দিলীপ ঘোষ ও মুকুল রায়ের দ্বন্দ্বের প্রভাব লোকসভা ভোটে কতটা পড়বে
একজন বিজেপিকে বোঝেন, আরেকজন বোঝেন সংগঠন ও ভোট মেশিনারি
- Total Shares
মাঠে যুদ্ধ হয় তৃণমূলের সঙ্গে তাতে খানিকটা প্রচার হয়, তবে ভোটে খুব একটা লাভ হয় না, কারণ ব্যালট বক্সে তাদের লড়াইটা হয় কংগ্রেস ও সিপিএমের সঙ্গে – দ্বিতীয় স্থানে থাকা নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অবস্থা এমনই। তবে এ বার অমিত শাহ এ রাজ্য থেকে লোকসভা ভোটে আসন চাইছেন। তবে চাইলেই পাওয়া যায় না।
বিজেপিতে আপাতত দু’জন কাণ্ডারী: একজন ঘরের লোক, তিনি দলের নীতি-আদর্শ জানেন। গরম গরম বক্তৃতা করতে পারেন – দিলীপ ঘোষ। এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির সভাপতি। বিধায়ক হলেও ভোট মেশিনারি কী সে ব্যাপারে তাঁর কোনও অভিজ্ঞতা নেই। ভোট করানো নিয়েও তাঁর কোনও অভিজ্ঞতা নেই। রাজনৈতিক ভাবে তিনি অভিজ্ঞ এ কথাও বলা যায় না। তিনি তাঁর মতো করে দল চালাচ্ছেন সভাপতি হিসাবে।
মুকুল রায় ও দিলীপ ঘোষ (ছবি: পিটিআই)
আরেকজন বাইরে থেকে আসা, তাঁর বহু অনুগামী আছেন। সকলেই যে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন এমন নয়, তার কারণ তাঁর অনুগামীদের নাকি বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে তৃণমূল কংগ্রেসে দীর্ঘদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সৈনিক ও ভোট মেশনারি তাঁর নখদর্পনে। মুকুল রায় এখন বিজেপির হয়ে এ রাজ্যে ভোটের দায়িত্বে।
এই দু’জনকেই দরকার বিজেপির। প্রথমজনকে দরকার দলের লাইনে দল পরিচালনা করার জন্য আর দ্বিতীয়জনকে দরকার ভোটে জেতার জন্য। তবে এই দুজনের কাউকে দেখেই ভোট দেবেন না ভোটাররা, যেমন তাঁরা ২০১১ সালের বিদানসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে দিয়েছিলেন বা ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীকে দেখে দিয়েছিলেন।
ভোটের দায়িত্বে থাকা মানে প্রার্থী বাছাই করবেন মুকুল রায়। সেই প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার দায়িত্বও তাঁর। বিজেপিতে যোগ দিয়েই এই দায়িত্ব তিনি পেয়েছিলেন, কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক সেই প্রার্থী শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। এখন বিজেপির প্রার্থী বাছাই নিয়ে একটি কমিটি তৈরি হয়েছে যার শীর্ষে মুকুল রায়। তিনি লোকসভা ভোটের কথা ভেবে প্রতিটি জেলা থেকে তিন জন করে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম চেয়েছেন। কারণ বিভিন্ন আসনে দ্বিতীয় স্থানে থাকতে রাজি নয় বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব, তাঁরা লোকসভায় আসন চান এ রাজ্য থেকে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে এ রাজ্য থেকে শূন্য হাতে ফিরলে তা যত ভোটই তারা পাক না কেন, ২০২১ সালে যে ভোটের রাজনীতিতে তারা কিছুই করতে পারবে না, সে কথা খুব ভালো করেই জানে বিজেপি।
২০১১ সালে এ রাজ্যের মানুষ ভোট দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেই (ছবি: পিটিআই)
