বিপুল সেনাভারকে গুরুত্বহীন করে দেবে ড্রোন, কিন্তু ভারত কি সে কথা বুঝছে?
২০২০,২০৩৫ ও ২০৫০-এই তিন ধাপে চিন সরকার সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা করেছে
- Total Shares
৫ই জানুয়ারি সিরিয়ায় এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যা যুদ্ধের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি। বিশ্বের গণমাধ্যম এই ব্যাপারটাকে তেমন ভাবে সম্প্রচার না করলেও নিঃসন্দেহে এই ঘটনাটা অনেক কিছু বদলে দেবে। গ্লোবাল রিস্ক ইনসাইটস ওয়েবসাইটের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী সিরিয়ায় রুশ সেনাবাহিনীর উপর হামলা করে এক ঝাঁক ড্রোন। নতুন ধরণের এবং নিঃসন্দেহে যুদ্ধ প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন দেশ অনেকটাই এগিয়েছে। ঠিক কী হয়েছিল?
রুশ ঘাঁটি
সিরিয়ায় দুটি রুশ ঘাঁটির উপর হামলা হয়। হেমেইমিম ঘাঁটি এবং তারতুসে সরবরাহ ঘাঁটিতে ১৩টি ড্রোনের সাহায্যে এই হামলা করা হয়। এই ড্রোনগুলিতে ছিল উন্নতমানের সব বিস্ফোরক। বিমানহামলা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সাতটি ড্রোন নামিয়ে ফেলা হয় এবং সাইবার ব্যবস্থার মাধ্যমে বাকি ছ'টি ড্রোনকেও দূর থেকেই নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। মাটিতে নামানোর পর তিনটি ড্রোনে বিস্ফোরণ ঘটে যার ফলে রুশ বিমানের ক্ষতি হয়।রুশ সেনা বাকি আরও তিনটে ড্রোন আটক করে।
এই হামলার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মতামত আলোচনা করতে গিয়ে এই গ্লোবাল রিস্ক ইনসাইটস জানায়, "সন্ত্রাসবাদের নিরিখে হামলাটা খুব উল্লেখযোগ্য না হলেও আগ্রাসনের ক্ষেত্রে ড্রোনের সাহায্য নেওয়ার এ এক নতুন উদাহরণ। রাষ্ট্রশক্তি ছাড়া অন্য কোনও শক্তি ও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলি অদূর ভবিষ্যতে হামলা করতে ড্রোনের সাহায্য নেবে।"
একটি ড্রোন বানাতে খরচ পরে প্রায় ১,০০০ ইউরো (৭৫,০০০ টাকা)। দা ইকোনোমিকে "দা ফিউচার অফ ওয়ার" শীর্ষক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, "উনিশ শতাব্দীতে, ১৮৭০ সালে প্রুশিয়ান সেনা ফরাসি সেনাকে হারাবার পর ইউরোপিয়ানরা বিশ্বাস করতে আরম্ভ করে যে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং কামান ও গোলাবারুদের ব্যবহারে কমে যাবে যুদ্ধের সময়কাল, অর্থাত্ যুদ্ধের নিস্পত্তি হবে অনেক দ্রুত।"
১৯৩০ সালে, যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলেন, “শত্রুকে দ্রুত আত্মসমর্পনে বাধ্য করানোর অন্যতম উপায় হল বিমান থেকে বোমা ও ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ।" তারপর ১৯৯০-৯১ সালে, প্রথম উপসা যুগরীয় যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়ে দেয়ে যে কী ভাবে "কয়েকটি সমরাস্ত্র যেগুলির লক্ষ্য নির্ভুল, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রয়েছে, নজরদারি করতে সক্ষম, নিজস্ব পদ্ধতিতে শত্রুঘাঁটি চিহ্নিত করতে পারে, যার নির্দিষ্ট যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে এবং গোপনীয়তার সঙ্গে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম, সেই ধরণের সমরাস্ত্র ব্যবহার করলে তবেই যুদ্ধে জেতা যাবে।
এরপর ৯/১১-র পর যুদ্ধের ধরণ আবার বদলে গেল। দা ইকোনোমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, "যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বদলটা হল এ বার যুদ্ধে রোবট ব্যবহার করা হবে।" যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহারের প্রবর্তক সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিয়োরিটির অস্ত্র বিশেষজ্ঞ পল সাচাররে বলেন, "সামরিক অপারেশনে ও নাটকীয় ফলাফল আনতে হলে রোবটের নিবিড় ব্যবহার অনিবার্য। সমন্বয়, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ও গতি আনতে পারে ড্রোনের ব্যবহারই।"
কয়েক দশক পর হয়ত সৈন্যবাহিনীকে একেবারে অকেজো করে দিতে পারে যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার। ভারত কি এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারছে?
