শাসক দল পুলিশকে নিধিরাম সর্দারে পরিণত করেছে, তাই পুলিশকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে
রাজনৈতিক নেতা ও অর্থবানরাই শুধু নন, তাঁদের পুত্র-কন্যার হাতেও পুলিশ প্রহৃত হয়
- Total Shares
মঙ্গলবার দেশজুড়ে গণরোষে মৃত্যু নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। গণরোষে মৃত্যু বন্ধ করতে সংসদকে কড়া আইন তৈরির নির্দেও দিয়েছে শীর্ষ আদালত। দেশের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বলেছে দেশের কোনও নাগরিক আইন নিজের হাতে নিতে পারে না। তারা নিজের ইচ্ছেকে আইন বলে প্রতিপন্ন করতে পারে না। এই প্রবণতা কড়া হাতে বন্ধ করতে হবে। কোর্ট জানিয়েছে গণরোষে মৃত্যু কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে কেন্দ্রীয় সরকার যদি আইন তৈরি করে তাহলে সেই আইন বলবৎ করার দায়িত্ব বর্তাবে পুলিশের উপর। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা পুলিশের কাজ। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হল আমাদের দেশে পুলিশই বিভিন্ন সময় ক্ষুব্ধ জনতা, রাজনীতিবিদ, অর্থবান এদের হাতে লাঞ্চিত হন। গোটা দেশ জুড়ে পুলিশের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। কখনও কখনও পুলিশ চৌকি অথবা থানা আক্রান্ত হচ্ছে।
মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা অথবা উত্তরপূর্ব ও উত্তর-পূর্বের রাজ্য, কাশ্মীরের উপদ্রুত অঞ্চলে পুলিশ আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ওই সমস্ত এলাকা বাদে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পুলিশের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেশি। থানায় ঢুকে পুলিশকর্মীদের উপর দুষ্কৃতীরা চড়াও হয়েছে আর পুলিশকর্মীরা প্রাণ ও মান বাঁচাতে টেবিলের তলায় ঢুকে পড়েছেন সেই ছবিও আমরা দেখেছি।
পুলিশ এখন নিধিরাম সর্দার
প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও অর্থবান মানুষেরাই শুধু নয়ে তাদের পুত্রকন্যার হাতেও পুলিশের মার খাওয়ার দৃশ্য আমরা দেখেছি। ভারতবর্ষে কোনও কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। পুলিশ বাহিনীরও টিকি বাঁধা থাকে রাজনৈতিক কর্তাদের হাতে। আমাদের দেশে কে না জানে রাজনীতির কারবারিদের প্রভাব প্রতিপত্তি আকাশ স্পর্শ করেছে। ফলে রাজনৈতিক কতৃত্ব যাদের হাতে থাকে তারা পুলিশকে বশংবদ হিসেবেই ব্যবহার করে থাকেন।
ফলে, রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্তে যাঁরা থাকেন শুধু তারাই নয় তাঁদের আত্মীয়-স্বজন চেলা চামুন্ডা প্রত্যেকেই পুলিশকে পাঞ্চিং ব্যাগ হিসেবে দেখে থাকেন। তাঁরা যা বলবেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন না করলেই পুলিশের বিপদ। সংসার চালাতে হলে চাকুরিজীবীদের অনেক কিছুই মেনে নিতে হয় তাই সবাই প্রতিবাদ করতে পারে না। কখনও কখনও দু'একজন প্রতিবাদ করেই ব্যতিক্রমকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
পুলিশের এই অবস্থা একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই এখানে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থেকেছে তারাই পুলিশকে ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারে পরিণত করেছে।
নিরাপত্তা রক্ষীদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়েছিল সম্ভবত ইন্দিরা গান্ধীর আমলে। তার পরে দেশের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই ধারা অপরিবর্তিত থেকে গিয়েছে। উল্টে, যত দিন গিয়েছে ততই রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনে ঠুঁটো জগন্নাথ করা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। যার ফল আজ দেখা যাচ্ছে।
পুলিশকর্মীদের মারধর করে পার পেয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। রাজনৈতিক দাদাদের ছত্রছায়ায় থাকলে সাত খুন মাফ। তাই পুলিশকর্মীদের মারধর করে পার পেয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। দেশের শীর্ষ আদালত মঙ্গলবারের নির্দেশে স্পষ্ঠ জানিয়েছে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা বরদাস্ত করা হবে না।
এখন প্রশ্ন হল, এই প্রবণতা রক্ষার দায়িত্ব যাদের উপর বর্তাবে সেই পুলিশকর্মীরাই তো আক্রান্ত হচ্ছেন কিছু লোকের আইন হাতে তুলে নেওয়ার কারণে।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে আমাদের দেশের পুলিশকর্মীরা যথেষ্ট প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কাজ করেন। তাদের কাজ করতে হয় এমন অবস্থায় দেখা যায় অনেক সময়ে পর্যাপ্ত গাড়ি থাকে না, হাতে অস্ত্র থাকে না, যথেষ্ট প্রশিক্ষণের অভাব থাকে। কর্মী সংখ্যা কম হওয়ার কারণে পুলিশকর্মীরা বিশেষ ছুটি নিতে পারেন না।
এই দিকগুলোতে প্রশাসকদের বিশেষ নজর নেই। পুলিশ রিফর্মের কথা দীর্ঘদিন ধরেই শোনা গেলেও সেই কাজ এক পাও এগোয়নি। এই অবস্থায় পুলিশকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