২০১৪ সালের মতো মোদী হাওয়া এখন নেই। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের মেরুকরণ হলেও যে রাজ্যে ৩৩ শতাংশ মুসলমানের বাস, সেখানে ভালো ফল করতে হলে মুসলমানদের ভোটও দরকার। কারণ সব হিন্দু ভোট তো আর বিজেপি একা পাবে না। তাই কড়া হিন্দুত্ব পছন্দ নয় মুকুল রায়ের। যদিও দিলীপ ঘোষ চড়া হিন্দুত্বের লাইনেই থাকতে চাইছেন।
বিজেপি এখনও বাঙালির দল হয়ে উঠতে পারেনি, এ রাজ্যে বিজেপি ভোটব্যাঙ্ক মানেই অবাঙালি হিন্দু ভোট। তাই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি তুলে এ রাজ্যে সুবিধা হবে না বলে মুকুল রায় মনে করেন। কিন্তু দিলীপ রায় দলের লাইন থেকে সরতে রাজি নন। কারণ কালী-তারা-দুর্গার নামের সঙ্গে বাংলার মানুষ অনেক বেশি একাত্ম হলেও সেটা ঠিক শ্রীরাম ধ্বনির মতো কয়েনেজ পায়নি।
সদ্যসমাপ্ত পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপি দ্বিতীয় স্থানে। পরিসংখ্যানগত ভাবে এ কথা ঠিক। তবে বাস্তবে বিজেপি একাদশ স্থানে, প্রথম থেক দশম স্থান একা তৃণমূলেরই দখলে। এই অবস্থা থেকে লোকসভা ভোটে জেতা মুশকিল।
ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ভোটে সর্বনিম্ন স্তর অর্থাৎ গ্রামপঞ্চায়েতে বিজেপি ভালো ফল করলেও যত উপরের স্তরে ওঠা যায়, দেখা যায় ফল তত খারাপ করেছে তারা। এর কারণ হল নেতৃত্বের অভাব। স্থানীয় স্তরে বা পাড়াস্তরে জিতলেও জেলাস্তরে জিততে পারেনি বিজেপি। লোকসভা ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকলেও বুথে এজেন্ট দিতে হবে রাজনৈতিক দলকেই, মানে বিজেপিকে। তাই বুথস্তরে সংগঠন চাই। সেই সংগঠন যে বিজেপির নেই, মানে এখনও নেই, সে কথা মুকুল রায় জানেন। সেই সংগঠন না থাকলে ভোটে জেতা যাবে না।
২০১৪ সালের মতো মোদী হাওয়া আর এখন নেই (ছবি: পিটিআই)
আগামী মাসের গোড়ায় রাজ্যে রথ বেরবে, উদ্বোধন করবেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। লোকসভা ভোটের আগে গণতন্ত্ররক্ষাকে সামনে রেখে রথ নিয়ে রাজ্যে ২৯৪টি বিধানসভা আসনেই যাবে বিজেপি। যে কোনও ভাবে রথযাত্রা সফল করতে চাইছে বিজেপি। তা নিয়ে দিলীপ ঘোষ-সহ বিজেপি নেতানেত্রীদের গরম গরম বক্তৃতাও শোনা যাচ্ছে। পাল্টা বলছে তৃণমূলও। প্রচার হচ্ছে ভালোই। রথ চললে যত না লাভ রথ কেউ জোর করে থামালে, মারামারি করলে আরও বেশি লাভ। বিজেপিও চাইছে সঙ্ঘাত হোক। সঙ্ঘাত মানেই বাড়তি প্রচার।
তবে মুকুল রায় অবশ্য চুপ। কারণ তিনি জানেন, রথযাত্রা করে বিজেপি উন্মাদনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু তাতে ভোটে জেতা যায় না। জনসভায় লোক এনে ও উন্মাদনা তৈরি করে যদি ক্ষমতায় আসা যেত তা হলে ২০০১ সালেই রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রসের সরকার গড়ার কথা। গরম কথা বলে লোক জড়ো করা আর ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তৃণমূল কংগ্রেসে থাকার সময় তা তিনি হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন।
এখন নিয়মিত ভাবে এ রাজ্যে আসছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা। ত্রিপুরার জয়ে কিছুটা হলেও মুকুল রায়ের যে ভূমিকা ছিল সে কথা বিজেপি নেতারা বিলক্ষণ জানেন। এ রাজ্যে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরকারে আনার পিছনে কিছুটা হলেও কাজ করেছে মুকুল রায়ের সাংগঠনিক দক্ষতা, যদিও লোকে সে বার উজাড় করে ভোট দিয়েছিল মমতাকে, নামেই তা ছিল কংগ্রেস-তৃণমূল জোট।
