্দিষ্ট কালের জন্য পিছিয়ে স্থগিত হয়ে গিয়েছে। তবে এখনও দেশের বিভিন্ন জায়গায় জন্ম ও মৃত্যু পঞ্জীকরণ করতে গেলে আধারের প্রয়োজন পড়ছে। রান্নার গ্যাসের সংযোগ নিতে গেলেও আধার দরকার হচ্ছে, তা আপনি ভর্তুকি না চাইলেও।
সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করতে গেলেও আধার প্রয়োজন। স্নাতক স্তরের ফল হাতে পেতে বা হাসপাতালে ভর্তি হতে গেলেও আধার দরকার হচ্ছে। এ তো সবে শুরু। সব ক্ষেত্রে আধার সংযোগ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা চলছে, আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দিলে আরও ভয়াবহ দিনের জন্যে অপেক্ষা করুন।
বিমানের টিকিট কেনা হোক বা হোটেল বুকিং, একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারেও আধার বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে।
আধার কী ভাবে এতটা ব্যাপ্তি পেল, এটা জানা খুবই দরকারি। সন্তানের স্কুল বা মোবাইল ফোন কিংবা অন্য কিছুর সঙ্গে আধার লিঙ্ক করে দিয়ে সরকার কিন্তু কোনও কারও পয়সা বাঁচাচ্ছে না, সরকার কোনওরকম দুর্নীতিও ঠেকাচ্ছে না। সরকার শুধুমাত্র এমন একটি পরিকাঠামো স্থাপনের চেষ্টা করছে যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ নজরদারি যন্ত্র, যে যন্ত্রের সাহায্যে নাগরিকদের সব ব্যাপারেই উপরেই নজরদারি করবে রাষ্ট্র।
এটা ঠিক যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনএসএ আরও বড়। কিন্তু এনএসএ-এর সাহায্য মার্কিন প্রশাসন শুধুমাত্র সে দেশে বসবাসকারী বিদেশিদের উপরে নজরদারি করে।
গত কয়েক বছরে আধারকে একটি আদর্শ নজরদারি যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। এই যন্ত্রের সাহায্যে প্রতিটি ভারতীয়র প্রতিটি তথ্য এখন সরকারের হাতের মুঠোয়। এই তথ্যগুলো আধারের তথ্যভাণ্ডারে একত্রিত করা রয়েছে। সরকার এবার নিজের প্রয়োজন ও সুবিধা মতে প্রতিটি নাগরিকের জন্য আলাদা প্রোফাইল তৈরি করবে।
অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন যে অনলাইনে টিকিট কেটে বা রান্নার গ্যাসের নতুন কানেকশন নিয়ে কিংবা হোটেল বুক করে আমরা যে ডিজিটাল পথে হাটছি তাতে আর আলাদা করে আধারের প্রয়োজন নেই। যুক্তিতা অকাট্য। কিন্তু, তা সত্ত্বেও সরকার আধার বাধ্যতামূলক করে আমাদের সমস্ত তথ্য সম্মিলিত করতে মরিয়া যাতে সরকারের নজরদারির সুবিধা হয়।
গোটা বিশ্বেই সরকার নাগরিকদের নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। ইতিহাস সাক্ষী, নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলেই সরকার তার অপব্যবহার করে। ব্যাপারটা অনেকটা এক হলেও, এর আগে কোনও সরকারই নজরদারি যন্ত্র তৈরি করে নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেনি। এই মুহূর্তে যদি আধার ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তা হলে পরিণাম কিন্তু মোটেও সুখের হবে না।

