গোয়েবলসের মতো প্রচার: বিজেপির ক্ষমতা বাড়িয়েই দেখানো হচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যে
২০১৪-র পরে ব্যতিক্রম ছাড়া রাজ্যগুলিকে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি বিজেপি
- Total Shares
দেশের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে এখন ২০টিতেই ক্ষমতায় রয়েছে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি। ২০১৪ সালে দেশের মসনদে নরেন্দ্র মোদী আসীন হওয়ার পর থেকে বিজেপির বিজয়রথ কোনও ভাবেই থামছে না। একে একে ২০টি রাজ্যের শাসনভার বিজেপির হাতে যাওয়া অন্তত সেই ইঙ্গিতই করছে।
বাস্তবে অবশ্য অনেক রাজ্যেই বিজয়রথ থমকেছে, শুধু গোয়েবলসের মতো প্রচার করে মোদীকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাচ্ছে বিজেপি। বিভিন্ন রাজ্যের পরিসংখ্যান একটু ভেঙে দেখলে স্পষ্ট হয়ে যাবে এই প্রচারের মধ্যে কতটা দুধ ও কতটা জল আছে। নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতার আসার আগে থেকেই মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, বিহার, ঝাড়খণ্ড, গোয়া-সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিজেপি বা তার জোটসঙ্গীর সরকার ছিল। মাঝে বিহারে নীতীশকুমার জোট করলেও আবার তিনি এনডিএ-তে ফিরেছেন। সময়ের হিসাবের মধ্যে না গিয়ে যে কথাটি সহজে বলা যায়: অনেক রাজ্যে নামেই বিজেপি রয়েছে। যেমন মেঘালয়।
২০১৪ সালের মোদী-ঝড়ের পরে বিহারে ২০১৫ সালের ভোটে বিজেপির আসন ৯১ থেকে কমে ৫৩ হয়। নীতীশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেডের আসন ১১৫ থেকে কমে হয় ৭০। তারা অবশ্য মহাজোটের অংশ ছিল, যে জোটে লালুপ্রসাদ যাদবের আরজেডি এক লাফে ২২ থেকে ৮১ হয়ে যায়। জোটের সঙ্গী হিসাবে কংগ্রেস ৪ থেকে আসন বাড়িয়ে ২৭ করে ফেলে। পরে বড়শরিক লালুপ্রসাদকে ছেড়েও মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকার জন্য নীতীশ আবার বিজেপির হাত ধরেন। তাই এই রাজ্যকে গেরুয়া বলা হলেও আসলে বিজেপি তিন নম্বরে।
অনেক রাজ্যেই বিজয়রথ থমকেছে বিজেপির
৪০ আসনের গোয়ায় কংগ্রেস একাই পেয়েছিল ১৬টি আসন, বিজেপি ১৪টি। আগের ২০১২ সালের নির্বাচনে বিজেপি একাই পেয়েছিল ২১টি আসন, কংগ্রেস পেয়েছিল ৯টি। ২০১৭ সালের নির্বাচনের পরে বাকি সবকটি ছোট দলের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গড়ে বিজেপি। নেতৃত্বহীনতার জেরে সরকার গঠনের দাবিই করে উঠতে পারেনি কংগ্রেস। এক সময়ের সত্যিকারের দুই বিজেপি রাজ্যেই তাদের প্রতি সমর্থন অনেক ক্ষীণ হয়ে গিয়েছে। সুবিধাবাদী জোট গড়ে বিজেপি বসছে শাসকের আসনে।
জম্মু-কাশ্মীরেও বিজেপি রয়েছে মেহবুবা মুফতির পিডিপির সঙ্গে জোট বেঁধেই। ৮৯ আসনের মধ্যে পিডিপি ২৮ ও বিজেপি ১৫টি আসনে জিতেছিল। এথানে ভোটের ফল বার হওয়ার পরে যখন দেখা গেল কংগ্রেস ও ওমর আবদুল্লার ন্যাশনাল কনফারেন্স জোটের পরাজয় ঘটেছে, তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, ভোট পূর্ববর্তী জোট হিসাবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে ন্যাশনাল কনফারেন্স-কংগ্রেস জোট। যে হিসাবই কষা হোক, জম্মুর বাইরে এখানে বিজেপি নেই। এনসি একসময় এনডিএ জোটে ছিল। পরে এ রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধে।
২০১২ সালের নির্বাচনে ৬০ আসনের বিধানসভায় কংগ্রেস পেয়েছিল ৪২টি আসন। পরে মণিপুর স্টেট কংগ্রেসের ৫ জন বিধায়ক কংগ্রেসে যোগ দিলে কংগ্রেসের আসন হয় ৪৭। ২০১৭ সালের ভোটে কংগ্রেস নেমে আসে ২৮ আসনে, বিজেপি শূন্য থেকে লড়াই করে ২১টি আসন পায়। কংগ্রেসের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে তারা সরকার গড়ে ফেলে। এই রাজ্যে মোদী-ঝড়ে বিজেপি লাভ করতে পারলেও, রাজ্যটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসলে কংগ্রেসই।
মেঘালেয়েও ক্ষমতায় বিজেপি! ৬০ আসনের বিধানসভায় তাদের আসন ২টি, কংগ্রেসের ২১টি। এখানেও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মতো আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে জোট বেঁধে সরকারকে সমর্থন করেছে মাত্র। এই রাজ্যে বিজেপির অস্তিত্ব কতটুকু! সিকিম বিধানসভাতেও বিজেপির কোনও আসন নেই, সেই জোট এনডিএতে আছে। অবশ্য ত্রিপুরায় সাম্প্রতিক নির্বাচনে জয়, এ রাজ্যে তাদের ক্ষমতা নিয়ে কোনও প্রশ্নচিহ্ন রাখেনি।
