জেলাপরিষদ প্রায় সব আসনেই জয়ী তৃণমূল, দাঁত ফোটাতে পারল না বিজেপি

বিচ্ছিন্ন ভাবে অনেক আসন পেলেও, গ্রামপঞ্চায়েতেও চালিকাশক্তি তৃণমূল

 |  3-minute read |   18-05-2018
  • Total Shares

গ্রামপঞ্চায়েতের ফল প্রকাশ শুরু হতেই বিজেপিকে যতটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, পঞ্চায়েত সমিতির ফল প্রকাশ শুরু হতে তার সেই ঔজ্জ্বল্য ম্লান হতে শুরু করে। জেলা পরিষদের ফল বার হলে দেখা যায়, তৃণমূল ১ নম্বরে, তার পরে কেউ নেই! তৃণমূলস্তরে সমর্থন পেলেও যত উপরের স্তরের ফল প্রকাশিত হয়েছে ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের, ততই ফিকে হয়েছে বিরোধীরা।

গ্রামপঞ্চায়েত স্তরেও বিরোধীরা কিছুটা টক্কর দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কটা গ্রাম পঞ্চায়েত দখল করতে পেরেছে বিরোধীরা? ভাঁড়ার শূন্য না হলেও উল্লেখযোগ্য ফল করতে পারেনি কোনও বিরোধীই। আসন পাওয়াই কিন্তু গ্রামপঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতিতে যথেষ্ট নয় কেউ ৪৯ শতাংশ

ভোট ও আসন পেয়েও একটিও গ্রামপঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতিতে বোর্ড গঠন করার নাও করে উঠতে পারে।পার্থক্যের গোড়ার কথা

মনোনয়ন পত্র দাখিলের সময় দেখা গিয়েছে, গ্রাম পঞ্চায়েতে যেখানে ৩৪ শতাংশের বেশি আসনে বিরোধীরা প্রার্থী দিতে পারেনি, কিন্তু ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের সর্বোচ্চ স্তর জেলা পরিষদে ২৬ শতাংশ আসনে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। ফল প্রকাশ হতে দেখা গেল, সর্বনিম্ন স্তরে বিরোধীরা যত আসনে জয়ী হতে পেরেছে, সর্বোচ্চ স্তরে তার কোনও প্রতিফলনই নেই।

এমন উলট পুরাণ অবশ্য এ বারই প্রথম, এমন নয়। বামফ্রন্টের আমলেও দেখা গিয়েছে বেশ কয়েকটি জায়গায় বিরোধীরা পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন করেছে, কিন্তু জেলা পরিষদে তেমন ভালো ফল করতে পারেনি। নিচুস্তরে প্রার্থী দেওয়া নিয়ে হুমকির মুখে পড়া এ রাজ্যে নতুন নয়, কিন্তু সেখানে প্রার্থী পরিচিত হন এবং নিজের পরিচিতির জন্য বা জনসংযোগের জন্য অনেক সময়ই জয়ী হন।

সংগঠন না থাকলে উপরের স্তরে সেই ব্যক্তিগত জনসংযোগ বা ক্যারিশমা কাজে লাগে না, প্রচারের ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। তা ছাড়া অনেকগুলি গ্রামপঞ্চায়েতের ভোট যখন একত্রিত হয় (ধরে নেওয়া যাক একজন ব্যক্তি তিনটি স্তরেই একই প্রতীকে ভোট দিয়েছেন)তখন দেখা যায়, দু-চার ভোটের ব্যবধানে কোনও আসনে হয়তো বিরোধীরা কেউ জিতে গেছেন, কিন্তু বৃহত্তর ক্ষেত্রে তা কোনও প্রভাবই ফেলতে পারেনি ফলাফলের উপর।

