কোফি আন্নান: ঘানা থেকে রাষ্ট্রসঙ্ঘ এবং নোবেল পুরস্কার
রুয়ান্ডা ও সার্বিয়ায় গণহত্যার পরেও রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব, তারপরে নোবেল পুরস্কার
- Total Shares
আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কোফি আন্নানই প্রথম রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব হয়েছিলেন। তবে শান্তিপ্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও কেন তাঁকে মহাসচিব করা হল, কেনই বা তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হল?
কোফি জন্ম তৎকালীন ব্রিটিশশাসিত ঘানার কুমাসি শহরে। তাঁর মা-বাবা দু’জনেই ছিলেন উপজাতি গোষ্ঠীর। তাঁর বাবা ছিলেন শিক্ষিত। সে দিক থেকে উপজাতীয় ও আধুনিক দুই সংস্কৃতি গায়ে মেখেই বড় হন আন্নান।
Knowledge is power. Information is liberating. Education is the premise of progress, in every society, in every family ~ Kofi Annan. Rest in Peace Kofi Annan , First Black UN Secretary - General and of Ghanaian origin. May your legacy forever live on ❤️#KofiAnnan pic.twitter.com/C7ZxQXTvZO
— Ghana Students Sussex (@GSSSociety) August 18, 2018
It is with immense sadness that the Annan family and the Kofi Annan Foundation announce that Kofi Annan, former Secretary General of the United Nations and Nobel Peace Laureate, passed away peacefully on Saturday 18th August after a short illness... pic.twitter.com/42nGOxmcPZ
— Kofi Annan (@KofiAnnan) August 18, 2018
১৯৯৭ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দুই মেয়াদে আনান বিশ্বের শীর্ষ কূটনীতিকের দায়িত্বে ছিলেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব হওয়ার আগে আন্নান ওই প্রতিষ্ঠানেরই শান্তিরক্ষা দপ্তরের প্রধান ছিলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি ওই পদে বহাল হন আর ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে তুতসি ও হুতু জনগোষ্ঠীর আট লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হন। এই ঘটনার ঠিক এক বছর পর বসনিয়ায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের উল্লেখিত নিরাপদ এলাকার ভিতরেই মোটামুটি আট হাজার মানুষকে হত্যা করে সার্ব বাহিনী। এই সব ঘটনায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ঝড় বয়ে যায়। প্রচণ্ড তোপের মুখে পড়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা দপ্তর।
প্রথম অশ্বেতাঙ্গ আফ্রিকান হিসাবে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব হন কোফি আন্নান (রয়টার্স)
অভিযোগ ওঠে, রুয়ান্ডার ওই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর উপর গণহত্যার পরিকল্পনার খবর আগে থেকে জেনেও সেটাকে অবহেলা করেছে আন্নানের দপ্তর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, রুয়ান্ডা ও বসনিয়ার গণহত্যা ঘটে যাওয়ার পরও ১৯৯৭ সালে আন্নানের রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব হওয়া আটকায়নি। দুনিয়াজোড়া সমালোচনা, অভিযোগের ঝড় উঠলেও ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিষ্ঠানের মহাসচিব পদে নিযুক্ত হন আন্নান।
For me growing up, #KofiAnnan was the @UNHe made us, an entire generation; believe, trust & count on multilateralism.He believed that young people are “never too young to lead” & created platforms for us to be heard & empowered.Join Madiba in heaven & guide us Dear Sir! pic.twitter.com/U1x3yEA7Jj
— UN Youth Envoy (@UNYouthEnvoy) August 18, 2018
রুয়ান্ডা ও বসনিয়ার নৃশংসতা ঠেকাতে না পারার দায় আন্নান অবশ্য পরবর্তী সময়ে অবনত চিত্তে স্বীকার করেছিলেন। কেবল তাই নয় ১৯৯৮ সালে রুয়ান্ডা সফরে গিয়ে মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে নৃতাত্ত্বিক তুতসি ও হুতু জনগোষ্ঠীর আট লাখ মানুষ গণহত্যায় নিজের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকারও করেন।
