রণনীতি সফল, বিজেপির সমর্থন বৃদ্ধি চিন্তা বাড়াবে শাসকশিবিরে
দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপির চেয়ে বহু যোজন এগিয়ে শাসক তৃণমূল
- Total Shares
ঘটা করে রামনবমী পালন হোক বা সামাজিক যোগাযোগ, রাজ্যের পঞ্চায়েত ভোটে দুটো ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, প্রথমত রাজ্যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিরোধী হল বিজেপিই। দ্বিতীয়ত, ২০১৯ সালের ভোটে এই ফল তৃণমূল ধরে রাখতে পারবে, এমন কথা অতিবড় তৃণমূল সমর্থকও বলছেন না।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপির চেয়ে তৃণমূল বহু যোজন এগিয়ে থাকবে বলে যে ফল ভাবা হচ্ছিল, বাস্তবেও সেই ফলই হয়েছে। তবে ফলের বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বেশ কয়েকটি ব্যাপার এখন ভাবাবে তৃণমূল কংগ্রেস তো বটেই, বিজেপি ছাড়া রাজ্যের অন্য রাজনৈতিক দলগুলিকেও।
ভোট যেখানে হয়েছে সেখানে ভালো ফলই করেছে বিজেপি
জঙ্গলমহল কোন পথে?
উত্তরবঙ্গের যে সব এলাকায় আদিবাসী জনজাতির ভোটদাতার সংখ্যা বেশি, সেই সব এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরেই ভোটব্যাঙ্ক তৈরি হয়েছে বিজেপির। শাসকদলের ঘুম ছুটতে পারে পশ্চিমাঞ্চলে ভোটের ফলাফলেও। বিচ্ছিন্ন ভাবে কয়েকটি আসনে জয় নয়, এ বার বেশ কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েত দখল করতে পেরেছে বিজেপি। পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক প্রশ্ন তুলছে, জঙ্গলমহল হাসছে বলে যে প্রচার চলেছে, তার সারবত্তা নিয়ে। জঙ্গলমহল যদি রাজ্য সরকারের প্রকল্পেরর সুবিধা পেয়ে হাসতে থাকে, তা হলে নির্বাচকরা মুখ ফেরালেন কেন?
রাজ্যে আদিবাসীদের উৎসবে পশুহত্যা নিয়ে সরব হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মানেকা গান্ধী। বিজেপিকে বিঁধে উত্তর দিয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। কিন্তু ভোটের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপির দিকে সমর্থন বাড়ছে আদিবাসীদের। তবে নেপথ্য একটা কাহিনিও আছে।
হুল দিবসে রাজ্য সরকার যে উৎসবের আয়োজন করেছিল, তা বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল। তেদের বক্তব্য ছিল, সিদো-কানহুর নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতালের আত্ম বলিদানকে রাজ্য সরকার অপমান করতে চাইলে জঙ্গলমহলে আগুন জ্বলবে। উৎসব হয়েছিল, আগুন জ্বলেনি।
সংখ্যালঘুরা কি বিজেপির দিকে ঝুঁকছে?
রাজ্যে বিজেপিকে আটকাতে গিয়ে নবান্নে ফিস ফ্রাই খেয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন বিমান বসুরা। তাঁর দলের লোক বলেছিলেন, তাঁরা মার খাচ্ছেন আর নেতারা ফিসফ্রাই খাচ্ছেন। বামেদের ভোটব্যাঙ্ক ভেঙেই বিজেপির উত্থান বলে মনে করছিল রাজনৈতিক মহল। দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত মালদহ ও মুর্শিদাবাদে এ বার আসন বেড়েছে বিজেপির।
একটা সময় কংগ্রেস প্রার্থী পছন্দ না হলে সেখানে অধীররঞ্জন চৌধুরী নিজেই প্রার্থী দিতেন এবং জিতিয়ে আনতেন। এখন সেই অধীররঞ্জনের গড়ে তাঁর দল না হয় প্রার্থী দিতে পারেনি শাসকদলের দাপটে। কিন্তু যেখানে বিরোধীরা প্রার্থী দিতে পেরেছে, সেখানেই ভালো ফল করেছে বিজেপি।
পশ্চিমাঞ্চলে যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীরারা, তেমনই মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা। তাই আরেকটা প্রশ্নও উঠতে পারে, তা হলে তৃণমূল নরম-হিন্দুত্বের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ায় মুসলমান ভোট কি বিজেপির দিকে ঝুঁকছে?
মুসলমান নারীর অধিকারকে হাতিয়ার করে এবং তিন তালাকের বিরেধিতা করে বিজেপি মুসলমান নারীদের মন জয় করতে পেরেছে বলে অনেকেই মনে করেন। উত্তরপ্রদেশের ভোটের ফল বার হতেও সেই ধারনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। মালদহ ও মুর্শিদাবাদের ভোটের ফলাফল তাই এই প্রশ্ন আবার সামনে এনে দিচ্ছে। মুসলমান ভোট বিজেপির দিকে গেলে তা ভাবাবে তৃণমূলকে।
ভোটের নিরাপত্তা ছিল রাজ্যের হাতেই
ভোটের মেরুকরণ বিজেপির
হাওড়া জেলার গ্রামাঞ্চলের বড় অংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। বছর দেড়েকের মধ্যে এই জেলা বড় দুটি ঘটনার সাক্ষী। ধূলাগড়িতে দাঙ্গা ও তেহট্টে রথ কমিটির জমিতে গড়ে ওঠা স্কুলে নবি দিবস পালনের দাবিতে সরস্বতী পুজো বন্ধ করে দেওয়া ও দুই ক্ষেত্রেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। হাওড়া জেলায় বেশ কয়েকটি জায়গায় বিজেপি ভালো ফল করেছে।
ই-মনোনয়নে জয়
রাজ্যে পঞ্চায়েতের যে আটটি আসনে ই-মনোনয়ন জমা পড়েছিল (কলকাতা হাই কোর্ট যাকে মান্যতা দিয়েছিল) সেই আটটি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয়ী ই-মনোনয়ন দাখিলকারীরা। ভাঙড়ের পোলেরহাট ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতে ১৬টি আসনের মধ্যে এই পাঁচটিতেই মাত্র নির্দল হিসাবে জমি কমিটির প্রার্থীরা জয়ী হওয়ায় মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে ই-মনোনয়নের কথা ভাবা যেতেই পারে। পঞ্চায়েত ভোটে, যেখানে প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিতে পারছেন না বলে অভিযোগ ওঠে, সেখানে সার্বিক ভাবে ই-মনোনয়ন জমা দেওয়াকে একটি বিকল্প উপায় হিসাবে ভাবুক সরকার ও কমিশন।
২০১৯ সালে কী হবে
পঞ্চায়েত ভোট ও লোকসভা ভোটের মধ্যে কোনও রকম তুলনাই করা চলে না। নির্বাচন কমিশন, নিরাপত্তা কর্মী, ভোটের ইস্যু এবং কেন্দ্রে সরকার গড়া ও রাজ্যের সুযোগ-সুবিধা—অনেক কিছুর উপরে নির্ভর করে ভোট হবে। তাই রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের কোনও বিচারই এই ভোট দিয়ে করা যাবে না। তা ছাড়া এখনও জেলা পরিষদের ফল প্রকাশ হওয়াও বাকি।
পঞ্চায়েত ভোটের ফল দেখে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেও বুঝতে পারবে না, তাদের জনসমর্থন এখন ঠিক কোন জায়গায়। তাই আগামী লোকসভা ভোটে তাদেরও নতুন করে রণকৌশল ঠিক করতে হবে।
২০১৯ ভোটে বিজেপিকে কেন্দ্রে ক্ষমতা থেকে সরাতে কংগ্রেসকে বাইরে রেখে যে তৃতীয় ফ্রন্টের কথা ভাবা হচ্ছে, সেখানে তৃণমূলও রয়েছে। স্থানীয় দলগুলোর আসনসংখ্যার বিচারে এক নম্বরে থাকার চেষ্টা করবে তৃণমূল। তা হলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। কারণ গণিতের হিসাবে একমাত্র উত্তরপ্রদেশের দুই স্থানীয় দলের পক্ষেই তৃণমূলের চেয়ে বেশি আসন পাওয়া সম্ভব। এ রাজ্যে লোকসভা আসনের সংখ্যা ৪২। সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি সেই সংখ্যায় যদি পৌঁছাতে না পারে এবং তৃণমূল ৪২টি আসন দখল করলে (যদি তৃতীয় ফ্রন্ট সরকার গড়ার জায়গায় থাকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।