নেতৃত্বের অভাব

সিপিএম আমলে যেমন এক একটি জেলার দায়িত্বে থাকতেন এক এক জন বড় মাপের নেতা-মন্ত্রী (মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজেও দার্জিলিং ও মুর্শিদাবাদ জেলার দায়িত্বে ছিলেন)। তৃণমূল আমলেও বিভিন্ন মন্ত্রীকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিজেপি-সিপিএম-কংগ্রেসও ব্যতিক্রমী নয়। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী ও অরূপ বিশ্বাসের মতো দক্ষ সাংগঠনিক নেতার বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো দক্ষতা ও প্রভাব ছিল না সেই সব জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বিরোধী দলের নেতাদের। তাই ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের উপরের দিকে অনেকটাই পিছিয়ে গেছে বিরোধীরা।

body1_050418113945_051818081756.jpgবিরোধীরা বলছেন, পুলিশ ও গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে শাসকদল তাদের আটকে দিয়েছে

শুধু ধারে ও ভারে নয়, তার বাইরেও আরও একটা দিকে পিছিয়ে গেছে বিরোধীরা। বড় মাপের তৃণমূল নেতারা জেলা ধরে যতটা সময় ব্যয় করেছেন, সেই সময়ে কংগ্রেস-সিপিএমেক খুঁজেই পাওয়া যায়নি। আর বিজেপি ব্যস্ত থেকেছে সামাজিক কাজে, মানে রামনবমী-মহাবীর জয়ন্তী পালন করা নিয়ে। তাতে ভোটের মেরুকরণ কিছুটা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সংগঠন জোরদার হয়নি।

সাংগঠনিক দুর্বলতা

বিরোধীরা বলছেন, পুলিশ ও গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে শাসকদল তাদের আটকে দিয়েছে। এই অভিযোগ যদি ঠিকও হয়, তা হলেও একটা প্রশ্ন রয়েই যায়। পুলিশ ও হার্মাদ বাহিনী নিয়ে ভোট করিয়ে ২০০৮ সালের ভোটে কি ২০০৩ সালের পঞ্চায়েতের মতো ফল করতে পেরেছিল বামফ্রন্ট?

সেই সময় বামফ্রন্ট সাংগঠনিক ভাবে দুর্বল হচ্ছিল। তাই তাদের ভোট মেশিনারি ঠিকঠাক কাজ করেনি। এ বারের পঞ্চায়েত ভোটেও সেই সাংগঠনিক অভাবটাই দেখা গিয়েছে বিরোধীদের। আচমকা ভোট ঘোষণা হওয়ায় বিরোধী শিবিরেরর ছন্নছাড়া অবস্থাটাই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

তৃণমূল কংগ্রেস যেখানে পাঁচ বছর ধরে সংগঠন তৈরি করেছে, সেখানে জেতা পঞ্চায়েতের জনপ্রতিনিধিদের ধরে রাখতে পারেনি বিরোধীরা। তা ছাড়া যে সব গ্রাম পঞ্চায়েতে জনপ্রতিনিধিদের ভাঙিয়ে নিয়েছিল তৃণমূল, এ বারের ভোটে সেই সব পঞ্চায়েতেও সার্বিক ভাবে ভালো ফল করেছে তৃণমূল।

জঙ্গলমহলের ফল

জঙ্গলমহলে বিজেপি ভালো করেছে বলে প্রথম থেকে মনে হলেও, ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের ফল বার হতে দেখা গেল, জেলা পরিষদে ঠিক ততটা ছাপ তারা ফেলতে পারেনি। তবে তৃণমূল এখন থেকেই জঙ্গলমহলের দিকে নজর দেওয়া শুরু করছে যাতে ২০১৯ সালের ভোটে এই দুর্বলতা ঢেকে দেওয়া যায়। বিজেপির পক্ষে দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে বাবুল সুপ্রিয়র লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির মুখ থুবড়ে পড়া। আসানসোলে পুরনির্বাচনে ধরাশায়ী হয়েছে বিজেপি। পুরভোটে বিজেপি একটা আসনও না পাওয়ার পরে এই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়েছে। এই ধরণের ঘটনার পরেও সেখানে ভোটের মেরুকরণ করতে পারেনি বিজেপি। সেটাও তাদের কাছে চিন্তার কারণ হতে পারে।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment