ফল প্রকাশের পরে দলবদল, এর ফল কী হবে?

বোর্ডের রং বদলে দেওয়াকে কী ভাবে দেখেন নির্বাচকরা

 |  5-minute read |   21-08-2018
  • Total Shares

তখনও উদারনীতির যুগ শুরু হয়নি। বিদেশি জিনিসও বড় একটা দেখা যেত না। তখন একটা চুটকি, মানে জোক শুনেছিলাম। সূক্ষ্ম জিনিস তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। আমেরিকা একটি সূচ নিয়ে হাজির হয়েছে যেটি চুলের চেয়ে দশভাগ সূক্ষ্ম। সকলে যখন এই প্রতিযোগিতায় আমেরিকার জয় সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ, তখন রাশিয়া সেই সূচে সুতো পরানোর গর্ত করে দিল! সর্বশেষ প্রতিযোগী ভারত তাতে একটি ট্যাগ লাগিয়ে দিল—মেড ইন ইন্ডিয়া!

কী কেন্দ্রে, কী রাজ্যে – কোনও দিনই কোনও রাজনৈতিক দল ১০০ শতাংশ আসনে জিতে সরকার গঠন করতে পারেনি, স্বাধীনতার পরে কংগ্রেসও পারেনি। ৩৪ বছরের শাসনসকালে লেবেনস্রাউম বলে কোনও দিন কোনও দলকে ১০০ শতাংশ আসন দাবি করতে দেখা যায়নি। কিন্তু শোনা যায়, ২০১৩ সালে এক নেতা, যিনি দক্ষ সংগঠক বলে পরিচিত ছিলেন, তিনি নতুন একটা খেলা চালু করেন। অনেকটা ওই মেড ইন ইন্ডিয়া ট্যাগ লাগানোর মতো।

body1_082118050555.jpg২১শের সভায় প্রতিবছরই বিরোধী দলের জনপ্রতিনি ও নেতারা যোগ দিচ্ছেন তৃণমূলে (সুবীর হালদার)

খেলাটা কোনও মারামারি-কাটাকাটি নয়। পঞ্চায়েত ভোটের যখন বোর্ড গঠন হয়ে গেল, তখন সদস্যদের ‘বুঝিয়ে’ দলে টানতে শুরু করে দেন। কিছুদিন পরে দেখা গেল সবই ঠিকঠাক আছে, শুধু বোর্ডের রংটা বদলে গেছে। এমন ব্যাপারটা হতেই থাকল। এর সঙ্গে কেউই তেমন পরিচিত ছিল না। সেই নেতা নেই, কিন্তু খেলাটা চলছে। অনেকটা দ্য কিং ইজ ডেড, লং লিভ দ্য কিং-এর মতো।

শহিদ দিবসের নাচগানের অনুষ্ঠানে অনেকেই নির্বাচকদের শহিদ করে দিয়ে হাতে ধরা পতাকার রং ও চিহ্নের কোনও একটা দরকার মতো বদলে নিচ্ছিলেন। ২০১৮ সালে অবশ্য অতটা গড়াল না। পঞ্চায়েত ভোটের মুখে এমনও দেখা গেল যে এক দলের প্রতীকে লড়তে যাওয়া প্রার্থীরা প্রচার করছেন অন্য দলের হয়ে। প্রার্থীরা বলতে থাকলেন, তাঁরা উন্নয়নে মুগ্ধ হয়ে গেছেন, ভুল করে অন্য দলের হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন এখন জনে জনে বলছেন যাতে কেউ তাঁকে ভোট না দেন, মানে প্রতিদ্বন্দ্বীকে যেন ভোটটি দেন।

cpm-cong-rep-file-pt_082118050956.jpgনেতারা দল বদলালে ভোটাররা কি মন বদলান, প্রশ্নটা রয়েই যাচ্ছে (পিটিআই)

নিন্দুকদের কোনও কালেই থামানো যায়নি, এবারও গেল না। তারা বলতে শুরু করে দিল, যারা উন্নয়ন দেখতে পাচ্ছে না তাদের ছানিশ্রী দেওয়া হবে বলে নাকি কারা প্রচার করে দিয়েছিল। তার পরেই উন্নয়নের জোয়ার দেখতে পেয়ে যান ওই সব প্রার্থীরা। যাঁরা তখনও ভুল বুঝতে পারেননি, তাঁরা সেটা বুঝতে পারছেন ভোটের ফল বার হওয়ার পরে।

মানুষ মাত্রই ভুল করে। মানুষের সেই ভুলের বোঝা মাথায় নিয়ে এখন অন্য দলে যোগ দিয়ে পুরো এলাকার ভুল শোধরাচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা। সবই ঠিকঠাক। শুধু দলের চিহ্নটা বদলে যাচ্ছে আরকি। কিন্তু যাঁরা ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের মন বদলাচ্ছে কি?

