আগ্রাসী চিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোন পথে
ভারত মহাসাগরে কেন প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে চিন
- Total Shares
জাতিসঙ্ঘে এক বক্তৃতায় চিনের প্রভাবশালী নেতা ডিং জিয়াও পিং বলেছিলেন, “চিন কখনও বিশ্বের সুপার পাওয়ার হতে চায় না, যদি কখনও হতে চায় তা হলে ভাবতে হবে চিন তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়েছে। তখন চিনের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে পুরো বিশ্ব যেন চিনকে রুখে দেয়।”
তাঁর এই বক্তব্যই প্রমাণ করে তখন চিনের নীতি ছিল অন্তর্মুখী। কিন্তু সময়ের পথ পরিক্রমায় চিন আজ দুনিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ। নেহরুর ‘পাঞ্চশীল’ পরিকল্পনা অনুযায়ী রাষ্ট্রসঙ্ঘ থেকে ভারত ভেটোর ক্ষমতা পেয়েও ফিরিয়ে দেয় কিন্তু ওই সুযোগে চিন এশিয়া থেকে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতার অধিকারী হয়। ভারত ও চিনের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ছিল; বিশেষত বৌদ্ধধর্মের কারণে। ১৯৬২ সালে তিব্বতের স্বাধীনতা, দলাই লামার ভারতে আশ্রয় ঘিরে দু’দেশের সেই সম্পর্ক চূড়ান্ত তিক্ততায় পৌঁছয়। পরবর্তীতে আকসাই নিয়ে দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ পরবর্তীকাল থেকে বিভিন্ন বিষয়ে চিনের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে ভারতের। সাম্প্রতিক সময়ে দু’দেশের সম্পর্ক আপাত ভাবে স্থিতিশীল মনে হলেও ভারতের পক্ষে চাপের।
চিনের রাষ্ট্রপতি জাই জিনপিংয়ের সঙ্গে কথা মোদীর (ফাইল চিত্র)
ভারত-চিন সমস্যা
সীমান্ত সমস্যা
ভারত চিন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা সীমান্ত। চিন ব্রিটিশদের ভাগ করা ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ ও ‘জনসন লাইন’কে মানতে নারাজ, চিনের দাবি ‘ম্যাক ডোনাল্ড লাইন’ অনুযায়ী সীমান্ত। কারণ চিন জিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে তিব্বতের সরাসরি যোগাযোগ চায়। কিন্তু বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলো চিনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। ভারত চিনের দাবি অস্বীকার করে। তবে ১৯৯৩ সালে দু’দেশের মধ্যে সীমান্ত বিষয়ে শান্তি চুক্তি হয়। চুক্তির শর্ত অনুসারে দুই দেশ সীমান্তে অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে না।
জল নিয়ে বিরোধ
ব্রহ্মপুত্র নদের জল নিয়েও চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে। ভারতকে প্রতি বছর ৮২ লাখ টাকা দিতে হয় চিনকে ব্রহ্মপুত্রের জলের জন্য। চিনের জলের উৎস তিব্বত। এখান থেকেই অধিকাংশ নদীর উৎপত্তি। চিনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল চিনের জলের উৎস তিব্বতে অর্থাৎ পশ্চিমাঞ্চলে আর চিনের কৃষি কাজের জন্য জল প্রয়োজন দক্ষিণ ও উত্তর অঞ্চলে। ফলে নদীর ধারাকে পরিবর্তন করে জল প্রবাহিত করতে হয়। ব্রহ্মপুত্রের জল নিয়ে বিভিন্ন যেমন বিরোধ সৃষ্টি হয় পাশাপাশি দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নেও নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্রহ্মপুত্রের জল ভারত হয়ে বাংলাদেশেও প্রবাহিত হয়। ভারত চেষ্টা করে প্রভাবিত দেশগুলোকে নিয়ে চিনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে।
অসামঞ্জস্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক
ভারতের বাজার শাসন করে চিনের পণ্য। ২০০০ সালে চিন ভারতে ৩০০ কোটি ডলার রপ্তানি করত, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭০০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে ভারত চিনে রপ্তানি করে মাত্র ১০০০ কোটি ডলার। এই বাণিজ্যিক বৈষম্য যথেষ্ট সমস্যার, কিন্তু ভারত চাইলেই তা বন্ধ করতে পারবে না।
ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড প্রকল্প
চিনের প্রস্তাবিত ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্প ভারত শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছে। ভারতের বক্তব্য, চিন প্রভাব বিস্তারের জন্য এই প্রকল্প নিয়েছে। ভারত সার্বভৌমত্বের কথা বলে প্রকল্পের বিরোধিতা করে থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে। বিভিন্ন সময় চিন ভারতকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ভারতের অভিযোগ চিন স্ট্রিং অফ পিয়ার্সের (মোতি মালা প্রজেক্ট) মাধ্যমে ভারতকে এক ঘরে করার ব্যবস্থা করছে। উল্লেখ্য, চিন ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন বন্দর ভাড়া ও দখল নিয়ে ভারতকে চাপ সৃষ্টি করছে। ভারত যদি এই প্রকল্পে অংশ না নেয় তাহলে অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিষয়টিকে মোকাবিলা করা।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
প্রশ্ন হচ্ছে ভারতের পক্ষে চাপের কারণ কী? চিন দুনিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনৈতিক দেশ। স্বাভাবিক ভাবেই সে চাইছে পুরো বিশ্বে তাদের প্রভাব বাড়তে। এর জন্য প্রথমে প্রয়োজন আঞ্চলিক আধিপত্য। এই আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়েই ভারতের সঙ্গে চিনের বিরোধ। দীর্ঘ দিন ধরে অন্তর্মুখী পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করার ফলে চিন কোনও দেশের উপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করত না। অন্যদিকে ভারত স্বাভাবিক ভাবেই আঞ্চলিক প্রভাব উপভোগ করত। কিন্তু যখন থেকে চিন আধিপত্য করতে চাইছে, দু’দেশের বিরোধ বেড়েছে। লক্ষ্যনীয় একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনও দেশের দেশগুলোর উপর ভারতের সে ভাবে প্রভাব নেই।
ভারতের সঙ্গে রেষারেষি চলছে চিনের (ইন্ডিয়া টুডে গ্রাফিক্স)
পাকিস্তানের সঙ্গে চিন ওপেক ইকোনমিক করিডোর তৈরি করেছে। সম্প্রতি পাকিস্তান, চিনা ভাষাকে তাদের অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মালদ্বীপেও চিনের আধিপত্য রয়েছে। নেপালের পুলিশ একাডেমি তৈরির জন্য চিন ৩৫ কোটি ডলার দিয়েছে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে চিনের দীর্ঘকালের সম্পর্ক, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চিন মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়েছে। একই ভাবে আফগানিস্তানের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক দিন দিন ইতিবাচক হচ্ছে। স্পষ্টতই চিন, ভারতকে চাপে রেখেছে।
ভারত চিনের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে আমেরিকা-সহ দক্ষিন চিন সাগর নিয়ে যে সব দেশের বিরোধ রয়েছে তাদের এক ছাতার তলায় আনার চেষ্টা করছে। তবে ভারত এই মুহূর্তে পাকিস্তানের চেয়ে চিন নিয়েই বেশি চিন্তিত।
সম্প্রতি চিন সি চিন পিংয়ের ক্ষমতাকে দীর্ঘ মেয়াদী করেছে। ভারতকে চাপে রাখতে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার সমুদ্রবন্দরে কর্তৃত্ব বাড়িয়েছে। ফলে ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভার হুমকির মুখে। যেহেতু চিন দুনিয়া শাসন করতে চাইছে তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন খুবই প্রয়োজন। ভারতও একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দেশ। ভারতের জন্যও এটি ভাল তো নয়ই বরং চিনের মত শক্তিশালী দেশের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক তাদের অর্থনীতির জন্যও চাপের।
এই পরিস্থিতিতে ভারত বা চিন কখনোই যুদ্ধে জড়াবে না। আবার দুই দেশই চাচ্ছে আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে। এই মুহূর্তে তারা চাচ্ছে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের মাধ্যমে পরস্পরের স্বার্থ রক্ষা করতে। মোদীর সম্প্রতি সফরই দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা বহন করে। একই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, ভারত এবং চিন ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সেহেতু তাদের মধ্যে বিরোধ ব্রিকসের ভবিষ্যতের জন্যও ক্ষতিকর।
সম্পর্ক কোন পথে
সাম্প্রতিককালে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে হালকা মেজাজের ছ’টি বৈঠক হয়েছে। কূটনীতির ভাষায় এ ধরনের বৈঠক তেমন গুরুত্ব বহন করে না। বৈঠক শেষে কোনও যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি। তবে তারা ডোকলাম উপত্যকাকে কেন্দ্র করে যে পারস্পরিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, তা ভুলে গিয়ে ‘ভালো সম্পর্ক’ গড়ে তোলার উপরে জোর দেন।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠকের পর প্রকাশিত বিবৃতিতে বলেছে, দু’জনেই চিন-ভারত সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ধরে রাখার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেন, পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন ও সীমান্তে উত্তেজনা নিরসনের জন্য আরও কার্যকর কৌশল অবলম্বনের উপর জোর দেন। তবে চিনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকতা ও উষ্ণতা কোনওটাই ছিল না। তাদের ভাষায় দুই নেতার সাক্ষাতের পর্বটি ছিল অনাড়ম্বর আড্ডা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের। বলাই বাহুল্য এই সময়ে চিনের মতো সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে বৈঠক করে নরেন্দ্র মোদী তার সরকারের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট, আঞ্চলিক প্রাধান্য হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক দ্বিধা কাটিয়ে উঠে ব্যক্তি ও শাসকদলের ইমেজ বাড়ানোর চেষ্টাই করেছেন। অন্যদিকে শি জিন পিংয়ের গদি এতটাই মজবুত যে তিনি যে কোনও চ্যালেঞ্জ নিতে সক্ষম। সেই কারণে মোদি সরকার যখন বৈঠকের প্রস্তাব করেছে তখন চিন দায়সারা গোছের সাড়া দিয়েছে।
চিনে অভিবাদন গ্রহণ করছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী (ফাইল চিত্র)
মোটকথা চিনের দাপটে ভারত এক রকম কোণঠাসা। চিন শ্রীলঙ্কায় একটি বন্দর ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে। চিনের নৈকট্য ঠেকাতে শ্রীলঙ্কায় সরকার বদলে ভারত সহায়তা করলেও চিনকে দূরে রাখা যায়নি। মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মেটাতেও পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেছিল ভারত, অবশ্য চিনের হুমকিতে তা থেমে গেছে।
বছর দশেক আগে মালদ্বীপ সরকারের অনুরোধে ভারত সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বাচ্ছন্দ্যকর প্রভাব বলয় এখন আর নেই। মহাসাগরে ভারতীয় আধিপত্যে চিনের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছে। আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা ভালো অবস্থানে থাকলেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে ভারত। পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তান নিয়ে টেক্কা দিতে গিয়েও ভারতীয় প্রভাব কমেছে। আমেরিকা তালিবদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে শত্রুতা তো আছেই, কাশ্মীর নিয়েও চাপে আছে ভারত।
মিয়ানমারের সঙ্গে চিন ও ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সেখানেও চিন ও ভারতের প্রতিযোগিতা রয়েছে। কিন্তু চিন এগিয়ে আছে অনেক। বিশ্ববাণিজ্যের জন্য মিয়ানমারের দরজা খোলার আগেও চিনের সহায়তায় চলছিল মিয়ানমার। এখনও আমদানি-রপ্তানি ও সামরিক সহায়তার জন্য তারা চিনের উপর নির্ভরশীল।
আমেরিকা চিনকে চাপে রাখতে ভারতকে বেছে নিয়েছে। পাশ্চাত্যের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য এখন ভারতের দরজা। যৌথ সামরিক মহড়া প্রদর্শন থেকে সমরাস্ত্র ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করছে পাশ্চাত্য। মুসলিম দেশগুলোর বৈরিতা টপকে ইসরাইলকে ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত করেছে ভারত। যে-রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল কৌশলগত বন্ধুত্বের, এখন তা ঠান্ডাস্তরে অবস্থান করছে।
যে পাকিস্তান চিরকাল মার্কিনদের মিত্র ছিল এখন তারা একরকম কৌশলগত শত্রু। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করেছে। এ রকম আন্তর্জাতিক সমীকরণে চিন-ভারত মৈত্রী অযাচিত এবং অপ্রত্যাশিত। তা ছাড়া চিনের সঙ্গে ভারতের প্রাধান্যের প্রতিযোগিতা। এশিয়ার কর্তৃত্ব নিয়ে স্বাভাবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে তাদের।
পৃথিবীর এক বিপুল ২৫০ কোটি মানুষের আবাসস্থল এই দুটি দেশ। আয়তনেও এশিয়ার প্রায় অর্ধেক জুড়ে রয়েছে তারা। আমেরিকা যেমন ভারতের সঙ্গে সমীকরণ করছে, তেমনি চিন রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলছে। অন্যদিকে পাকিস্তান হয়ে উঠেছে চিনের বিশ্বস্ত মিত্র। এই যখন পরিস্থিতি তখন চিন-ভারত শীর্ষ বৈঠক দেখতে-শুনতে উপভোগ্য হলেও কার্যত কোনও লাভের নয়।
নেপাল-চিন আরও কাছাকাছি
কিছুদিনের মধ্যেই নেপালকে চিন নিজেদের চারটি বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেবে। তারপরই হিমালয়ের এই দেশটিতে ভারতের একচেটিয়া বাণিজ্য শেষ হয়ে চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার হবে। ফলে নেপালেও ভারতের একক আধিপত্য চাপে পড়তে চলেছে। ভারত ও চিনের মধ্যবর্তী এই দেশটি জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্যও নেপালকে ভারতের বন্দর ব্যবহার করতে হয়।
