ঐতিহ্যবাহী লালকেল্লার দায়িত্ব বেসরকারি হাতে, সুবিধা কার
সমালোচনা ও আক্রমণে মুখর রাজনীতিক থেকে ইতিহাসবিদ, অনেকেই
- Total Shares
ধরুণ লালকেল্লার নাম হল ডালমিয়া ভারত লালকেল্লা, মানে ম্যাকডাওয়েল মোহনবাগান বা কিংফিশার ইস্টবেঙ্গলের মতো। তাতে লাভ কার হবে? কেউ বলবেন ফুটবল ক্লাব আর লালকেল্লাকে এক আসনে বসানোটাই মূর্খামি, কেউ শেক্সপিয়ার আউড়ে বলবেন নামে কী বা যায় আসে, সৌধটা বাঁচুক।
যদি নামের কথা বলেন, তা হলে বলতে হয়, মোগল সম্রাট শাহজাহান ১৯৩৯ সালে যে দুর্গ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং ১৯৪৮ সালে সম্পূর্ণ হয়েছিল, সেই দুর্গটির নাম কিলা-ই-মুবারক। লাল বেলেপাথরে তৈরি বলে লোকমুখে তার নাম হয়ে যায় লালকেল্লা, ইংরেজিতে রেড ফোর্ট। এখানেই আদালত বসেছিল আজাদ হিন্দ ফৌজিদের বিচারের জন্য। আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে উড়েছিল তিরঙ্গা।
মধ্যরাতে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা ওড়ে লালকেল্লাকেই, উত্তোলন করেছিলেন জওহরলাল নেহরু
দু’পক্ষের কথা বলা হল, আর এক পক্ষ বলতে পারেন, মানে যেটা বলছেন, সরকার দেশের ঐতিহ্যটাই বেচে দিচ্ছে বেসরকারি সংস্থাকে, তাদের কি অভিজ্ঞতা আছে এই সৌধ রক্ষণাবেক্ষণের?
Why can’t the Government even take care of our historic Lal Qila ? Red Fort is a symbol of our nation. It is where India’s flag is hoisted on Independence Day. Why should it be leased out ? Sad and dark day in our history
— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) April 28, 2018
অন্য কারও কথা বাদ দিন, এ নিয়ে যখন সরব হয়েছেন উইলিয়াম ডালরিম্পলের মতো ব্যক্তি, তখন বিষয়টা নিয়ে একটু কাটাছেঁড়া করা উচিৎ। ডালরিম্পল যখন অন্য কোনও উপায়ের কথা বলছেন, তখন মিনহাজ মার্চেন্ট সেই উপায়টাও বলে দিয়েছেন, সরকার কী করতে পারত।
There must be better ways of maintaining a nation's greatest monuments than by auctioning them off to a corporate househttps://t.co/uO66Rr4Hu1
— William Dalrymple (@DalrympleWill) April 27, 2018
Instead of privatising heritage monuments like #RedFort, privatise PSUs & PSBs. Besides, giving corporate branding rights to Dalmia Bharat for Rs 5 crore/year is crass. Instead appoint contractor to maintain monument, no branding, just annual fee @dr_maheshsharma @alphonstourism
— Minhaz Merchant (@MinhazMerchant) April 28, 2018
একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক। কর্পোরেট সংস্থাগুলোকে তাদের লাভের একাংশ সামাজিক কাজে ব্যবহার করার কথা আগেই হয়েছে। কিন্তু সেখানে ঐতিহ্যবাহী ভবন রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে ছিল না। এই আইন পুরোপুরি চালু হওয়ার আগে ইউপিএ সরকারের পক্ষে কলকাতায় একটি বণিকসভায় তৎকালীন মন্ত্রী সচিন পাইলট বিষয়টি ভাবনা-চিন্তা করার কথা বলেছিলেন।
কর্পোরেট সংস্থাগুলি সামাজিক কাজে কী ভাবে অর্থব্যয় করবে তার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, কিন্তু সমস্যা হল, সংস্থাগুলি প্রচার চায়। তাই একমাত্র সরকারি কর্পোরেট সংস্থাই তাদের সামাজিক দায়িত্ব পালনে (সিএসআর) টাকা খরচ করে কোনও প্রচার ছাড়া, যেমন বামার লরির পক্ষ থেকে ইনসিনারেটর দেওয়া হয়েছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলকে। কোনও প্রচার নেই, কোথাও বিজ্ঞাপন নেই। তবে এই শর্তে বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থাগুলোর রাজি হওয়া মুশকিল। সোজা কথায়, তারা প্রচার চায়।