২০১১ সালে দুই কংগ্রেস জোট বেঁধে ক্ষমতায় এলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেই জোট ভেঙে যায়। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল কংগ্রেস তার পর থেকে একাই সরকার চালিয়েছে। ২০১৬ সালের ভোটেও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল কংগ্রেস দ্বিতীয় বারের জন্য রাজ্যে সরকার গঠন করে। অভিযোগ, তারপর থেকেই দল ভাঙানো চলছে। যদিও পাল্টা দাবি, মানুষের মতামত নিয়েই নেতারা দল বদল করছেন।

এ বার শহিদ দিবসের মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় দাবি করেন যে ঝাড়গ্রামের পঞ্চাশ জনের উপরে পঞ্চায়েতে জয়ী প্রার্থীরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন, তবে তাঁদের হিসাব পাওয়া যায়নি। বোর্ড গড়ার মুখে অবশ্য বহু বিরোধী নির্বাচিত সদস্য দলবদল করছেন বলে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নাকি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, খোদ প্রদেশ কংগ্রেস বলতে পারছে না আগামী দিনে তাঁদের কোন বিধায়ক দলে থাকবেন।

বিরোধী দলের নামে মামলা নতুন কিছু নয়, কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসকদলে ভিড়ে যাওয়া থেকে আটকানো কার্যত অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে কংগ্রেসের পক্ষে। যারা চরম তৃণমূলবিরোধী, তাদের মধ্যে কারা তলে তলে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, তাও বুঝে উঠতে পারছে না শাসকদল। সম্প্রতি পুরুলিয়াতে বেশ কয়েকজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শাসকদলে যোগ দিয়েছেন।

এ তো গেল রাজনীতির গল্প। নেতারা যাঁদের সাধারণ মানুষ বলেন, তাঁরা কী বলছেন?

২০১১ সালে দুই কংগ্রেসের যে জোট হয়েছিল, সেই জোট অচিরেই ভেঙে যাওয়ার পরে রেজিনগরের কংগ্রেস বিধায়ক হুমায়ুন কবির যোগ দেন শাসকদলে। উপনির্বাচনে দেখা যায় হুমায়ুন হেরে গিয়েছেন, স্থান হয়েছে তিন নম্বরে। ২০১৬ সালে তিনি নির্দল প্রার্থী হিসাবে ভালো লড়াই করেন, তবে পরাজিত হন। এলাকার লোক কংগ্রেসের হাত চিহ্নে ভরসা করেছিলেন।

শান্তিপুরের অজয় দে কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে যোগ দেন, ২০১৬ সালে তিনি পরাজিত হন কংগ্রেসের অরিন্দম ভট্টাচার্যের কাছে। অরিন্দমও এখন তৃণমূলে। তাঁর জেলার নেতা শঙ্কর সিংও তাই। ভোট এলে বোঝা যাবে সমর্থকরা কোন দিকে।

bhuniajpg_082118050858.jpgসবংয়ে জয়ী তৃণমূল প্রার্থী গীতারানি ভুঁইয়া ও কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যাওয়া মানস ভুঁইয়া (পিটিআই)

হাঁসনেও একই ছবি। পাঁচ বারের কংগ্রেস বিধায়ক অসিম মাল তৃণমূলে যোগ দিলে, সেই আসনে পরের নির্বাচনে জয়ী হন কংগ্রেস প্রার্থী। তৃণমূলের মন্ত্রী মঞ্ডুলকৃষ্ণ ঠাকুর বিজেপিতে যোগ দিয়ে নিজের আসনে পরাজিত হন, আসনটি ধরে রাখে তৃণমূল। তবে বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে দল বদলের পরেও জনপ্রতিনিধি সেই আসন ধরে রেখেছেন। যেমন সবংয়ের দীর্ঘদিনের কংগ্রেস বিধায়ক মানস ভুঁইয়া তৃণমূলে যোগ দিয়ে সাংসদ হওয়ার পরে ওই আসনে তাঁর স্ত্রী জয়ী হন তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে। তবে সেখানে ভোট কেমন হয়েছে তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন আলোচনা শোনা যায়।

সামনেই ২০১৯ সালের ভোট। বিজেপির কাছে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লড়াই, তৃণমূলের কাছে প্রতিপত্তি বজায় রাখার লড়াই, যাকে ইংরেজিতে বলে প্রেস্টিজ ফাইট। যে সব আসনে বিজেপি জিতেছে, দারুণ ভালো ফল করেছে, তার অনেক জায়গাতেই তাদের তেমন কেন, কার্যত কোনও সংগঠন নেই। এই অবস্থাতেও তারা জঙ্গলমহলে ভালো ফল করেছে। এখন সেই জায়গার জনপ্রতিনিধিরা অন্য দলে যোগ দিলে মানুষ কী বলবে?

mallarput_082118050709.jpgবীরভূমের মল্লারপুরে পঞ্চায়েতে জয়ের পরে মিছিল বিজেপির (পিটিআই)

প্রার্থীকে দেখে ভোট কতটা হয় বলা খুব মুশকিল, এ রাজ্যে অন্তত ভোট হয় প্রতীক দেখে। তাই যাঁরা কোনও নির্দিষ্ট প্রতীকে চাপ দিয়েছেন বা বোতাম টিপেছেন, নেতাদের দল বদলের সঙ্গে তাঁরা কতটা মত বদল করবেন, সে কথা বলা মুশকিল। নেতাদের দল বদল করানো আর নির্বাচকদের মন বদল করানো এক ব্যাপার নয়।

আগামী লোকসভা ভোটে এ রাজ্যে কার সঙ্গে কার জোট হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়, ভোটের ঠিক কত দিন আগে স্পষ্ট হবে তাও বলা মুশকিল। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে বিজেপি একাই লড়বে। হাতে যে কয়েকমাস সময় আছে তাতে তারা আরও বেশি মেরুকরণের দিকে যাবে। যাঁরা জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য শিবিরে ভিড়ছেন, সেখানে মানুষ তাঁদের পক্ষে রইলেন কিনা বোঝা যাবে আগামী ভোটের ফল বার হওয়ার পরে।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment