এ রাজ্যে কেন, কী ভাবে সংগঠন বাড়াচ্ছে বিজেপি

লোকসভায় লক্ষ্য পূরণে দু’বছরে এ রাজ্যে কতটা এগিয়েছে বিজেপি

 |  6-minute read |   26-07-2018
  • Total Shares

সঙ্ঘ পরিবার সংগঠন করবে আর বিজেপি ভোটে লড়বে—এই তত্ত্বে যে কাজ হবে না, তা বেশ কিছুদিন আগেই বুঝেছে বিজেপি। নতুন তত্ত্ব খাড়া করেছে, কিন্তু গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে লড়ার লোক কোথায়? মিসড কল দিয়েছে অনেকেই, অনেকে সদস্যও হয়েছিলেন, তাঁরা কি এখনও সদস্য? প্রশ্ন বিজেপির অন্দরেই। তুফান উঠছে বটে, কিন্তু তা তো চায়ের কাপের আটকে থাকছে! তাই সেলসম্যানের ছকে সংগঠন বাড়ানোয় জোর দিয়েছে বিজেপি, টার্গেট বেঁধে দিয়ে।

সম্প্রতি এ রাজ্যে এসে ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ২২টি আসনে জয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। দিলীপ ঘোষ নাকি আরও এককদম এগিয়ে বলেছেন ৩৫টি আসন চাই। বাস্তবে কি তা সম্ভব? দলীয় সূত্রে খবর, এ বার গুজরাট, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ তো বটেই উত্তরপ্রদেশেও আসন সংখ্যা কমার আশঙ্কা করছে বিজেপি। তাই পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, তেলাঙ্গনা ও অন্ধ্রপ্রদেশে তাদের আসন বাড়াতেই হবে ক্ষমতায় টিঁকে থাকতে হলে।

ফাঁকা আওয়াজ বন্ধ

২০১৪ সালের ভোটে দেশজুড়ে মোদী ঝড়ের মধ্যে এ রাজ্য থেকে একটিমাত্র আসন পেয়েছিল বিজেপি, দ্বিতীয় আসনটি তাকে উপহার দিয়েছিল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। মোর্চার আসন বিজেপি ধরে রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে এখন প্রশ্ন দলের মধ্যে। তবে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিনা যুদ্ধে জমি ছাড়তে রাজি নয়। কারণ ২০১৪ সালের ভোটে যে দলটি মূলত চতুর্থ স্থানে ছিল, এখন তারাই এ রাজ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল, সর্বশেষ ভোটের বিচারে। বদলটা আসতে শুরু করে ২০১৬ সাল থেকে। তার আগে বিজেপি একটি মাত্র উপনির্বাচনে জয়ী হয়েছিল অনেকটা সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েই।

body3_071318021743_072618053007.jpg১৬ জুলাই পশ্চিম মেদিনীপুরে নরেন্দ্র মোদীর জনসভা

২০১৬ সালেই ওয়ার্ড ভিত্তিক সংগঠন পুরোপুরি ভেঙে দিয়ে বুথ ভিত্তিক সংগঠন করতে শুরু করে বিজেপি। প্রতিটি বুথে ১০ জনের কমিটি গড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সব বুথে যে তারা কমিটি গড়ে ফেলে এমন নয়, কিন্তু শক্তি বাড়তে থাকে ব্লকস্তরে, যাকে সাংগঠনিক ভাষায় বিজেপি বলে মণ্ডল।

মিসড কল দিয়ে সদস্য বৃদ্ধি

মিসড কল করে সদস্য বাড়ানোর যে পরিকল্পনা বিজেপি করেছিল, তাতে অসংখ্য মিসড-কল পেয়েছিল। দলীয় সূত্রে খবর, এর মোটামুটি ৪৫ শতাংশ বিজেপির সদস্যপদ নিয়েছিলেন, অর্থাৎ সদস্য হয়েছিলেন ৪৫ লক্ষ মতো। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩.৫ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষের মধ্যে। ১৫ অগস্ট আবার শুরু হচ্ছে একই ভাবে সদস্য নেওয়া ও সদস্য নবীকরণ। চলবে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তারপরে তারা দেখে নেবে ভোটের মুখে তাদের প্রকৃত সদস্যসংখ্যা কত হচ্ছে।

কিছু দিন আগে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেলসম্যানদের মতো টার্গেট বেঁধে দিয়েছিলেন সাংগঠনিক জেলার নেতাদের। প্রতি জেলায় সদস্য বাড়াতে হবে। এ রাজ্যে বিজেপির মোট ৩৭টি সাংগঠনিক জেলা আছে। ৩৭টি সাংগঠনিক জেলার নেতাদের ১০ জন করে নতুন সদস্য বাড়াতে বলা হয়েছিল ১০ দিনের মধ্যে। নতুন সদস্যদের মোবাইল নম্বর ও ভোটার কার্ডের ফোটোকপি দাখিল করতে হয়েছে একেবারে কেন্দ্রীয় স্তরে। সকলে লক্ষ্য পূরণ করতে পারেননি ঠিকই, তবে তাতেও মাত্র দশ দিনে রাজ্যে ২০ হাজার মতো সদস্য বেড়ে যায়।

দলকে যাতে কেউ ধোঁকা দিতে না পারে সে জন্য নতুন সদস্যদের ভোটার কার্ড ও মোবাইল নম্বর পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়। রাজ্যের হাত থেকে দলের রাশ চলে যায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে। দীর্ঘ দিন ধরে যে ফাঁকা আওয়াজ দেওয়া হত, তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

শ্রমিক সংগঠন শুরু

এ রাজ্যে সিপিএমের যে সব শ্রমিক সংগঠন তৃণমূল দখল করতে পারেনি, সেই সব সংগঠনের লোকজনকে বিজেপিতে টানা সম্ভব হচ্ছিল না, কারণ বিজেপির কোনও শ্রমিক সংগঠন ছিল না। ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ ছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের অধীন। মূলত পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক সংগঠনগুলির কথা ভেবেই মজদুর সঙ্ঘ তৈরি করল বিজেপি, এই বছরের এপ্রিলের গোড়ায়। তবে এতে এখনও পর্যন্ত কোনও সাড়া পায়নি বিজেপি।

body2_071318021921_072618053042.jpgমিশন 'এবার বাংলা': বিজেপির হেভিওয়েট নেতা-নেত্রীরা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে আসবেন

রাজ্যে অসংগঠিত শ্রমিকদের উপরে জোর দিতে শুরু করেছে বিজেপি। তাদের জন্য কৃষি শ্রমিক উন্নয়ন মোর্চা তৈরি করে অবহেলিতদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করে বিজেপি। আদিবাসী অঞ্চলে এঁরা বেশি সংখ্যায় রয়েছেন, তাই এই অঞ্চলে তার প্রভাব হাতেনাতে পেয়েছে তারা।

আদিবাসী এলাকায় সাফল্য

অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য পাকসু নামে সংগঠন তৈরি করায় আদিবাসী অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে বিজেপি। তারা অবশ্য আদিবাসী নয়, বনবাসী শব্দবন্ধ ব্যবহার করে। এই সব অঞ্চলে প্রথম দিকে সঙ্ঘের প্রভাবই কাজে লাগিয়েছে তারা। তা ছাড়া ব্রিটিশ যুগ থেকে বঞ্চনার কথা তুলে ধরে, তাদের প্রাপ্য কী, সে সব বুঝিয়ে তাদেরও দলে টানতে সমর্থ হয়েছে। উত্তরবঙ্গে চা-শ্রমিকদের উপরেও তারা প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। খুব শীঘ্রই রাজ্যে আসতে পারেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুরেশ প্রভু, চা বাগান নিয়ে তিনি দলীয় স্তরে আলোচনা করতে পারেন।

দার্জিলিং আসনে তৃণমূলকে ওয়াকওভার দিতে রাজি নয় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তারা গোর্খা-প্রধান এলাকায় সংগঠন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি যখন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার ছত্রছায়ায় ছিল, তখন পাহাড়ে সংগঠন বাড়িয়ে ফেলেছে তৃণমূল।

আরএসএসের লক্ষ্য

বিজেপির নীতি আরএসএসের আদর্শের উপরে দাঁড়িয়ে। ২০২৫ সালে আরএসএসের শতবর্ষ। ২০১৬ সালে যেখানে পশ্চিমবঙ্গে ৪০০ মতো শাখা ছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা ১০০০-এ নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তারা এই লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারলে বিজেপির লাভ।

সাধারণ সদস্য বাড়ানোর পাশাপাশি নেতাও দরকার হয়। সাধারণ ভাবে সঙ্ঘ পরিবারের সদস্যদেরই হাতেই থাকে বিজেপির নেতৃত্ব। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নেতৃত্বের সঙ্কট। তাই তারা সঙ্ঘের শাখা বিস্তার করে সেই ঘাটতি পূরণ করতে চাইছে।

সংখ্যালঘু ভোট

তৃণমূল সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী হুমায়ুন কবির বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। হুমায়ুন আগেও দলবদল করেছেন, মন্ত্রী হওয়ার পরে ভোটে হেরেছেন। কিন্তু তৃণমূল সরকারের মুসলমান মন্ত্রী বিজেপিতে আসছেন, এটা বিজেপির লাভ। এ ছাড়া মন্ত্রিত্ব ও তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন আব্দুল করিম চৌধুরী, এটাও বিজেপির বড় লাভ।