মোহনবাগানের মতো ঐতিহ্যসালী ক্লাবের নামের আগে যখন কিংফিশারের নাম যোগ হয়েছিল, তখন অনেকেই খুশি হননি, কিন্তু তাতে ক্লাবের একটা অর্থ সংস্থান হয়েছিল। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কয়েকটি সংস্থার চুক্তি হয়েছে। এর পোশাকি নাম “অ্যাডপ্ট এ হেরিটেজ: আপনি ধারোহার, আপনি প্যাহচান” অর্থাৎ, “ঐতিহ্য দত্তক নিন: আপনার ঐতিহ্যই আপনার পরিচয়।” এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে ছিল পর্যটন মন্ত্রক, সংস্কৃতি মন্ত্রক ও ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা এএসআই। মূলত পর্যটনের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্যই এই চুক্তি। বিশ্বমানের পরিষেবা দিতে এই চুক্তির মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারও। যে সব সংস্থা এই চুক্তি করেছে, তাদের মনুমেন্ট মিত্র বলা হবে এবং কোনও লাভের জন্য নয়, বছরে পাঁচ কোটি টাকা তারা খরচ করবে সামজিক দায়িত্বের অংশ হিসাবে। আর এ জন্য সংশ্লিষ্ট স্থানে তারা নিজেদের বিজ্ঞাপন কতটা দিতে পারবে, তারও একটা নির্দিষ্ট মাপকাঠি থাকবে। যদিও ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া ওয়েব সাইটে তাদের বিজ্ঞাপন থাকবে।
গঙ্গোত্রী থেকেই শুরু হয় গোমুখের যাত্রাপথ
এ ক্ষেত্রে মোট ৩১টি সংস্থাকে মনুমেন্ট মিত্র হওয়ার ক্ষেত্রে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ঐতিহ্যশালী ভবন ও পর্যটন কেন্দ্র মিলিয়ে এ জন্য ৯৫টির একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত এ ব্যাপারে চারটি সমঝোতাপত্র (মউ) সই হয়েছে। প্রথমটি হল লাদাখের মাউন্ট স্টক কাংড়ি। এ জন্য চুক্তি সই হয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রক, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (এটিওএআই) এবং জম্মু-কাশ্মীর সরকারের মধ্যে। জম্মু-কাশ্মীরের পর্যটন দপ্তর, এটিওএআই এবং উত্তরাখণ্ড সরকারের মধ্যে চুক্তি হয়েছে গোমুখ পর্যন্ত যাত্রাপথের জন্য, এটি রয়েছে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে দিল্লির লালকেল্লা ও অন্ধ্রপ্রদেশের গান্দিকোটা। এ জন্য চুক্তি হয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রক, কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক, এএসাই এবং ডালমিয়া ভারতের মধ্যে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক লালকেল্লা নিয়েই
লালকেল্লা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে শুধুমাত্র উন্নয়ন করার মর্মে। তা ছাড়া লালকেল্লার যে অংশে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার রয়েছে, ডালমিয়া ভারত শুধুমাত্র কাজ করতে পারবে সেই অংশটুকুতে। বাকি কোর এরিয়ায় তারা কাজ করতে পারবে না। শুধু সেটাই নয়, এই অংশটি প্রথমে এএসআই এবং পরে ইউনেস্কার ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকায় থাকায়, এখানে কোনও রকম পরিবর্তন করা চলে না, কোনও স্থায়ী নির্মাণ তো নয়ই, এমনকি অস্থায়ী কিছু করতে গেলেও নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হয়। কেউ চিড়িয়াখানার একটা বাঘ ‘অ্যাডপ্ট’ করা মানে যেমন বাঘের মালিকনা, তার গলায় শিকল পরিয়ে তাকে বাড়িতে বেঁধে রাখা নয়, এখানেও নিয়মটা তেমনই।
আরও তিনটি জায়গা নিয়ে হইচই না হলেও লালকেল্লা নিয়ে হইচই হচ্ছে, তা কি স্রেফ মোগল সম্রাট শাজাহানের তৈরি বলে? ঠিক তা নয়। লালকেল্লাতেই ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।

