শুধু রাজনৈতিক কারণেই পশ্চিমবঙ্গ গেরুয়া হচ্ছে, নাকি অন্য কারণও আছে?
ট্যাক্সিচালকদের একগুচ্ছ সুবিধা দেওয়ার নেপথ্যে আসল কারণ কী?
- Total Shares
খুব সম্ভবত ১৯৯৩ সালের ঘটনা। মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে দেশজুড়ে ২৪ ঘণ্টার বনধ ডেকেছিল বিজেপি। বামপন্থী পশ্চিমবঙ্গে যার কোনও প্রভাবই পড়েনি। রাজ্যের কয়েকটি জায়গায় হাতেগোনা কয়েকজন করে গেরুয়া সমর্থক ঝামেলা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পুলিশি তৎপরতায় তাঁরা সফল হননি। মোটের উপর সেদিন রাজ্যের জনজীবন একদম স্বাভাবিক ছিল।
যে কোনও বাহানায় ছুটির দিন পালনের দুর্নাম রয়েছে বাঙালির। এই দুর্নাম কতকটা সত্য, কতকটা অর্ধসত্য। বাঙালি আসলে ভয় পেয়ে বনধের দিন বাড়িতে থাকতে পছন্দ করতেন। তাই সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে শুধুমাত্র বামফ্রন্ট বনধ ডাকলে সফল হত। জনজীবনের উপর খানিকটা প্রভাব পড়ত কংগ্রেসের ডাকা বন্ধে। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে এই রাজ্যে প্রধান বিরোধী মুখ হয়ে উঠল তৃণমূল। এবং তখন থেকেই তৃণমূলের ডাকা বনধেও বাড়ির চার দেওয়ালের মাঝে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য হতেন বাঙালি। কিন্তু বিজেপির ঘোষিত বনধে কোনও দিনও সাড়া পড়েনি এই বাংলায়।
২০১৮ সালে অবশ্য চিত্রটা একেবারে অন্যরকম। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে কাগজে কলমে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি নয়, কিন্তু পরবর্তী নির্বাচন ও উপনির্বাচনের ফলাফলে এ রাজ্যের প্রধান বিরোধী মুখ হয়ে উঠেছে বিজেপি। শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিভিন্ন জেলায় ভালো ফল করেছে গেরুয়া শিবির। বিশেষ করে আদিবাসী অধ্যুষিত ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভালো ফল করেছে বিজেপি। খাস কলকাতা শহরের বেশ কিছু এলাকাতেও বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বেড়েছে।
অনেক বিশ্লেষকই বিজেপির এই উত্থান নিয়ে নানারকম বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু সেগুলো মূলত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা বলা ভালো রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্ক ধরে বিশ্লেষণ। এর বাইরেও কিন্তু বিজেপির উত্থানের পিছনে একটি বড় সামাজিক প্রভাব রয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না এই পশ্চিমবঙ্গে একটা বড় সংখ্যক ফ্লোটিং ভোটার রয়েছে, যাঁরা কোনো সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক নন। একটি রাজনৈতিক দলের ভালো-মন্দ বিচার করে নিজেদের 'মঙ্গলের' কথা ভেবে তাঁরা পোলিং বুথে গিয়ে ভোটদান করেন (যদি না কোনও রাজনৈতিক দল তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রদান করা থেকে বিরত না করে)। আর, ফ্লোটিং ভোটারের একটা সিংহভাগ কিন্তু হঠাৎই বিজেপিকে পছন্দ করতে শুরু করে দিয়েছে।
ফ্লোটিং ভোটারের একটা সিংহভাগ কিন্তু হঠাৎই বিজেপিকে পছন্দ করতে শুরু করে দিয়েছে
তরুণ প্রজন্মের ভোটার
বাংলায় গেরুয়া হওয়া সেই অর্থে কোনও দিনও ছিল না। তার পিছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে বিজেপি এই বাংলায় নিজেদের কোনও দিনও বাঙালীকরণ করার চেষ্টা করেনি। সর্বভারতীয় দল হয়েও কংগ্রেস যা করতে পেরেছিল। এর ফলে হাতে গোনা কয়েকজন নেতা (এদের অধিকাংশই বাঙালি) ছাড়া বিজেপি নেতা-নেত্রীদের গ্রহণযোগত্য ছিল না এই বাংলায়।
বাংলা দখলের লড়াইয়ে বিজেপি যে নিজেকে শুধরে ফেলে হঠাৎই একটি 'বাংলার দলে' পরিবর্তিত হয়েছে, তা নয়। বিজেপির দলীয় সংগঠনগুলোর নামে এখনও রয়ে গেছে হিন্দির ছোঁয়া, যেমন মোর্চা। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজেপির গ্রহণযোগত্য বেড়েছে কারণ পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্ম আর বাঙালীকরণ নিয়ে ভাবিত নন। তাঁরা এখন বড্ড বেশি 'কসমোপলিটান'। দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁদের কাছে নিজেদের ভালো মন্দ বেশি প্রাধান্য পায়। যে দল যুক্তি দিয়ে কথা বলে বা যে দল তাঁদের ভালোর কথা ভেবে কাজ করবে সেই দলকেই তাঁরা ভোট দেবেন।
তাঁরা মনে করছেন এক সময়কার প্রধান বিরোধী কংগ্রেস বহু সুযোগ পেয়েছে। বামফ্রন্ট তো ৩৪ বছর এই রাজ্যে শাসন করে তৃণমূলের কাছে পরাজিত হয়েছে। এবার তৃণমূলের পরিবর্তন হিসেবে নতুন কোনও দলের প্রয়োজন, আর সেই এই তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন।
ভিন রাজ্যের ভোটার
বিজেপির এই উত্থানের আরও একটি বড় কারণ ভিন রাজ্যের বাসিন্দারা। এদের অনেকেই বহু বছর ধরে কলকাতায় বাস করছেন আবার অনেকেই কয়েকবছর হল এই রাজ্যে এসেছেন। তাঁরা কিন্তু এ রাজ্যে বিজেপির ভোট ব্যাঙ্ক উন্নত করছেন।
বছর চারেক আগে বামফ্রন্টের শ্রমিক সংগঠনের ডাকে কলকাতায় প্রায় ১১ দিন ট্যাক্সি ধর্মঘট হয়েছিল। সেই সময় খবর করতে গিয়ে জানতে পেরেছিলাম এই ধর্মঘটে প্রত্যক্ষ সায়ে ছিল বিজেপির। স্থানীয় নেতারা এই আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্যে ট্যাক্সি চালকদের (যাদের অধিকাংশই বিহার ঝাড়খণ্ড বা উত্তরপ্রদেশের) উস্কে ছিলেন।
বিজেপির এই উত্থানের বড় কারণ ভিন রাজ্যের বাসিন্দারা
ধর্মীয় কারণ
ট্যাক্সি চালকদের উস্কানি দেওয়া সহজ হয়েছিল কারণ চালকদের অধিকাংশই 'ধর্মীয় কারণে' শাসক দলের উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন।
এ দেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই ফায়দা তুলতে বিভিন্ন সম্প্রদায়কে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি করে, যাকে তোষণ করা বলা হয়। বামফ্রন্ট আমলে বামফ্রন্টও তাই করেছে বলে অভিযোগ। কিন্তু তৃণমূল আমলে এই তোষণের অভিযোগ অনেক বেশি। এর প্রভাব অনেকের রুজি-রোজগারেও পড়েছে।ভিন রাজ্য থেকে আসা এই ট্যাক্সি চালকরা দেখতে পাচ্ছেন যে শহরের বেশ কয়েকটি এলাকায় ট্রাফিক আইন ভাঙলে পুলিশ স্থানীয় ট্যাক্সি চালকদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা রুজু করে না। অথচ তাঁদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই 'লঘু পাপে গুরু দণ্ড' হয়ে যায়। স্বভাবতই, এই বৈষম্য তাঁরা মানতে পারেননি। বিশেষ করে এর প্রভাব যখন সরাসরি তাঁদের রুজি রোজগারের উপর পড়ছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে ট্যাক্সি চালকদের জন্য একগাদা প্রকল্প ঘোষণা করে তাঁদের খুশি করবার চেষ্টা করতে হয়েছিল।
শুধু ট্যাক্সি চালক বা পরিবহণ ব্যবসায়ীরা নন, এই ধারার প্রভাব পড়েছিল সাধারণ মানুষের উপরও। তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন যে গাড়ি চালিয়ে অফিস বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় আইন ভাঙলেই পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কিন্তু শহরের নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলে স্থানীয়রা খুলেআম ট্রাফিক আইন ভেঙে চলেছেন, পুলিশ দেখেও দেখছে না।
রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে অন্য ধর্মের প্রতি যে বিদ্বেষ সৃষ্টি হচ্ছে (যা ছিল না বলে পশ্চিমবঙ্গ একসময় গর্ব করত) তারই ফায়দা তুলছে গেরুয়া শিবির। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে জনসভা বিভিন্ন ভাবে বিজেপি বোঝাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে, "আমরা তোমাদেরই লোক।"
বিজেপি কতটা সফল হবে তার প্রমাণ তো ভোট বাক্সে পড়বে, তবে শেষ কয়েক বছর তো কিছুটা হলেও পড়েছেই। কাগজে কলমে বিধানসভায় তারা রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল না হলেও, ক্রমেই এই রাজ্যে বিরোধী মুখের রং গেরুয়া হয়ে উঠছে।

