আধারের জন্য মুখের স্ক্যান করা মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়, বরং খুবই অপরিণত সিদ্ধান্ত
এ দিয়ে কাজের কাজ কিছু হবে না, উল্টে নজদারি অন্য মাত্রায় পৌঁছে যাবে
- Total Shares
ইউএডিএআই নামে যে সংস্থাকে আধারের ভার দেওয়া হয়েছে, মাসখানেক আগে তারা একটা দারুণ পরিকল্পনা করে। ভার্চুয়াল আইডি, অর্থাৎ এমন একটা আইডি যেটি যুক্ত করা হবে সত্যিকারের আধারের সঙ্গে, তাতে তথ্যচুরির আশঙ্কা কমে যাবে। এটা ১ মার্চ থেকে চালু হওয়ার কথা ছিল, হ্যাঁ, কথা ছিল। কথা হল, এই বিষয়টিতে গুরুত্ব না দিয়ে, ইউএডিএআই এখন ভাবছে মুখমণ্ডল স্ক্যান করে তা দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা বা ফেস রেকগনিশনের কথা।
অবাক হচ্ছি আগের ওই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেখে। ১ জুলাই থেকেই এই পদ্ধতি চালু হওয়ার কথা, যেখানে আঙুলের ছাপে কাজ হচ্ছে না, সে ক্ষেত্রে মুখমণ্ডল স্ক্যান করে পরিচয় নিশ্চিত করা যাবে, যার নাম হবে আধার-আইফিড (আমার ধারণা এমনই নাম হতে পারে)। ইউএডিএআই-এর বেশিরভাগ পরিকল্পনার মতো এটিও প্রায় একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং অপরিণত। সত্যি কথা বলতে কী, সবচেয়ে খরাপ একটা ভাবনা। এর দুটি কারণ আছে, প্রথমত এটা অবাস্তব এবং এমন একটা ব্যাপার যা দিয়ে কাজের কাজ করা মুশকিল। দ্বিতীয়ত এর ফলে নজরদারি অন্য মাত্রায় পৌঁছে যাবে। একটু বুঝিয়ে বলি। যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে ইউআইডিএআই এমন একটি সংস্থা যারা সর্বতো ভাবেই অযোগ্য। এর অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে যদি আধার এবং তা কী ভাবে প্রদান করা শুরু হল সে দিক দিয়ে বিচার করেন তা হলেই দেখবেন, এটি প্রয়োগের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অত্যন্ত দুর্বল।
ছবি: রয়েটর্স ফটো
আইনি বিচারে এটা সুপ্রিম কোর্টের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নীতিগত ভাবে এটি গরিবদের কাছে সমস্যা ডেকে এনেছে এবং সমস্যা মেটনোর বদলে নিজেই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গচ্ছিত টাকা তোলার ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে।প্রযুক্তির দিক থেকে বা যত্রতত্র তথ্য চুরির দিক থেকে বিচার করা হলে, নিরাপত্তা বিষয়ক একজন অস্ট্রেলিয় গবেষক জানিয়েছেন, এটি কলেজপড়ুয়াদের তৈরি করা প্রজেক্টের চেয়েও খারাপ। একজন ফরাসি নিরাপত্তা গবেষক তো নিত্যদিন এই আধারের তথ্য নিয়ে ছেলেখেলা করছেন।
এখন ওই ইউআইডিএআই আবার আধারের সঙ্গে মুখের স্ক্যানিং জুড়ছে। ফেস স্ক্যানিং হল আরও বেশি খরচসাপেক্ষ, কার্যকর করা আরও কঠিন এবং তর্কের খাতিরে বলা যায়, আঙুলের ছাপের থেকে এই পদ্ধতি অনেক কম নিরাপদ এবং জটিল। এর জন্য নির্দিষ্ট ও খুব দামি হার্ডওয়্যার প্রয়োজন। আইফোন X-ই একমাত্র যেটি বাজারে পাওয়াযায় এবং ফেস স্ক্যানিংয়ের সুবিধা রয়েছে। কোটি কোটি ডলার খরচ করে দীর্ঘ গবেষণায় তারা ইনফ্রা-রেড স্ক্যানার ও ডেপথ সেন্সিং মডিউলের মাধ্যমে তারা এটি করতে পেরেছে। এই সব জিনিস বাজারে এতটাই কম পাওয়া যায় যে, স্যামসাংয়ের মতো সংস্থা এ জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করতে রাজি থাকলেও তাদের এখনও দু'এক বছর অপেক্ষা করতেই হবে।
