বিজেপি কেন বাংলার বুদ্ধিজীবীদের মন জয় করতে ব্যর্থ
এই বিদ্বজনেরা আদর্শ নিয়ে চলেন এবং দল রসাতলে গেলেও তাঁরা বামপন্থায় বিশ্বাসী
- Total Shares
সাধারণ মানুষের উপর বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব অপরিসীম এবং তাঁরা জনমত তৈরি করতে পারেন, এটা ধরে নিয়ে বিজেপি জন-সম্পর্ক অভিযান শুরু করেছে। দলের তরফ থেকে চেষ্টা চলছে কী ভাবে এই বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মন জয় করা যায় এবং বিজেপি সম্পর্কে এই বুদ্ধিজীবীদের বদ্ধমূল ধারণাগুলোকে পরিবর্তন করা যায়।
কয়েক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষকে চা-চক্রে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠানে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন উপস্থিত হয়েছিলেন। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ শহরের একটি মঞ্চে শহরের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর এই ইচ্ছা পুরোপুরি পূরণ হল না, কারণ অনেক পরিচিত মুখই নিজেদের গেরুয়া রাজনীতির থেকে দূরে সরিয়ে রাখলেন।
বিজেপির রাজ্য সাধারণ সচিব সায়ন্তন বসু অবশ্য অভিযোগ করছেন যে যাঁরা শাসক দলের উপর ক্ষিপ্ত, তাঁদের ইচ্ছে থাকলেও শাসক দলের হুমকির জন্য আসতে পারছেন না। এটা সত্যি যে মঞ্চাভিনেত্রী শাঁওলী মিত্র, গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায় ও নাট্য পরিচালক বিভাস চক্রবর্তী ইতিমধ্যেই 'পরিবর্তনের' বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু, তা সত্ত্বেও, তাঁরা বিকল্পের খোঁজ করছেন না।
এই বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই মানুষের দাবির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ২০১০-১১ সালে বাম শাসনের সময়ে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন। ৩৪ বছরের বাম শাসনে মানুষ বুঝতে শুরু করেছিলেন যে বামেরা অপরিহার্য। কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা পরিবর্তন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে মানুষকে বোঝাতে পেরেছিলেন যে জনগণ চাইলেই পরিবর্তন আসতে বাধ্য।
বিজেপির আমন্ত্রণ খারিজ করে দিয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় [ছবি: পিটিআই]
এখন, প্রশ্ন হচ্ছে বিজেপি যে বুদ্ধিজীবীদের খোঁজ করছে তাঁরা আসলে কারা? এই বুদ্ধিজীবীরা বাম মনষ্ক যাঁদের পুরস্কার, পৃষ্ঠপোষকতা বা গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে কেনা যায় না। এই বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই এখন শাসক শিবিরে, তাই মন জয় করা যাবে এমন বুদ্ধিজীবী বিজেপির হাতে খুব একটা বেশি নেই।
সবচেয়ে বড় সমস্যা এই লোকগুলো একটি আদর্শ নিয়ে চলেন এবং দল রসাতলে গেলেও তাঁরা সর্বদাই বামপন্থায় বিশ্বাসী।
তৃণমূল স্তরে বাম কর্মীরা এখন তৃণমূলের অত্যাচারে জর্জরিত। তাই বিজেপি মনে করেছিল যে এই বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা হয়ত খুব সহজেই গেরুয়া শিবিরে যোগ দেবেন। কিন্তু বিজেপি বুঝতে ভুল করেছে যে এই বুদ্ধিজীবীরা সহজে চাপের মুখে নতিস্বীকার করেন না এবং সমস্ত ধরণের লোভ সংবরণ করতে পারেন।
সব হারালেও, তাঁরা তাঁদের বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে সরবেন না। এই ধরনের লোকদের হৃদয় পরিবর্তন করা সত্যিই দুঃসাধ্য। বিজেপি তাও চেষ্টা করে চলেছে।
জন-সপম্পর্ক অভিযানে যোগ দেওয়ার সর্বপ্রথম চলচিত্র অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে আহ্বান জানান হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের সপ্তম বর্ষেও তাঁর বামপ্রীতির জন্য সর্বজনের কাছে পরিচিত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। শাসক দলের সঙ্গে কোনও রকম যোগাযোগ না থাকার জন্য তিনিই যে বিজেপির প্রথম পছন্দ হবেন, তা বলাই বাহুল্য।
অমিত শাহের সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের বৈঠকে তেমন সাড়া পাওয়া গেল না [ছবি: পিটিআই]
কোনও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে সৌমিত্রকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। সরকারের পুরস্কার প্রাপকদের তালিকায় তাঁর নাম কোনওদিনও পাকা হয়নি এবং বারংবার সরকারের কাছ থেকে পুরস্কার নিতেও তাঁকে দেখা যায়নি। ২৭ জুলাই বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহের একটি জনসভায় উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানান হয়েছিল সৌমিত্রকে। কিন্তু শারীরিক সমস্যার দোহাই দিয়ে সৌমিত্র সেই আমন্ত্রণ প্রত্য়াখ্যান করেছেন।
বাস্তবে সৌমিত্র এমন একটি দলে যোগ দিতে চান না যে দল 'শিল্পী স্বাধীনতায়' বিশ্বাসী নয় এবং 'ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ' সৃষ্টি করতে বিশ্বাসী। সৌমিত্র নাকি নোটবন্দির জন্য তাঁর কী কী সমস্যা ভোগ করতে হয়েছিল তা তাঁকে আমন্ত্রণ জানাতে যাওয়া বিজেপির নেতৃত্বদলকে জানিয়েছেন।
আরেকজন মঞ্চাভিনেতা চন্দন সেন তো গিরিশ কারনাড ও সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের ঘটনায় বিজেপিকে এক হাত নিয়েছেন।
বিজেপির তালিকায় এ রকম আরও বেশ কয়েকজন বামমনষ্ক বুদ্ধিজীবীরা রয়েছেন। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে বিজেপি তত আশাহত হচ্ছে। শহরের বুদ্ধিজীবী তথা গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের সঙ্গে অমিত শাহের বৈঠকের খুব একটা ভালো সাড়া পাওয়া যায়নি। বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে আরও একটি 'পরিবর্তনের' ডাক দেওয়ার চেষ্টা কিন্তু ফলপ্রসূ হচ্ছে না।
(সৌজন্যে: মেল টুডে)
লেখাটা পড়ুন ইংরেজিতে