দল তাঁর কাছে ঠিক কী চায় সে কথা জানেন মুকুল রায় (ছবি: পিটিআই)
২০১৩ সালে রাজ্যে পঞ্চায়েত ভোটে যে সব কেন্দ্রে তৃণমূল হেরেছিল, সেই সব কেন্দ্রের জয়ী প্রার্থীদের তৃণমূল যোগ দিইয়ে বহু জায়গায় বোর্ড দখল করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস – মুকুল রায়ের নেতৃত্বে। এখন বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব চাইছে লোকসভা ভোটে বেশ কয়েকটা আসনে (বিজেপি সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ চান অন্তত ৫০ শতাংশ আসনে) জয়। আর সেই কাজের উপযুক্ত লোক যে মুকুল রায় সে কথা বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জানে। তাই দিলীপ ঘোষ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে এড়িয়েই যান মুকুল রায়।
বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন চাইছে মুকুল রায় ও দিলীপ ঘোষের মধ্যে সমতা রেখে চলতে।
মুকুল রায় ইতিমধ্যেই বিধানসভা কেন্দ্র ধরে ভোটারের ধরন হিসাব করে ফেলেছেন – কোথায় কত ভোটার, তাঁদের কতজন আদিবাসী, কতজন তথাকথিত নীচু জাত, কোথায় কত মুসলমান ভোটার এই সব তথ্য সর্বক্ষণ তাঁর সঙ্গে থাকে। সেই তালিকার কথা তিনি ডেইলিও বাংলায় একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেওছিলেন। ভোটের রণনীতি স্থির করার জন্যই এই তালিকা তিনি তৈরি করেছেন।
আন্দোলনে দিলীপ ঘোষ (ফাইল ছবি: পিটিআই)
দীর্ঘদিন সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা ও রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক প্রধান হওয়ার দরুণ মুকুল রায়ের অনুগামীর সংখ্যাও যথেষ্ট। কিন্তু মুকুলের এই অনুগামীবেষ্টিত হয়ে থাকা, দলীয় কার্যালয়ের বদলে অন্যত্র অফিস পরিচালনা করা, নিজের মতো করে সব কাজ একান্তে করে যাওয়া প্রভৃতি দিলীপ ঘোষের একেবারেই পছন্দ নয়। সে নিয়ে তাঁর কিছু কিছু মন্তব্য সংবাদপত্রে প্রকাশিতও হয়েছে।
মুকুল রায় অবশ্য এ সবে একেবারে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনি তাঁর মতো করেই কাজ করে যাচ্ছেন। বিজেপির সংস্কৃতি ও নীতি জেনে গরম বক্তৃতা করা নয়, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁর কাছে কী চায় সে কথা জানেন মুকুল – যথাসম্ভব আসনে ভালো ফল করা ও ভোটের হার বাড়ানো নয়, আসন বাড়ানোই তাঁর লক্ষ্য।
এ রাজ্যে ভোটে বিজেপি কতটা ভালো ফল করতে পারবে তা নির্ভর করছে মুকুল রায় দলীয় সংগঠন কতটা সাজাতে পারলেন এবং তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাজে লাগিয়ে বিক্ষুব্ধদের ভোট কতটা নিজেদের প্রার্থীর দিকে টানতে পারলেন তার উপরে। দিলীর ঘোষ গণমাধ্যমে মুকুল রায়ের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করলে তার প্রভাব ভোটে না পড়ার সম্ভাবনাই ষোলোআনা।
এ রাজ্যে লোকে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে আর বিজেপিকে ভোট দেয় মূলত প্রতীক দেখে।