হরিয়ানা। ৯০ আসনের বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ঠিক ২টি আসন বেশি পেয়েছিল বিজেপি, তাদের জোটসঙ্গী শিরোমণি অকালি দল জিতেছিল একটিমাত্র আসনে। উত্তরাখণ্ড অবশ্য কংগ্রেসের থেকে ছিনিয়ে নিতে পেরেছিল বিজেপি। ৭০ আসনের বিধানসভায় ২৬টি আসন বাড়িয়ে ২০১৭ সালে তারা জয়ী হয় ৫৭টি আসনে।
কর্নাটকে এখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিজেপিই, যদিও তারা এ রাজ্যে সরকারে নেই, খানিকটা ব্যতিক্রমী ভাবেই। শতকরা ভোট-প্রাপ্তির বিচারেও এগিয়ে কংগ্রেস। দিল্লি ও পঞ্চাবও বিজেপির গলার কাঁটা।
৪০৩ আসনের উত্তরপ্রদেশে ৪৭ আসন থেকে এক লাফে ৩২৫-এ পৌঁছে গিয়েছিল বিজেপি, তাও নোট বাতিলের ঠিক পরেই। তার পরে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় যোগী আদিত্যনাথ যে লোকসভা আসন ছেড়ে দেন, সেই গোরক্ষপুরে উপনর্বাচনে পরাজিত হয় বিজেপি। তারপরে একের পর আসনে উপনির্বাচনে বিজেপি পরাজিতই হচ্ছে।
বিজেপি ভালোভাবে ক্ষমতায় রয়েছে রাজস্থানে। ২০০ আসনের বিধানসভায় বিজেপির দখলে রয়েছে ১৬০টি আসন, জোটসঙ্গী এনপিপির দখলে ১টি। কংগ্রেসের আসন মাত্র ২৫। গুজরাটে যতই গেল গেল রব উঠুক, ১৮২ আসনের বিধানসভায় বিজেপির আসনসংখ্যা ৯৯, জোটসঙ্গী ধরে ১০০। শেষ বেলায় মোদীর ঝড়ো প্রচার বিজেপির পালে হাওয়া টেনে দেয়।
বিরোধীরা একজোট হলে ২০১৯ সালে আবার মোদীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া মুশকিল
২৩১ আসনের মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় বিজেপি একাই ১৬৬। এখানে মোদী-ঝড় নয়, বরং মুখ্যমন্ত্রী বিজয় সিং চহ্বানের উন্নয়নই অস্ত্র বিজেপির। আসন সংখ্যা থেকে চোখ ফেরালে অবশ্য স্বস্তিতে থাকবে না বিজেপি। এ রাজ্যে সার্বিক ভাবে ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বিজেপি। বিরোধী জোট হলে তাদের চিন্তার কারণ আছে বৈকি।
৯০ আসনের ছত্তিশগঢ়ে ২০১৩-র লোকসভা ভোটে গেল গেল রব ওঠার পরেও বিজেপি জেতে ৪৯টি আসনে, যা আগের বারের চেয়ে ১টি কম। ব্যাপর প্রচার করেও মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেননি অজিত যোগী। কিন্তু ভোটের শতাংশ হিসাবে এই রাজ্যেও বিজেপির থেকে খুব একটা পিছনে ছিল না কংগ্রেস। জোট হলে এখানেও চিন্তায় পড়বে বিজেপি। মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়াও কাজ করতে পারে, যাতে লোকসান বিজেপিরই।
৬০ আসনের অরুণাচলপ্রদেশে বিজেপির আসনসংখ্যা ৪৮, জোটসঙ্গী ধরলে তা ৫০। কংগ্রেস এখানে মাত্র ১। উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলির মধ্যে এই রাজ্যে বিজেপির অবস্থা ত্রিপুরার মতোই সুবিধাজনক।
আসন সমঝোতা না হওয়ায় শিবসেনার সঙ্গে জোট ভেঙে যায় বিজেপির
মহারাষ্ট্রে হিসাবটা একটু অন্যরকম। আসন সমঝোতা না হওয়ায় শিবসেনার সঙ্গে জোট ভেঙে যায় বিজেপির। একা লড়ে ২৮৮ আসনের বিধানসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে তারা ১২২টি আসন পায়। শিবসেনা পায় ৬৩টি আসন। অতিসম্প্রতি ভোটে একটি আসন বিজেপি ছিনিয়ে নিয়েছে শিবসেনার থেকে, আরেকটি আসন তারা খুইয়েছে এনসিপির কাছে। তবে সেই আসনে সিপিএমেরও পরে, পাঁচ নম্বরে নেমে গিয়েছে কংগ্রেস।
সংখ্যার বিচারে আর জোটসঙ্গীদের ধরে নিয়ে সারা দেশের মানচিত্র যে ভাবে গেরুয়া বলে বিজেপি প্রচার করছে, বাস্তবে ছবিটা তা নয়। মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, বিহার, অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশ, গোয়া এমনকি কর্নাটকে শক্ত মাটি ছিল বিজেপির। এখন বরং ভোট কমেছে, কারণ যাই হোক না কেন।
সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের যুগে বিজেপির প্রচারকৌশলের ধারেকাছে কেউ নেই, তাই সোশ্যাল মিডিয়ার চোখ দিয়ে পুরো দেশকে গেরুয়া দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, মোদীর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা কিন্তু ততটা নয়। তাই লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির উচিৎ, তাদের ক্ষমতা হিসাব কষে পা বাড়ানো। ইগোর লড়াইয়ে শিবসেনাকে হারাতে পারলেও, বিরোধীরা একজোট হলে ২০১৯ সালে আবার মোদীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া মুশকিল।