ভারতের ওপর নির্ভরতা কমাতে কাঠমাণ্ডু চিনের বন্দর ব্যবহারের জন্য সুযোগ চেয়ে আসছিল। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে সীমান্ত সমস্যার কারণে বেশ কয়েক মাস ধরে নেপালে জ্বালানি ও ওষুধের সমস্যা তৈরি হয়েছিল। এরপরই নেপাল ভারতের বিকল্প খুঁজতে থাকে। কয়েকদিন আগেই কাঠমান্ডুতে এক বৈঠকে নেপাল ও চিনের মধ্যে ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। চিনের তাইঝিন, শেনঝেন, লিয়ানয়ুগাং ও ঝানঝিয়াং বন্দর ব্যবহার করতে পারবে নেপাল। এ ছাড়া চিন নেপালকে তাদের লানঝো, লাহাসা ও সিগতসে স্থলবন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন সুসম্পর্ক রেখে চলা ভারত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে চলেছে।
ভারত মহাসাগর ঘিরে চিন ও ভারতের ভূ-রাজনীতি
দুই দেশেরই অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভরশীল ভারত মহাসাগরের উপরে, তাই এই মহাসাগরীয় অঞ্চলে দুই দেশের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক তৎপরতা দিনে দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারত মহাসাগর পৃথিবীর মোট সমুদ্রের প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ জায়গা জুড়ে এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতির দুনিয়ায়। এর হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালী দিয়ে সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় পঞ্চাশ ভাগের বেশি তেল যায় আসে। প্রতিদিন এর পরিমাণ প্রায় ৩২.২ মিলিয়ন অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম। পৃথিবীর প্রায় ৪০ ভাগ অফশোর পেট্রোলিয়াম তৈরি হয় ভারত মহাসাগরে। এই সমুদ্র পথেই তারা আমদানি রফতানির বড় কাজটি করে থাকে। ভারতের ব্যবহৃত প্রায় আশি ভাগ তেল-গ্যাস মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এই পথ দিয়েই। আর চিনের ব্যবহৃত প্রায় ৮৪ ভাগ তেল-গ্যাস আসে এই মহাসাগরের মালাক্কা প্রণালী দিয়ে। চিন ও ভারত উভয়েরই অর্থনৈতিক উন্নতি বজায় রাখার জন্য এই ভারত মহাসাগর নিরাপদ রাখা জরুরি, এর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি।
মিয়ানমারের সু চির সঙ্গে চিনের লি কেকিয়াং (ফাইল চিত্র)
ভারত মহাসাগর নিয়ন্ত্রণের জন্য চিন ভারত মহাসাগর সংলগ্ন দেশগুলিতে নৌবন্দর, রেলপথ, রাস্তা, পাইপলাইন নির্মাণ ইত্যাদি প্রকল্প নিয়ে এসেছে। এই যোগাযোগ পথগুলি চিনের সাঙ্গে ইউরেশিয়া, আফ্রিকা এবং ভারত মহাসাগরকে আরও সংযুক্ত করবে। তাই চিন চায় বাণিজ্য পথগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও তাদের উপর নিজেদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। চিনের ওই প্রকল্পগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় হল ৪৬০০ কোটি ডলারের চিন-পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোর। এই করিডোর চিনের সঙ্গে আরব সাগর এবং পূর্ব পারস্য উপসাগরের সংযোগ ঘটাবে। করিডোরের একটি অংশ ভারত-পাকিস্তান বিরোধপূর্ণ গিলগিট-বালটিস্থানের ভেতর দিয়ে যাবে বলে এতে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে ভারত। আপত্তি আছে জাপানেরও।
শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, পাকিস্তান এবং পূর্ব আফ্রিকান উপকূলে চিনের সহায়তায় সমুদ্রবন্দর নির্মিত হয়েছে এবং হচ্ছে। বাংলাদেশে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মানে চিন সহায়তা করতে আগ্রহী, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই গভীর সমুদ্র বন্দরের প্রয়োজনীয়তা অসীম। সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সহায়তার দৌলতে সুসম্পর্ক তৈরি এবং সম্ভাব্য নৌবহর নির্মানের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, সোমালিয়া, মালদ্বীপ, পূর্ব আফ্রিকা, কম্বোডিয়া ইত্যাদি জায়গার সমুদ্রের সঙ্গে সংযোগ বাড়িয়ে কৌশলগত ভাবে চিন ভারতকে ঘিরে ফেলছে। এ ছাড়া, চিনের নিউক্লিয়ার সাবমেরিন ও যুদ্ধ জাহাজকে শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানের বন্দরে আশ্রয় নিতে দেখা যাচ্ছে, এ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে ভারতের। আগামী দিনগুলিতে ভারত মহাসাগরে এই ভূ-রাজনৈতিক খেলা আরো জোরদার হবে; এতে চাপ বাড়বে ভারতের।