তিন তালাক নিয়ে আইন এনেছে বিজেপি। পাশাপাশি তারা প্রচার করতে চাইছে এ রাজ্যে কী ভাবে তাদের ভোট ব্যাঙ্ক হিসাবে ব্যবহার করে আসা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেন শিক্ষার হার কম, সে কথাও প্রচার করছে বিজেপি। এ রাজ্যে ফল ভালো করতে গেলে যে সংখ্যালঘু সমর্থন দরকার সে  কথা বুঝতে পেরেছে বিজেপি।

শিক্ষিত সমাজে প্রভাব বিস্তার

এ রাজ্যে যাঁরা বুদ্ধিজীবীদের মুখ, তাদের কোনও ভাবেই দলে টানতে পারছে না বিজেপি। তাই তারা অন্য পন্থা নিয়েছে। শহরের পাড়া ও গ্রামাঞ্চলে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের প্রভাব রয়েছে। তাই দলের জাতীয়তাবাদী মনোভাব নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করছে বিজেপি। তাতে নিজেদের মত বলার পাশাপাশি তাঁদের মতও জেনে নিচ্ছে। ক্লাবগুলির মধ্যেও তারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

সমাজের নামী ব্যক্তিদের ধার ও ভার মেপে তাঁদর কাছে দলের নেতাদের পাঠাচ্ছে বিজেপি। তাতে সমাজের উপরতলায় নিজেদের কথা বলা হচ্ছে। কিছু দিন আগে রাজভবনে রাজ্যপাল যে চা-চক্রের আয়োজন করেছিলেন, সেটি বিজেপির প্রচারের অঙ্গ বলেও অনেকে মত দিয়েছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে অবশ্য এখনও বিজেপির সংগঠন নেই। এ ব্যাপারে অখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) উপরেই তারা নির্ভরশীল। ধরেই নেওয়া হয়, তারা বিজেপিরই সমর্থক। তবে বাস্তবে তাদের উপরে বিজেপির কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই।

জনসংযোগ কোন পথে

ইতিমধ্যেই রামনবমীকে এ রাজ্যে খবরের  শিরোনামে এনে ফেলতে পেরেছে বিজেপি। হনুমান জয়ন্তীও পালন হচ্ছে ঘটা করে। এর মাধ্যমে বিজেপি কতটা জনসংযোগ বাড়াতে পেরেছ তা বোঝা যাচ্ছে বিজেপির কাছ থেকে তৃণমূলের রাম দখলের উৎকণ্ঠা দেখে। প্রাথমিক ভাবে বিজেপি সফল। তাই নভেম্বরে তারা লালকৃষ্ণ আডবাণীর স্টাইলে রথ বার করার পরিকল্পনা করেছে। তাতে সরকার বাধা দিলেও লাভ বিজেপির, বাধা না দিলেও লাভ বিজেপির।

amit_body_072618054048.jpgপ্রচার সফরে অমিত শাহ

রাজ্যের সবকটি লোকসভা কেন্দ্রের জন্য আলাদা ভাবে ফেসবুক পেজ খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এর পাল্টা কর্মসূচি এখনও স্থির করে উঠতে পারেনি বিজেপি। এখন অবশ্য তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাতে এখনও সফল নয়। তবে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে তারা জনসংযোগ করছে ও নিজেদের আদর্শ লোকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। সেখানে সমমনস্ক লোকই বেশি। তাই এতে খুব একটা লাভ তাদের হচ্ছে না। তবে সমর্থক ধরে রাখছে। গণমাধ্যমে কী ভাবে উপস্থিত থাকা যায়, সেই পরিকল্পনাও তারা করছে। স্যোশাল মিডিয়ায় তাদের ব্যর্থতা নিয়ে দলের অন্দরে আলোচনা চলছে জোরদার।

আগামী অগস্ট মাস থেকে বিজেপি হঠাতে রাজ্য জুড়ে অভিযান শুরু করছে তৃণমূল। এখনও সর্বত্র বুথ স্তরে বিজেপি সংগঠন করে উঠতে পারেনি, তাই সর্বত্র যে তারা তৃণমূলকে টক্কর দিতে পারবে, তা নয়। তবে বিজেপি দিন পনেরো নিজের ক্ষমতাও দেখে নিতে পারবে। উৎসবের মরসুম শেষ হলে তারা পুরোপুরি ঝাঁপানোর পরিকল্পনা করেছে।

দলের নেতাদের দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে বুথস্তরের সভাপতিদের মোবাইল ফোন নম্বর চেয়ে নিয়েছে দিল্লি। সংগঠন সম্বন্ধে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার বন্ধ শুরু করে। বুথস্তরে দলকে মজবুত করতে তারা যোগাযোগ শুরু করে বিভিন্ন ক্লাব-সংগঠনের সঙ্গে। দেশে মোদী সরকার কী ভালো কাজ করছে তা প্রচারের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করে।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment