রাজনীতি নিপাত যাক, অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করণের কাজ হোক শুধুমাত্র নিরাপত্তার স্বার্থে

পৃথিবী জুড়ে শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করণের মধ্যে রাজনীতি মাথাচাড়া দিচ্ছে

 |  3-minute read |   01-08-2018
  • Total Shares

অসমে এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। তিন দশমিক তিন কোটি আবেদনকারীর মধ্যে দু'দশমিক নয় কোটি মানুষের নাম সেই তালিকায় রয়েছে। বাদ গিয়েছেন ৪০ লক্ষ মানুষ। ১৯৫১ সালের পর এই প্রথম এনআরসি পুনঃমূল্যায়নকরা হল। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ যাওয়া পক্ষে বিপক্ষে চাপানউতোর শুরু হয়েছে, উঠছে অসংখ্য প্রশ্ন।

১৯৪৫ সালে রাজীব গান্ধীর জমানায় কেন্দ্র, অসমের রাজ্যসরকার ও অসমীয়া ছাত্র সংগঠন (আসু) কে নিয়ে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল তা অসম অ্যাকর্ড হিসেবেই পরিচিত। সেই চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের আগে থেকে যাঁরা অসমে বসবাস করছেন তাঁরা এনআরসি তালিকায় নথিভুক্ত হওয়া যোগ্য। ১৯৭৯ সাল থেকে অসমে যে ধ্বংসাত্মক বাংলাদেশী তাড়াও আন্দোলন শুরু হয়েছিল তারই পরিণতি এই অসম অ্যাকর্ড। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন বা আসু। সেই সময় ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল অসমের গোয়ালপাড়া, কামরূপ, দারান, লক্ষিনপুর, ডিব্রুগড়, নওগাঁও, শিবসাগৰ এবং কার্বি আংলঙে। সেই উত্তাল আন্দোলনের পিঠে চড়ে ক্ষমতায় সওয়ার হয়েছিলেন প্রফুল মহান্ত।

body1_080118034441.jpgভারতে উইক ডকুমেন্টেশন কালচার রয়েছে

এই আন্দোলন থেকে যে রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছিল তার নাম অসম গণপরিষদ। এই আন্দোলনকে কাজে লাগিয়েই বিপুল ভোটে জয়ী হয় অসম গণপরিষদ। মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল মহন্ত। সেই সময় নওগাঁও জেলার নেলিতে ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষে সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সংঘটিত গণহত্যা হয়েছিল। অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছিলেন, ঘর বাড়ি হারিয়েছিলেন বহু মানুষ। ফলে, দেখা যাচ্ছে অসমে বিদেশী বা অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করণের পিছনে যে হিংসার বাতাবরণ রয়েছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

দেশের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার পিছনে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্ন যে জড়িয়ে রয়েছে তা নিয়েও কোনও সন্দেহ নেই। এই লক্ষ্যে কোনও রাজ্য সরকার অথবা কেন্দ্র যদি কোনও পদক্ষেপ করে তা হলে কোনও নাগরিকেরই তার বিরুদ্ধাচরণ করা উচিৎ নয়। কিন্তু পৃথিবী জুড়েই দেখা যাচ্ছে শরণার্থী এবং অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করণের মধ্যে রাজনীতি মাথা চারা দিচ্ছে।

যে ৪০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে তাদের মধ্যে থেকে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে বাংলাভাষীদেরই বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হয়েছে। এনআরসিতে নথিভুক্ত হওয়ার জন্য যে ৪০-৫০ বছরের লিগ্যাসি ডকুমেন্ট চাওয়া হচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ অনেকেই মনে করছেন ভারতবর্ষের মতো 'উইক ডকুমেন্টেশন কালচার' যে দেশে রয়েছে সেখানে ওই সব নথি দিতে না পারার কারণে অনেক বৈধ বসবাসকারীর নাম বাদ যাবে না তো? ভারতের প্রায় প্রতিটি প্রদেশেই প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের মানুষজনের নথি সম্পর্কে ধারণা খুব কম। ফলে, তাঁদের কাছে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট যে প্রয়োজনীয় নথি তা মনে না হতেই পারে। পাশাপাশি ওই সমস্ত এলাকায় সন্তানের জন্মের শংসাপত্রও তাদের কাছে থাকা দুষ্কর। এর ফলে, জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।

body_080118034534.jpgঅভিযোগ উঠতে শুরু করেছে বাংলাভাষীদেরই বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হয়েছে

একদিকে যখন এনআরসির মাধ্যমে ১৯৭১ সালের পর যাঁরা অসমে বসবাস করছেন তাঁদের বিদেশী বলে চিহ্নিত করার কাজ চলছে, অন্য দিকে তখন কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করতে চাইছে। এই সংশোধনীতে বলা হয়েছে আফগানিস্তান,পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে যে সমস্ত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসী এবং খ্রিস্ট ধর্মালম্বী মানুষ যারা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসে অন্তত ছ'বছর ধরে বাস করছেন তাঁদের বৈধ নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।

এই সংশোধনীকে অনেকেই আসাম চুক্তির বিপরীত এবং এনআরসি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংঘাতপূর্ন বলে মনে করছেন। তবে অবশ্য, সর্বস্তরে প্রতিবাদের চাপে এই বিল নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে রাজি হয়েছে কেন্দ্র।

আমরা আশা করব নাগরিকত্ব প্রদান এবং অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করণের কাজ রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই করা হোক।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

BISWAJIT BHATTACHARYA BISWAJIT BHATTACHARYA

Veteran journalist. Left critic. Political commentator.

Comment