জরুরির অবস্থার কথা মনে করিয়ে আগামী লোকসভা কতটা লাভ হবে বিজেপির?
উপনার্বাচনে পরাজয় ও বিরোধীদের জোট বাঁধতে দেখে দিশাহারা বিজেপি
- Total Shares
ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করা এক কালো অধ্যায়। জরুরি অবস্থার সময় ভারত দেখেছিল এক অভূতপূর্ব সরকারি নিয়ন্ত্রণ। বাকস্বাধীনতা থেকে শুরু করে মানুষের সংবিধানে দেওয়া সমস্ত মৌলিক অধিকার সে সময় খর্ব হয়েছিল। তার মূল্যও শোধ করতে হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীকে। নির্বাচনে ইন্দিরার পরাজয় শুধু নয়, ১৯৭৭ সালে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার ক্ষমতা দখল করেছিল কেন্দ্রে। যদিও তার পরেও মানুষের মন জয় করে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী।
কিন্তু জরুরি অবস্থার কালো দাগ শুধু ইন্দিরা গান্ধী নয়, কংগ্রেসও আজও তার দায় বহন করে চলেছে। এখনও বহু সংগঠন জরুরি অবস্থা চালুর দিনটিকে স্মরণ করে সভা সমাবেশ করে থাকে। ইন্দিরা গান্ধী যখন জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন সেই সময় তাঁকে সমর্থন করেছিল ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি সিপিআই। সেই সিদ্ধান্তের ফল সিপিআইকেও ভুগতে হচ্ছে। জরুরি অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করতে গিয়ে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সমালোচকরা। তাঁরা দেখিয়েছেন ক্ষমতা হারানোর ভয়ে সন্ত্রস্ত ইন্দিরা গান্ধীকে জরুরি অবস্থা জারি করার আইনি পরামর্শ কারা দিয়েছিলেন।
১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করেন ইন্দিরা গান্ধী (ফাইল চিত্র)
মানুষের স্মৃতি স্লেটের মতো। তাতে বহু লেখা যেমন ফুটে ওঠে তেমনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধূসর হয়ে যায়। জরুরি অবস্থার কালো দিনগুলির স্মৃতিও আজ অনেকটাই বিস্মৃত। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেসকে কোণঠাসা করতে জরুরি অবস্থাকেই হাতিয়ার করেছে বিজেপি। জবলেস গ্রোথ, জিডিপির হার নিম্নগামী, কালো টাকার রমরমা রুখতে না পারা, একের পর এক উপনির্বাচনে ধরাশায়ী হওয়া বিজেপিকে কিছুটা দিশাহারা করে তুলেছে। এই অবস্থায় আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জোট বন্ধনের প্রক্রিয়া সেই দিশাহারা অবস্থাকে আরও বাড়িয়েছে।
বিরোধীদের পর্যদুস্ত করতে লাগসই ইস্যু এখন খুঁজে চলেছে আরএসএস এবং বিজেপি। জরুরি অবস্থার ৪৩ বছর পূর্তিতে বিজেপি তাকে ইস্যু করতে চাইছে। এই কারণে নরেন্দ্র মোদী সহ বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মুখে এখন জরুরি অবস্থার সমালোচনা শুরু হয়েছে।
জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে ইন্দিরা গান্ধীকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন বিজেপির অরুণ জেটলি
তবে সবাইকে পিছনে ফেলে এই দৌড়ে এগিয়ে গিয়েছেন অরুণ জেটলি। তিনি জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে জার্মানির প্রয়াত ফুয়েরার হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এতদিন কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য সমাজতান্ত্রিক বিরোধী দলগুলি হিটলার বন্দনার জন্য আরএসএস তথা সঙ্ঘ পরিবারকে নিশানা করে এসেছে। আরএসএসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা গুরুজি গোলওয়ালকরের 'উই অ্যান্ড আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন' বইটিকে হাতিয়ার করেছে বিরোধীরা। বহু সময়ে ওই বইতে লেখা অংশে জার্মানি ও হিটলারের বন্দনাকে তুলে ধরে তারা বিঁধেছেন আরএসএসকে।
যেমন, ওই বইতে লেখা 'Germany has also shown how well-nigh impossible it is for races and cultures having differences to be assimilated into one united whole, a good lesson for us in Hindustan to learn and profit by'. এই লাইনটিকে তুলে ধরে সমালোচকরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন গুরুজির কাছে হিটলারের নীতি কতটা গ্রহণযোগ্য ছিল।
শুধু গুরুজি নন আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতারা যাঁর ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন সেই সাভারকারের লেখা থেকেও উদ্ধৃতি তুলে সমালোচকরা আরএসএসের ভাবাদর্শে সঙ্গে নাৎসিজিমের মিল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। যেমন এই লাইনটি: “Nazism proved undeniably the savior of Germany. There is no reason to support that Hitler must be a human monster because he passes off as a Nazi. Purely Hitler knows better than Pandit Nehru does what suits Germany best.”
এখন আরএসএস গায়ে লেগে থাকা হিটলারের ট্যাগ অরুণ জেটলি ফিরিয়ে দিতে চাইছেন কংগ্রেসের গায়ে। এই অবস্থায় চলতি বছরের শেষে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে। এই তিন রাজ্যে বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি কংগ্রেস। লোকসভা নির্বাচনের আগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই তিন রাজ্যের ভোট। এই তিন রাজ্যের ভোটে কংগ্রেস ভালো ফল করলে লোকসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেস যেমন উজ্জীবিত হবে তেমনই চাপে পড়বে বিজেপি।
তাই এখন থেকেই কংগ্রেসকে পর্যদুস্ত করতে কৌশল খুঁজতে শুরু করেছে গেরুয়া শিবির। তাদের রণকৌশলে অন্যতম হাতিয়ার হতে চলেছে জরুরি অবস্থা। অন্তত বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বচন তাই বলছে। এখন প্রশ্ন হল জরুরি অবস্থাকে হাতিয়ার করে কি ভোটারদের মন জয় করা যাবে?
কারণ এই মুহূর্তে ভারতবর্ষে জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশই তরুণ প্রজন্ম। ফলে প্রতি বছরই লাফে লাফে তরুণ প্রজন্মের ভোটার সংখ্যা বাড়ছে। এই অংশের স্মৃতিতে জরুরি অবস্থার দিনগুলিকে কি জাগিয়ে তোলা যাবে? কারণ তাঁরা কেউই ওই সময়ে জন্মাননি।

