কলাইনারের চিত্রনাট্য থেকে তামিল ছবিতে দ্রাবিড় আন্দোলন মূর্ত হয়ে উঠেছিল
শুধু ছেলের বা পরিবারের নয়, করুণানিধির মৃত্যুতে ক্ষতি হল বিজেপি বিরোধী জোটপন্থীদেরও
- Total Shares
বিজেপি বিরোধী মহাগাটবন্ধনের মহলা চলার মাঝেই মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন জোট রাজনীতির মহানায়ক। ১৯৬৯ সালে তামিলনাড়ুর ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম কান্ডারি হয়ে ওঠেন করুণানিধি। ওই সময়ে কংগ্রেসে বিক্ষুব্ধ নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী সমর্থিত রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ভিভি গিরিকে জেতানোর জন্য ইন্দিরার পাশে দাঁড়ান তিনি। কংগ্রেস দু-টুকরো হওয়ার পরেও ইন্দিরা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেন করুণানিধি। সেই সময় থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমশ বর্ণময় চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন এই তামিল নেতা।
জলের মধ্যে মাছ যেমন সাবলীলভাবে ঘোরাফেরা করে সেইভাবেই ১৯৯৬ সালে কেন্দ্রে যুক্তফ্রন্ট, ১৯৯৯ সালে এনডিএ সরকার এবং ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকারে শরিক হয়েছিল করণানিধির নেতৃত্বাধীন ডিএমকে। জরুরি অবস্থার সময়ে ইন্দিরা গান্ধী করুণানিধি সরকারকে ফেলে দেওয়ার পরের বছরেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন তিনি।
তাঁর মৃত্যুতে ছেলে ও পরিবার ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্থ হলেন বিজেপি বিরোধী জোটপন্থীরাও [ছবি: পিটিআই]
অন্যদিকে, ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী, উত্তর ভারতীয় উচ্চবর্ণের রাজনীতি ও হিন্দি বিরোধী আন্দোলনের স্তম্ভ হলেও বিজেপি পরিচালিত এনডিএ জোটে অনায়াসে শরিক হয়েছিল করুণানিধি। তাই তাঁর মৃত্যুতে ছেলে এমকে স্ট্যালিন ও পরিবারের যেমন ক্ষতি হল, তেমনই ক্ষতি হল বিজেপি বিরোধী জোটপন্থীদেরও।
মাস্টার অফ অ্যালাইয়ান্সের মূল্যবান পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হলেন বিজেপি বিরোধী জোটের নেতারা। বিজেপি বিরোধী জোটের নান্দীমুখ পাঠ যখন চলছে তখনই চলে গেলেন জোট রাজনীতির মহা পুরোহিত।
দ্রাবিড় আন্দোলনে স্টলওয়ার্ট আন্নাদুরাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর শূন্য স্থান পূরণ করেছিলেন করুণানিধি। পেরিয়ারের সময় থেকে শুরু হওয়া দ্রাবিড় জাত্যাভিমানী আন্দোলনের শেষ স্তম্ভ ছিলেন তিনি। তবে রাজনীতির বাইরে সংস্কৃতির জগতে তাঁর বিশাল অবদানের জন্য তামিলনাড়ুতে কলাইনার নামে আমজনতার কাছে পরিচিত ছিলেন করুণানিধি।
তামিল ভাষায় কলাইনার নামের অর্থ লেখক। সিনেমা ও সাহিত্যে দ্রাবিড় আন্দোলনের ভাষা ফুটিয়ে তুলে ছিলেন কলাইনার। ভারতবর্ষে রাজনৈতিক সিনেমার ইতিহাসে করুণানিধির নাম খোদাই করা থাকবে। তাঁর লেখা 'পরাশকথি' সিনেমার চিত্রনাট্য থেকেই তামিল সিনেমা এক গুরুত্বপূর্ণ দিকে মোর নেয়। এই সিনেমা থেকেই তামিল ছবিতে দ্রাবিড় আন্দোলন মূর্ত হয়ে ওঠে। যে কারণে এই ছবি সেন্সরশিপের কোপে পড়েছিল। এ ছবির বিরুদ্ধে কট্টর হিন্দুরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
করুণানিধির লেখা চিত্রনাট্যের মধ্যে দিয়েই তামিল সিনেমায় বিধবা বিবাহ, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও জমিদারি উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতাবাদের মতো সামাজিক বিষয়গুলো উঠে আসে।
Famous dialogue in parasakthi film dialogue written by #Karunanidhi pic.twitter.com/RYdR2VB1E4
— Habeeb Muhammed (@habeebmd92) July 28, 2018
তবে শুধু সিনেমার চিত্রনাট্যই লেখায় নয়, গল্প উপন্যাস কবিতাও সমান দক্ষতার সঙ্গে লিখেছেন করুণানিধি। প্রায় ১০০টিরও বেশি বই রয়েছেন কলাইনারের। ম্যাক্সিম গোর্কির 'মাদার' ও তামিল ভাষায় কবিতার ছন্দে অনুবাদ করেছিলেন তিনি। এই কারণে রাশিয়ান সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড কালচারের পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।
করুণানিধির আত্মজীবনী দ্রাবিড় আন্দোলন নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁদের কাছে আকর গ্রন্থ হিসেবেই পরিচিত। এর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি নাটকও লিখেছেন করুণানিধি। তাই বলা যায় ভারতবর্ষের রাজনীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের শেষ প্রতিনিধি বিদায় নিলেন।