তবে আইফোন X মুখ স্ক্যানিংয়ের জন্য যে ধরণের প্রযুগক্তি ব্যবহার করে সেই ধরণের প্রযুক্তি ইউআইডিএআই ব্যবহার করবে বলে মনে হয় না। ইউআইডিএআই হয়ত একটু শস্তার প্রযুক্তি ব্যবহার করার কথা ভাবছে যাতে একটি ক্যামেরা ও লাইনকোড থাকবে। তাই তারা বলছে যে ইতিমধ্যেই আধারে যে ছবি রয়েছে তারা সেগুলিই ব্যবহার করবে। এটা ভয়ঙ্কর ভাবনা। এমনিতেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরগুলির যা মান হওয়া উচিৎ তা এখানে নেই, আর এই প্রযুক্তি শুধু আঙুলের ছাপ নেওয়ার চেয়ে কম সুরক্ষিতই নয়, এর অপব্যবহারের আশঙ্কাও প্রবল। কয়েকটি দামি অ্যান্ড্রয়েড ফোনেও, বিশেষ করে দামি ফোনগুলোয় ফেসস্ক্যানিং করার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু স্ক্যানিংয়ের বদলে ছবি দিয়ে সহজেই বোকা বানানো যায়। আধার ফেস স্ক্যানিং যন্ত্রও তেমনটি হতে চলেছে, সম্ভবত অর্ধেক সময়ই কাজ করবে না, বাকি সময় ছবি তুলবে।
ফেস স্ক্যানিংয়ের দিক দিয়ে বিচার করলে দ্বিতীয়টি বড় সমস্যা। এমনিতেই আধার নিয়ে একটা আশঙ্কা রয়েছে যে এর মাধ্যমে নজরদারি করা যায় বা করা সম্ভব। এবার মুখের স্ক্যানিং করাটা জুড়ে দিয়ে ভাবুন, নজরদারি করার ক্ষেত্রে এটা কী ভয়ানক হতে পারে। এটা কিন্তু মজার কথা নয়, সত্যি কথা।
চিনের কয়েকটি জায়গায় ইতিমধ্যেই মুখের স্ক্যানিং করা হচ্ছে। সবসময় না হলেও অনেক সময়ই, সরকার ক্যামেরার সাহায্যে আপনার গতিবিধির উপরে নজর রাখতে পারে, কারণ ক্যামেরা মুখ রেকগনাইজ করে ফেলছে। জিনজিয়াং শহরে এটি হচ্ছে। ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদন বলছে, "এর মাধ্যমে সরকার যাদের উপরে নজর রাখতে চাইছে, তাদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা-ক্যামেরা কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সর্বক্ষণ নজরদারি করা যায়। তিনি যে সব বন্ধু বা আত্মীয়ের কাছে যাচ্ছেন, প্রয়োজনে পুলিশ সেই ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে এমনকী বাড়িতে তল্লাশিও করতে পারে।"
একটা জিনিস আগেই লক্ষ্য করেছি, আধার এখন যে অবস্থায় আছে তা নিয়ে কারও খুব একটা ভয় বা আশঙ্কা নেই, কিন্তু ভবিষ্যতে এটা কী হতে চলেছে, তা নিয়ে অনেকই শঙ্কিত। সব পন্থাই যেন ভালোর জন্যই। যে ‘মহৎ উদ্দেশ্য’ নিয়ে ইউআইডিএআই এখন ফেস স্ক্যানিং করার কথা ভেবেছে, তা সত্যিই চালু করা হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ভয়ানক হতে পারে।
প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়ুন