২০১৭ সালে দা সাউথ চিন মর্নিং পোস্টে একটি প্রতিবেদন জানায়, "যে ড্রোন অনেকটা উচ্চতা দিয়ে যায় সেই ধরণের ড্রোনের সাহায্যে চিন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ‘নিয়ার স্পেস’, অর্থাত্ দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের উপরে মহাকাশের যে অংশ রয়েছে, তার উপর আধিপত্য করে।" সমুদ্রপৃষ্ঠের ২০ কিমি উপর থেকে শুরু হয় এই নিয়ার স্পেস। নিয়ার স্পেসকে ড্রোনে ‘ডেথ জোন’ বা মরণ বলয়ও বলা যেতে পারে, "এখানকার হালকা বায়ু ড্রোনের উড়ানে বাধার সৃষ্টি করে, কারণ অতিরিক্ত কম তাপমাত্রা ড্রোনের ব্যাটারিকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে, যদিও চিন এমন একটি ড্রোন তৈরি করেছে যেটা এই কম তাপমাত্রাতেও কার্যকরী হবে। তবে এই নতুন ধরণের ড্রোন এখনও পরীক্ষামূলক স্তরেই রয়েছে" বলে জানিয়েছে হংকংয়ের সংবাদপত্রটি। এখনও পর্যন্ত নর্থরোপ গ্রুমান আরকিউ-৪ গ্লোবাল হকোই ১৯ কিমি উচ্চতা দিয়ে উড়তে পেরেছিল। তবে এবার চিনের ইনার মঙ্গোলয়ায় তৈরি ড্রোন ২৫ কিমি পর্যন্ত উচ্চতা দিয়ে উড়তে পারবে।

যুদ্ধে বাড়ছে ড্রোনের ব্যবহার
দা ড্রাইভ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনসেনার অধীন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ ডিফেন্স টেকনোলজি (এনইউডিটি) একটি গবেষণা করে। পাইলটহীন ছোট আকারের যান যাতে এরোপ্লেনের মতো দুটো পাখা লাগানো রয়েছে এমন দু'ডজন ড্রোন নিয়ে গবেষণা করে। তাদের ওয়েবসাইটটিতে জানানো হয়েছে যে, "গবেষণাটির বিষয়বস্তু হল এটা দেখা যে ঠিক কৃত্রিমভাবে তৈরি করা শত্রুপক্ষের ঘাঁটিকে ঠিক কতটা ভালো ভাবে এই ড্রোনগুলো নজর করতে পারে। গবেষণাটিতে প্রতিটি ড্রোন একে অপরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবার একক ভাবে কাজ করে এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সাহায্যে রুটিন কাজের বাইরেও কয়েকটি কাজ করতেও সক্ষম হয়েছে।"
এনইউডিটি ইনস্টিটিউট অফ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সায়েন্সের প্রধান সেন লিন চেং বলেন, " ২০২০, ২০৩৫ ও ২০৫০-এই তিন ধাপে চিন সরকার সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা রেখেছে।সরকারের এই চিন্তাভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আমরা আমাদের নির্দিষ্ট কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছি।"