১৯৯৪-৯৫ সাল নাগাদ রাষ্ট্রসঙ্ঘ নামক আন্তর্জাতিক সংস্থাটির হাল অত্যন্ত শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, বিশেষত সংস্থাটির অর্থনৈতিক অবস্থা সেই সময় এতটাই খারাপ হয়ে পড়েছিল যে বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়ে সংস্থা চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। সেই অবস্থায় সংস্থার হাল ধরতে দরকার ছিল এমন একজনকে যিনি ওই সঙ্কট থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে টেনে তুলতে পারবেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেই দুর্দিনে কাঁধ দিয়েছিলেন কোফি আন্নান।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের সঙ্গে একযোগে পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার (রয়টার্স)
প্রয়োজনের তাগিদে তিনি তখন সংস্থায় ব্যাপক সংস্কারে মনোযোগী হন। যার মধ্যে ছিল বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই এবং বাজেট সঙ্কোচন কর্মসূচিও। রাষ্ট্রসঙ্ঘে সেদিন তিনিই ছিলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ পদাধিকারী যিনি ১৯৮৩ সালে নিউইয়র্কে সদর দফতরে ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস অফিসে বাজেট পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। পরবর্তীতে ওই দফতরের বাজেট পরিচালকও হন তিনি। সেখান থেকে ১৯৯০ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের অফিস অব প্রোগ্রাম প্ল্যানিং, বাজেট অ্যান্ড ফিনান্সের সহকারী মহাসচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন। স্বভাবতই আন্নানের কর্মী ও বাজেট সঙ্কোচনের প্রস্তাব মেনে নেয় রাষ্ট্রসঙ্ঘ। আর এখান থেকেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে সংস্থার মহাসচিব পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়ে যায়। ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘে যোগ দেওয়ার পর থেকে আন্নান তাঁর রাষ্ট্রসঙ্ঘের ক্যারিয়ারে প্রতিটি ক্ষেত্রে এ ধরণের সর্বোচ্চ অবদান দেখিয়েই ১৯৯৭ সালের জানুয়ারি থেকে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন শুরু করেছিলেন।
Visited the Taj with #KofiAnnan in 1995. He was a true friend of India w/great respect for our culture as well as our contributions to the UN &to world peace. I dedicated my book"Nehru: The Invention of India" to him because he said he was inspired by Nehru as a student in Ghana. pic.twitter.com/vFjZuyJ7Bq
— Shashi Tharoor (@ShashiTharoor) August 18, 2018
বলা হয় প্রথম মেয়াদে রাষ্ট্রসঙ্ঘের কার্যক্রমে অভাবনীয় ইতিবাচক পরিবর্তন করতে পারায় আন্নানকে ২০০১ সালে দ্বিতীয় দফায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব পদে ফের নিয়োগ করা হয়। কেবল তাই নয়, ২০০১ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সঙ্গে আন্নানকেও যৌথ ভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ওই পুরস্কার দেওয়ার কারণ হিসেবে তখন নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্নান রাষ্ট্রসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা সংস্থাকে নতুন রূপ দিয়েছেন। কী ভাবে দিয়েছেন তার ব্যাখ্যাও দেয় নোবেল কমিটি। বলা হয়, সাধারণ নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় আরও বেশি তৎপরতা দেখিয়েছেন আনান। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং এডসের মতো রোগের প্রতিরোধে তাঁর কার্যকর পদক্ষেপই রাষ্ট্রসঙ্ঘকে বিশ্ববাসীর দরবারে আরও সম্মানিত করেছে।
My family and I with Kofi Annan in Ghana in 1998, his first visit home after becoming Secretary-General. He cared deeply about his staff. Over 10+ years that I worked with him, no matter how official the occasion, he never failed to ask me about my son, Tom. #KofiAnnan pic.twitter.com/i9Efk8y1X8
— Margaret Novicki (@MANovicki) August 18, 2018
আন্নান রাষ্ট্রসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা দপ্তরের প্রধান থাকাকালীন রুয়ান্ডা ও বসনিয়ার গণহত্যা, এমনকি সোমালিয়ায় মার্কিন সেনাদের মৃত্যু ঘটেছে বলে আমেরিকার যে দাবি তার জন্যও খোদ আমেরিকা আনানের তীব্র সমালোচনা করে। লক্ষ্যনীয় প্রতিটি ব্যর্থতায় আন্নান নিজের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের মতো সংস্থার গুরুত্ব কতটা তার কৈফিয়ত দিয়েছেন।
একদিকে আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ-সংঘাত আর রক্তক্ষরণ। বিগত দু’টি দশক ধরে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, ভীত, সন্ত্রস্ত, গৃহহীন, শরনার্থী মানুষের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েই চলেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নোবেলজয়ী সচিব যে শান্তিরক্ষা সংস্থাকে নতুন রূপ দিলেন তাতে কী হল? গোলা-বারুদের স্তূপ যে বাড়তে বাড়তে পাহাড় হয়ে উঠল! বিস্ফোরণ আর হামলায় মৃতের মিছিল আরও লম্বা হল। রাষ্ট্রসঙ্ঘে মধ্যস্থতায় চিঁড়ে ভিজল কই।
বক্তৃতারত কোফি আন্নান (রয়টার্স)
১৯৯০ নাগাদ কুয়েত যুদ্ধের সময় ইরাক থেকে যুদ্ধবন্দিদের মুক্তির জন্য মধ্যস্থতা করেছিলেন আন্নান। কিন্তু তাতে লাভ কি হয়েছিল? কফি আনান যখন জাতিসংঘের শীর্ষ পদে আসীন হন সেটা আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে অস্থির সময়। সেই সময়েই রাজনৈতিক বিশ্বের দোরগোড়ায় হাজির হয় নতুন কিছু সমস্যা আর তার মোকাবিলা করাটাই ছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘের মতো আন্তর্জাতিক মানব রক্ষা ও অধিকার সুরক্ষাকারী সংগঠনের কাছে মস্ত চ্যালেঞ্জ।
নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসবাদী হামলা থেকে শুরু করে ইরাকে আমেরিকার একতরফা আক্রমণ। ইরাকে হামলার তিনি বিরোধিতা করলেন। জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে নিজের শেষ বক্তৃতায় তিনি প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কড়া সমালোচনা করলেন। আমেরিকা আন্তর্জাতিক ঐকমত্যকে পাশ কাটিয়ে ইরাকে একতরফা আক্রমণ চালিয়ে গেল। আর শান্তির পক্ষে অটল অবস্থানের জন্য তিনি পেলেন নোবেল পুরস্কার। শান্তির জন্য তাঁর প্রচেষ্টা কতদূর সফল। কোফি আন্নান ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে প্রয়াত নেতার সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি তার কর্মজীবনে সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কী সেই উদ্যোগ, তার ফলাফল কতদূর প্রসারিত?
কোফি আন্নান (রয়টার্স)
১৯৯৮ সালে নাইজেরিয়ায় বেসামরিক শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে তার প্রচেষ্টা পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হয়, সাদ্দাম হুসেন সরকারের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলে অভিযোগ উঠলে ইরাকের সঙ্গে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, তা প্রশমন করতে আনান বাগদাদ সফরে যান, কিন্তু তাঁর কথায় কাজ হয় না বরং যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল অবস্থায় পৌঁছয়। আন্নানের দেওয়া আশ্বাসেও ইরাক পশ্চিমী শক্তির আগ্রাসন থেকে রক্ষা পায় না।
The world mourns a great leader and humanitarian but celebrates a life full of courage, empathy and remarkable public service.Former UN Secretary General and Nobel Peace Prize winner #KofiAnnan devoted his life to making the world a more peaceful place: https://t.co/BppRkHgjHZ pic.twitter.com/W8MQ4qVjog
— European Commission ???????? (@EU_Commission) August 18, 2018
অনেকের ধারণা ১৯৯৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে পূর্ব টিমোরের স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে তিনিই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। না, এতে আন্নানের ভূমিকাকে বড় করে দেখলে পূর্ব টিমোরের স্বাধীনতা লাভকে ছোট করা হয়। যেমন ২০০০ সালে লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারে কোফি আনন বা রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভূমিকা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক।
বিদায় কোফি (রয়টার্স)
প্রশ্ন ওঠে, কোফি আনান আফ্রিকার একজন কৃষ্ণাঙ্গ হয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি কতটুকু মমত্ব দেখিয়েছেন? ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির আলফ্রেড পি. স্লোয়ানে ফেলোশিপটি শেষ করার পর কোফি আন্নান ঘানায় ফেরার বদলে নিউ ইয়র্কের রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদর দফতরে চাকরিতে যোগ দেন। ২০০৬ সালে আন্নান যখন রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন, তখনও ঘানা নয়, সব ব্যস্ততা থেকে একেবারে দূরে সরে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি সুইটজারল্যান্ডের জেনেভার কাছে একটি গ্রামে বাস করতেন।

