অর্থনীতি থেকে সাহিত্য-সংস্কৃতি, সর্বত্রই সাবলীল বিচরণ ছিল অশোক মিত্রের

দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়লেও মতাদর্শে চিরকালই ছিলেন বামপন্থী মনোভাবাপন্ন

 |  2-minute read |   01-05-2018
  • Total Shares

নিজের মতাদর্শে আজীবন ঋজু থেকে বিন্দুমাত্র আপোস না করে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের পথে এগিয়ে চলার এক পথিকের নাম অশোক মিত্র। শুধুমাত্র অর্থনীতির গণ্ডিতে অশোক মিত্রকে ধরে রাখলে তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনের প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি – সব পরিসরেই তাঁর ছিল অবাধ অবগাহন।

মাতৃভাষা এবং বিদেশি ভাষায় সমান ব্যুৎপত্তি এবং অনায়াস বিচরণ ছিল অশোক মিত্রের প্রতিভার সহজাত প্রদর্শন। তাঁর কর্মজীবনও ছিল বৈচিত্রে ভরা। আপাদমস্তক কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে বিশ্বাস রেখেও বিশ্বব্যাঙ্কের অর্থনীতিবিদ হিসাবে এক সময় কাজ করেছিলেন অশোক মিত্র। পরে ইন্দিরা গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। তারও পরে নিজের দল সিপিআইএমের ডাকে বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

১৯৯১ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উদার অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে যে শিল্প শিল্পনীতির পথে চলতে চায় সিপিএম, তার সঙ্গে সহমত হতে পারেননি অশোক মিত্র মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে অর্থমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন তিনি। পরবর্তী কালে দলের সঙ্গেও মানিয়ে নিতে পারেননি অশোক মিত্র। ধীরে ধীরে দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বেড়েছিল। কিন্তু তাঁর বামপন্থী মতাদর্শে ফাটল ধরেনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বামপন্থী মতাদর্শকে সঙ্গে নিয়ে দিন কাটিয়েছিলেন তিনি।

ashok_body1_050118024755.jpgমুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে অর্থমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন অশোক মিত্র (ফাইল ছবি)

ভারতবর্ষে প্রথমসারির দৈনিক সংবাদপত্র এবং পত্রিকায় বামপন্থার বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছিলেন তিনি। ‘কবিতা থেকে মিছিলে’, ‘অচেনাকে চিনে চিনে’, ‘আপিলা কাপিলা’ এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা অসংখ্য প্রবন্ধে তাঁর মনন ও সমাজবীক্ষণের মূল্যবান আকর ছড়িয়ে রয়েছে। প্রবন্ধগুলো পড়লে তাঁর প্রশান্ত মহাসাগরীয় জ্ঞানের আভাস পাওয়া যায়। তাঁর লেখায় তীব্র শ্লেষ এবং ব্যঙ্গ ছড়িয়ে থাকলেও সমালোচনা করতে গিয়ে কখনও মালিন্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণকে প্রশ্রয় দেননি তিনি।

ashok_body2_050118024823.jpgভারতবর্ষে প্রথমসারির দৈনিক সংবাদপত্র এবং পত্রিকায় বামপন্থার বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছিলেন তিনি (ফাইল ছবি)

আমার মনে আছে আমি তখন সবে কলেজে পা দিয়েছি, সেই সময় বামপন্থী প্রার্থীর সমর্থনে এক পথসভার অশোক মিত্রর বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। সংসদে এবং বিধানসভায় জন প্রতিনিধিদের যে অসংসদীয় আচরণের আজ নিন্দা করে থাকেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায়রা, সেই বিষয়টাই সেদিন তুলে ধরেছিলেন তিনি। বিধানসভার সদস্যদের আচরণের মানের নিম্নগামিতা বোঝাতে গিয়ে অশোক মিত্র বলেছিলেন, আমার মা আমাকে রোজই বলেন, “হ্যাঁরে, তোকে কিছু লেখাপড়া শিখিয়েছিলাম আমি। তা এ তুই কোথায় যাস? কাদsর সঙ্গে বসিস?” এই রকম তীব্র, শানিত বাক্যবন্ধ ছিল অশোক মিত্রের বক্তব্য পেশ করার অননুকরণীয় স্টাইল। নিজের বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে কখনও গোঁড়ামি এবং চিন্তার পশ্চাদপদতাকে আমল দেননি তিনি। তাঁর ‘কবিতা থেকে মিছিলে’ প্রবন্ধ সংকলনের প্রথম পাতায় রয়েছে বিশুদ্ধ এবং রোম্যান্টিকতাবাদীদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা। বিশ্বজুড়ে মেয়েদের উপর পুরুষতান্ত্রিকতার শোষণ, অপরাধ, অত্যাচার থেকে মুক্তির নিরিখে যাঁরা কাব্যে নারীবন্দনা করে থাকেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অশোক মিত্র প্রথম পাতায় লিখেছেন, “কবিতায় যে যুবতী মেয়েদের বন্দনা করা হয়, তাদের স্তন এখন ঝুলে মাই হয়ে গিয়েছে।

কী পরিমাণ শোষণ তাঁদের শরীরে ছড়িয়ে রয়েছে, তা এঁদের লেখায় উঠে আসে না।” শেষ বয়সে নিজের প্রিয় দলে মতাদর্শগত বিচ্যুতি তাঁকে রক্তাক্ত করেছিল। এক গভীর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে মেরুদণ্ড সোজা রেখেই চলে গেলেন অশোক মিত্র। এ দেশের কমিউনিস্ট ইতিহাসে বলা যায়, বিদায় নিলেন লাস্ট অফ দ্য মহিকানস

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

BISWAJIT BHATTACHARYA BISWAJIT BHATTACHARYA

Veteran journalist. Left critic. Political commentator.

Comment