ইতিমধ্যে ২০১৭ সালের জুন মাসে সরকারি সংস্থা চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ কর্পোরেশন প্রায় ১২০টি ডানা লাগানো ড্রোন ওড়ায়। এই ড্রোনগুলো কখনও এক সঙ্গে কাজ করেছে আবার ছোট ছোট দলে নিজেদের ভাগ করে বিশেষ কয়েকটা কাজ করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন
মার্কিন মুলুকও কিন্তু পিছিয়ে নেই।২০১৬র অক্টোরবের মাসে দা ডিপার্টমেন্ট ইফ ডিফেন্সের স্ট্রাটেজিক ক্যাপাবিলিটিজ অফিস তাদের তৈরি পারডিক্স নিয়ে নানা রকম গবেষণা করে। পারডিক্স হল বায়ুমণ্ডলে ছুড়ে দেওয়া যায় এমন একটি ক্ষুদ্র আকারের মানববিহীন বিমানযান। দু'মাস পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ একটি সরকারি ঘোষণায় জানায় যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাইক্রো ড্রোন ক্যালিফোর্নিয়ার 'চায়না লেকে' সফল ভাবে পরীক্ষা করেছে। এখানে এই 'চাইনা লেক' নামটি উল্লেখযোগ্য।
গবেষণাটিতে এফ/এ-১৮ সুপার হরনেট থেকে ১০৩টি পারডিক্স ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়। এইসব ছোট ছোট ড্রোন আগের চেয়ে অনেক উন্নত, বিশেষ কয়েকটি কাজ যেমন যৌথ ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে এক সঙ্গে ওড়া এবং স্বয়ংক্রিয় ভাবে যান্ত্রিক গোলযোগ সারানোর মতো বিভিন্ন কাজ করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অনুসারে, "এই ধরণের ছোট ও উন্নত ড্রোনের প্রদর্শন এই বিষয়ের ওপরেই জোর দেয় যে, আগে যুদ্ধের সময় পেন্টাগন যে সব সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করত তাতে সময়ও অনেক বেশি লাগত আর খরচও হত অনেক। কিন্তু এখন এই কাজগুলোই তারা করতে পারে অনেক কম সময় ও অনেক কম খরচে।"
চিনের ইউনান ও সানসিতে দেশের সব চেয়ে বড় কুরিয়ার সংস্থা-এসএফ এক্সপ্রেস চিঠি কুরিয়ার করার জন্য ড্রোনকে কী ভাবে আরও উন্নত করতে পারে সেটা নিয়েই গবেষণা করার কথা জানিয়েছে চিনের বিমান বাহিনী। দা সাউথ চায়না পোস্ট যেমন জানিয়েছে, "ইউনানে গবেষণা চলাকালীন খবর পাওয়া মাত্রই একটি ক্ষতিগ্রস্ত রাডার মেরামত করতে পার্বত্য এলাকায় মাত্র এক ঘন্টার মধ্যেই যন্ত্রাংশ পৌঁছে দেয় একটি ড্রোন। সাধারণত এই যন্ত্রাংশ ট্রাকের সাহায্যে পৌঁছনো হয়, যা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু এই ড্রোনটা মাত্র অর্ধেক সময়ের মধ্যেই যন্ত্রাংশ পৌঁছে দিয়েছিল।" রাষ্ট্রশক্তি হোক বা অন্য শক্তিই হোক সেই দিনটা আর বেশি দূরে নেই যখন যুদ্ধের জন্য ব্যাপক ভাবে ড্রোনের ব্যবহার করা হবে।এখন প্রশ্ন হল, ভারত তাহলে কী করছে? ভারতের যে ড্রোনটি চিনের চুম্বি উপত্যকায় পড়ে গিয়েছিল সেটা কিন্তু চিন এখনও ভারতকে ফেরত দেয়েনি।
(সৌজন্যে মেল টুডে)

