সিবিএসই প্রশ্ন ফাঁসের দায় কার? মতামত দিলেন এক শিক্ষাবিদ
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষা বিভাগের ডিন ইলিয়াস হুসেন ফোনে তাঁর মতামত জানান
- Total Shares
এবছরের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও তাদের মা-বাবা যে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন তা আর হল না। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গিয়েছিল বলে দশম শ্রেণীর গণিত ও দ্বাদশ শ্রেণীর অর্থনীতির পরীক্ষা পুনরায় নেওয়া হবে বলে বুধবার জানায় বোর্ড।
প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর, একটা বিজ্ঞপ্তি জারি করে সিবিএসই, "বোর্ড স্বীকার করেছে যে এমন কয়েকটি ঘটনা তাদের নজরে এসেছে। পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রতি সুবিচার করার জন্য বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে কয়েকটি বিষয়ের পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। সিবিএসই ওয়েবসাইটে পরীক্ষার দিন ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য এক সপ্তাহের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে।"
আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, বেশ কিছু সময় ধরে যখন হোয়াটসঅ্যাপে অর্থনীতির প্রশ্নের হাতে লেখা উত্তর ঘুরছিল, যা থেকে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, তখন কিন্তু বোর্ড ব্যাপারটাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনওরকম চেষ্টাই করেনি।
এই অপ্রীতিকর ঘটনায় দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার একজন দক্ষ প্রশাসক ও শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিভাগের ডিন ইলিয়াস হুসেন ফোনে তাঁর মতামত জানান।
দশম ও দ্বাদশ শ্রেণী মিলিয়ে এ বছর কুড়ি লক্ষেরও বেশি ছাত্রছাত্রী সিবিএসই পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই বোর্ড জানায় যে গণিত ও অর্থনীতি, এই দুই বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে। কী হতাশাজনক ব্যাপার!
অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রশ্ন ফাঁসের সমস্যাটা যদি নিয়মিত ভাবে চলতে থাকে তবে তা হবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক একটা ব্যাপার। সিবিএসই তথা মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের মতো দিক দিয়েও এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক হবে। গোটা পরীক্ষা ও পরীক্ষা সম্পর্কিত যাবতীয় খুঁটিনাটি নিয়ন্ত্রণের ভার যেহেতু মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের হাতে থাকে, তাই প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তাদের দিকেই আঙুল উঠবে।
কিন্তু এই ভার যদি অন্য কোনও সংস্থাকে দেওয়া হয় তা হলে হয়ত নানা অনিয়ম দেখা দিতে পারে ও সেই ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
এমন একটা পদ্ধতির অবলম্বন করতে হবে যেখানে পরীক্ষা শুরু থেকে শেষ অবধি নিয়ন্ত্রণ যেন একটা প্রতিষ্ঠান বা পর্ষদের হাতে থাকে। এর ফলে যাতে পরীক্ষায় কোনও রকম অনিয়ম না হয় সেই দিকে পর্ষদ আরও বেশি সচেতন থাকবে।
প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার খবর পাওয়ার পরেও বর্তমান কর্তৃপক্ষ কিছু করতে পারলেন না কেন?
আগে বোর্ডই বেশ দক্ষতার সঙ্গে প্রশ্নপত্র তৈরি করত, পরীক্ষা নিত, পরীক্ষা কেন্দ্র বাছাই করত ও পরিদর্শক নিয়োগ করত।
অনেকে মনে করেন এখন এই কাজগুলো বাইরের সংস্থাকে দিয়ে করান হচ্ছে। যদিও আমি এই ব্যাপারে খুব একটা জানি না, কিন্তু যদি তাই হয়ে থাকে তা হলে এই সংস্থাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
ভবিষ্যতে যাতে প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনা এড়ানো যায় সেই জন্য মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী নানা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। ব্যবস্থা নিতে খুব দেরি করে ফেলছেন না তো?
ঘটনাটা নতুন নয় আগেও অনেক বার এমন ঘটনা ঘটেছে। বেশ কয়েকবছরে এই নিয়ে তৃতীয় কি চতুর্থবার প্রশ্ন পত্র ফাঁস হল। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে জানার পরেও এমন কিছুই করা হয়নি যাতে এটা ছড়িয়ে পড়া আটকান যায়।
দায় কার?
পরীক্ষার আগেই ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকশিক্ষিকাদের হাতে পৌঁছে যায় প্রশ্ন। তখন কিন্তু কেউ ব্যাপারটা নজর করেননি। পরীক্ষা চলাকালীন পরিদর্শক লক্ষ করেন যে পরীক্ষায় যে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে সেগুলো আগেই সবার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। এ নিয়ে তদন্ত অনেক আগেই শুরু করা উচিৎ ছিল। অনেক আগেই সিবিএসই-কে সচেতন করা হয়েছিল যে, হাতে লেখা কয়েকটি প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে গেছে, কিন্তু বোর্ড বলে যে তারা এই ব্যাপারে কিছুই জানত না। তাদের আগে থেকেই সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল।
এ বছর থেকে সিবিএসই দশম শ্রেণীর পরীক্ষা নেওয়া শুরু করেছে। আপনার কী মনে হয়ে যে এই ধরণের ঘটনা ছাত্রছাত্রীকে পরীক্ষায় নকল করতে বাধ্য করবে?
আমার মনে হয়ে না। কয়েক দশক ধরে বোর্ডের পরীক্ষাগুলো বেশ শান্তিপূর্ণ ভাবেই হয়ে এসেছে। পড়াশোনার চাপ থাকলে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করবে। এদের মধ্যে কেউ কেউ নকলও করে। এটা নতুন নয়। এই ধরণের ঘটনা প্রত্যেক বছরই ঘটে।
বোর্ডের পরীক্ষার এই বিচ্যুতি পরীক্ষায় নকল করার কারণ হতে পারে না।
পুনরায় পরীক্ষা নেওয়াটা কি ছাত্রছাত্রীদের প্রতি সুবিচার হচ্ছে?
আমি এমন কয়েকজন ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবককে চিনি যাঁরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবেন বলে ভাবছেন। তাঁদের মতে সব ক’টি বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা নিতে হবে বোর্ডকে। প্রশ্ন ফাঁসের খবরটা প্রথম দিল্লি থেকে আসে।
এখন প্রশ্ন হল যাদের হাতে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পৌঁছে গেছে তারা অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে বেশি ভালো ফল করবে। তাই তারা যদি ওই ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নের উত্তর জেনে কেউ পরীক্ষা দিতে যায় তাহলে পরীক্ষা আবার নিতেই হবে।
তবে যে ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষার জন্য ভালো ভাবে প্রস্তুত হয়েছে, তারা যে আবার ভালো ফলই করবে সেটা বলাই বাহুল্য।

