রথযাত্রায় রাজ্যের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিকে কেন হাতিয়ার করতে চাইছে বিজেপি
এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছে বিজেপি
- Total Shares
যথা ধর্মস্ততো জয়ঃ।।
এই সারবত্তাটি অনেকদিন আগেই বুঝেছে বিজেপি। ১৯৯০ সালে লালকৃষ্ণ আডবাণীর রথের চাকা আটকে দিয়েছিলেন বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব। কিন্তু রথের গতি রুদ্ধ করতে পারেনি। এখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এই দলটি শুধু দেশই চালাচ্ছে না, একক ভাবে বা জোট বেঁধে অন্তত কুড়িটি রাজ্যে তারা ক্ষমতায় রয়েছে। এ বার তাদের লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ। অস্ত্র সেই রথ।
এই ধর্ম অবশ্য সেই ধর্ম নয়। তবু ধর্ম বটে। তাই পাঁচ রাজ্যে ভোটের বিধানসভা ভোটের প্রচার শেষ করেই এ রাজ্যের বীরভূমে আসবেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ, তিনিই এ রাজ্যে রথযাত্রার সূচনা করবেন ৫ ডিসেম্বর।
রথযাত্রায় রাজ্যের গণতন্ত্রিক অবস্থা তুলে ধরবে বিজেপি, নাকি উঠে আসবে সেই ধর্মীয় প্রসঙ্গ? (উপস্থাপনামূলক চিত্র/পিটিআই)
এ রাজ্যে গণতন্ত্র নেই, ৩৪ বছরের বাম শাসনের চেয়েও খারাপ অবস্থা হয়েছে সাত বছরের তৃণমূলের শাসনে – এটাই তাদের প্রচারের মূল কথা। তাতে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছে বিজেপি।
মমতার বিরুদ্ধে প্রচার
রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে দু’টি (তার মধ্যে একটি গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বদান্যতায়) এবং ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মাত্র তিনটি থাকলেও সদ্যসমাপ্ত পঞ্চায়েত ভোটে দেখা গিয়েছে তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন বিজেপিই। যদিও এক ধাপ এগিয়ে বিজেপির দাবি যে ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হলে ফলাফল আরও অন্যরকম হতে পারত।
সেই ফলাফল পেতেই রাজ্যে এবার অর্ধেকের বেশি আসন চাইছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের মূল অভিযোগ হল এ রাজ্যে গণতন্ত্র নেই। তাই তারা রথ নিয়ে রাজ্যের গণতন্ত্র রক্ষার প্রচার করবে। একই সঙ্গে এ রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ নেই বলেও তারা প্রচার করবে, এটাই স্বাভাবিক। সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও সরাসরি আক্রমণ করতে ছাড়বে না – তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে ইতিমধ্যেই আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ।
পঞ্চায়েত ভোটের আগে রাজ্যে গণতন্ত্র ফেরানোর দাবি তুলেছিল কংগ্রেসও (ফাইল চিত্র)
তাই বিজেপির ১১,০০০ কিলোমিটার রথযাত্রায় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করা হবে, তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।
তৃণমূলও জবাব তৈরি রেখেছে। বাতানুকূল বাসকে রথ হিসাবে ব্যবহার করা নিয়ে ইতিমধ্যেই কটাক্ষ শুরু করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
কেন গণতন্ত্র হত্যাই হাতিয়ার
গণতন্ত্রের দোহাই দিয়েই একদিন আন্দোলনে নেমে এখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতো জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তি এ রাজ্যে আর নেই। জনপ্রিয়তায় তাঁর ধারেকাছেও কেউ নেই। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বিজেপির মধ্যে থেকে তেমন কোনও ক্যারিশ্মাটিক নেতা উঠে আসবেন, সেই সম্ভাবনাও নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় মমতাকে তাঁর হাতিয়ার দিয়েই আক্রমণ করতে চাইছে বিজেপি।
বিজেপি করার অপরাধে হত্যা করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ত্রিলোচন মাহাতকে, অভিযোগ তেমনই (ফাইল চিত্র)
পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে ভোট লুঠ, বিজেপি করার ‘অপরাধে’ হত্যা করে গাছে ও বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। সেই দলের প্রধান হিসাবে এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে গণতন্ত্রহত্যার দায় এড়াতে পারেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে ত্রিপুরায় পঞ্চায়েত ভেঙে দিয়ে নতুন করে ভোট করিয়ে বিজেপির ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূলস্তরেও। তবে সেই রাজ্যে গণতন্ত্র হত্যা প্রসঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব ডেইলিও কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ত্রিপুরায় বিরোধীরাই প্রার্থী দেননি, তা প্রমাণ হয় পঞ্চায়েত ভোটে কোনও হিংসা না হওয়ায়।
পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য পঞ্চায়েত ভোট ছিল হিংসাত্মক। সরকারি হিসাব ও বিরোধীদের হিসাবের মধ্যে বিস্তর ফারাক। এক কথায়, বিরোধী আসনে থাকার সময়ে পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অভিযোগগুলি করেছিলেন এখন ঠিক সেই অভিযোগই উঠছে তাঁর বিরুদ্ধে।
দাঙ্গা ও ভোট
যখনই যেখানে ধর্মীয় হিংসা হয়েছে সেখানেই লাভ হয়েছে বিজেপির। সেটা গুজরাট হোক বা উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোট। উন্নয়ন নয়, ইস্যু হয়েছে ধর্মই। সে কথা প্রতিটি রাজনৈতিক দলই জানে। তাই অনেকে এমন আশঙ্কাও করছেন যে লোকসভা ভোটের আগে না দাঙ্গা লাগে। তাই বিজেপির রথ বার করা নিয়ে সিপিএম বলেছে, কোথাও কোনও ধরনের ধর্মীয় উস্কানি দিলে সেই রথ আটকাবে সিপিএম। একই কথা বলছে তৃণমূলও।
এ রাজ্যে হিংসা হয়েছে একাধিক জায়গায় – হাওড়ার ধূলাগড়ি, উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট-সহ বিভিন্ন জায়গায় এবং শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে গুলি চলেছে উত্তরবঙ্গের ইসলামপুরের দাঁড়িভিটে। এর ফল ভোটের বাক্সে পেতে চাইবে বিজেপি।
ইসলামপুরের দাঁড়িভিটে হাসপাতালের পথে আহত ছাত্র (ফাইল চিত্র)
তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির দু’টি জায়গায় পার্থক্য রয়েছে। সেই দুই পার্থক্য আবার যথেষ্ট পরস্পরবিরোধী। প্রথমত উত্তরপ্রদেশের মতো পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীর রাজনীতি নেই। দ্বিতীয়ত মুসলমানদের তোষণ করতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হিন্দুদের ধর্তব্যের মধ্যে এতদিন আনেননি, আর সেটাই সাংগঠনিক জোর না থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে বিজেপির উঠে আসার কারণ। সংখ্যালঘু ভোট হারানোই এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীর চিন্তা এখন বিজেপি (ফাইল চিত্র)
অর্থাৎ সরাসরি ধর্মীয় রাজনীতি না থাকলেও এখন ধর্মীয় বিভাজন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, সেই বিভাজন ইভিএমে প্রতিফলিত হলে লাভ বিজেপির।
গণতন্ত্র চাপা পড়বে ধর্মে?
রথ এবং বিজেপি – এই দুই শব্দ একসঙ্গে উচ্চারিত হওয়া মানে সেখানে হিন্দুত্ব থাকবেই। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম রথ বার হচ্ছে বীরভূমে। তারপরেই একটি উত্তরবঙ্গ থেকে ও আরেকটি সাগরতীর্থ, মানে দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে।
উত্তরবঙ্গ মানে সেখানে আদিবাসী জনজাতির সংখ্যাধিক্য। আর দুই ২৪ পরগনা মানেই রোহিঙ্গা, বসিরহাটে সাম্প্রদায়িক হিংসা, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ, জনবিন্যাসে পরিবর্তন, পাচার এবং অবশ্যই শরণার্থী। নেতা পুরনো দলে ফিরলেও মতুয়াদের একাংশ এখন বিজেপির দিকে ঝুঁকছে প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব বিলের জন্য।
তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই ধর্মের ভারে চাপা পড়তে পারে গণতন্ত্র। হয়তো সেই কথা বিবেচনা করেই ৪২টি লোকসভা কেন্দ্র নয়, একেবারে ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রেই রথ নিয়ে যেতে চাইছে বিজেপি। রাজ্যের বিশেষ ভাবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে ধর্মীয় কারণেই ভোটের মেরুকরণ হতে পারে।
এই সব জায়গায় কোনও রাজনৈতিক দলের (তৃণমূল) থেকে বাধা না পেলে তো লাভই, বাধা পেলে দ্বিগুণ লাভ, কারণ তখন সেটা আরও বেশি করে প্রচারের আলোয় চলে আসবে।
এ রাজ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অনেক কিছুকেই ইস্যু করতে পারত বিজেপি। বিশেষ করে লোকসভা ভোটের আগে মোদী সরকারের উন্নয়ন। তবে পূরণ না হওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিড়ম্বনার মুখে পড়ার চেয়ে, বিধানসভা ভোট না হওয়া সত্ত্বেও রাজ্যের গণতন্ত্রকে ইস্যু করে রথ বার করতে চলেছে বিজেপি। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে আবেগ কাজে লগানো অনেক বেশি সুবিধাজনক।

