শুধু বিনয় তামাং নন, দার্জিলিং পেতে মুখ্যমন্ত্রীর হাতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও হোমস্টে পর্যটন
আবাসন প্রকল্পের অর্ধেক টাকা হোমস্টেতে বরাদ্দের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী
- Total Shares
গত লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড় মসনদে পৌছিয়ে দিয়ে ছিল বিজেপিকে। এই রাজ্যগুলোতে ইভিএমে সুনামির মতো আছড়ে পড়েছিল মোদী-ম্যাজিক। বিজেপির '২৭২ প্লাস মিশন'কে বাস্তবের জমিতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ছিলেন এই রাজ্যের ভোটাররা। গেরুয়া শিবিরের মধ্যেও সংশয় ছিল 'মিশন ২৭২ প্লাস' নিয়ে। রাজনাথ সিং-অরুণ জেটলিরাও ২০০ প্লাসেই আটকে ছিলেন। দুর্বার গতিতে এগিয়ে যেতে চেয়ে ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। তাই অমিত শাহ এবং আরএসএস প্রধানরা ২৭২ লক্ষ্য মাত্রা নির্দিষ্ট করলেও, প্লাস কথাটা জুড়ে ছিলেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী।
চার বছর পেরিয়ে বর্তমানে ওই সুনামির রাজ্যগুলোতে এখন ভাঁটার টান। বড় করে স্বপ্ন দেখার কারিগর নরেন্দ্র মোদী অমিত শাহ ওই রাজ্যগুলোতে এবার আসন কমবে বলেই মনে করছেন। তাই মসনদে যাওয়ার রাস্তা সুগম করতে এবার তাদের ফোকাস উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গে। গেরুয়া শিবিরের থিঙ্কট্যাঙ্ক মনে করছে, পশ্চিমবঙ্গ ওড়িশা এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে আসন বাড়াতে না পারলে মসনদ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই, ইতিমধ্যেই, পশ্চিমবঙ্গে কয়েকবার ঘুরে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং সেনাপতি অমিত শাহ।
লোকসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে ততই পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের যাতায়াত বাড়বে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে সুযোগ করে দিয়েছে সিপিএম ও কংগ্রেস। বিরোধী পরিসরে এই দু'টি দল যত দুর্বল হয়েছে ততই সেই জমি দখল করেছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের লক্ষ্য এই রাজ্যের বারোটি আসন। মুখে তারা যতই ২২টি ২৪টি আসনের কথা বলুক, পদ্ম শিবিরের সূত্র বলেছে রাজ্যের ১২টি আসনকে তারা পাখির চোখ করে এগোচ্ছে।
বিজেপির এই তৎপরতা রুখতে ঘুঁটি সাজাচ্ছে তৃণমূল কগ্রেসও। বারোটা আসন তো পরের কথা, গত লোকসভা নির্বাচনে যে দু'টি আসন বিজেপি জিতেছিল সেই দার্জিলিং ও আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রে যাতে পদ্ম ফুল এবার ফুটতে না পারে তা এখন থেকেই নিশ্চিত করতে চাইছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ নজর রয়েছে পাহাড়ের দিকে।
মুখে যতই ২২টি-২৪টি আসনের কথা বলুক, বিজেপি ১২টি আসনকেই পাখির চোখ করে এগোচ্ছে [ছবি; পিটিআই]
ক্ষমতায় আসার পরে মুখ্যমন্ত্রী দার্জিলিংয়ের দিকে নজর দিয়েছিল। পাহাড়ের উন্নয়নকে সামনে রেখে সেখানকার বাসিন্দাদের মন জয়ের চেষ্টা শুরু করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী।
তবে পৃথক গোর্খাল্যান্ডের গাজর ঝুলিয়ে বিমল গুরুংদের সমর্থনে দার্জিলিং লোকসভা আসনকে ঝোলায় পুড়েছিল বিজেপি। তার পর বিমল গুরুং বনাম রাজ্যের সংঘাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল পাহাড়। ধৈর্য রেখে নিপুণ চালে বিমল গুরুংকে পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। ধীরে ধীরে শান্তি ফিরিয়েছেন পাহাড়ে। এখন তাঁর লক্ষ্য দার্জিলিং লোকসভা আসন থেকে পদ্মফুলকে উপড়ে ফেলা। সেই কাজও শুরু করে দিয়েছেন তিনি।
দার্জিলিং লোকসভা আসন বিজেপির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে জিটিএ চেয়ারম্যান বিনয় তামাংকে সমর্থন দিতে পারে তৃণমূল কংগ্রেস। তবে ওপরে বোঝা না গেলেও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চায় ভিতরে ভিতরে বিনয়-বিরোধী স্রোতও বইছে। আর, তা নজর এড়ায়নি তৃণমূল নেত্রীর। তাই তাঁর সাম্প্রতিক পাহাড় সফরে তিনি দু'টি বিষয়ের উপরে জোর দিয়েছেন। একটি হল, দার্জিলিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা। দ্বিতীয়টি হল, হোমস্টের প্রসার ঘটানো।
এই দু'টির লক্ষমাত্রা পূরণ হলে যে ঘরে ঘরে পৌঁছান যাবে তা বিলক্ষণ জানেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শান্তি ফিরেছে, এখন মমতার লক্ষ দার্জিলিং লোকসভা আসন থেকে পদ্মফুলকে উপরে ফেলা [ছবি: পিটিআই]
পাহাড়বাসীর দীর্ঘদিনের দাবি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির। বিশ্ববিদ্যালয় হলে উচ্চশিক্ষার জন্য দূরে গিয়ে ছেলেমেয়েদের থাকতে হবে না। হোস্টেলে অথবা পিজিতে থেকে পড়ার জন্য বাড়তি কড়ি গুণতে হবে না। যে কোনও অবিভাবকের কাছে এ বড় সুখের খবর। আর, হোমস্টের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পর্যটনের প্রসার হলে যে লক্ষ্মীলাভ হবে এই নিয়ে তো কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না।
ইতিমধ্যেই, হোমস্টে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছে পর্যটকদের মধ্যে। হোমস্টের প্রসারে পর্যটকদেরও লাভ। একে তো এর মাধ্যমে পাহাড়ের অনেক অজানা জায়গায় যেমন যাওয়া যাবে, তেমনই পকেটের উপর চাপও কম পড়বে। ফলে, সঠিক পরিষেবা দিতে পারলেই হোমস্টের পরিকল্পনা সফল হবে। এই কারণেই তৃণমূল নেত্রী হোমস্টের মডেল পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন পর্যটন দপ্তরকে।
আর প্রশাসনকে বলেছেন গরিব মানুষদের আবাস তৈরির জন্যে যে অর্থ দেওয়া হয় তার অর্ধেক অর্থ বরাদ্দ করতে হবে হোমস্টের জন্য। এই অর্থে যাদের দুটি ঘর রয়েছে তাদের একটি ঘর হোমস্টের জন্য সাজিয়ে তোলার কাজে বরাদ্দ করা হবে।
এ ভাবেই ঘরে ঘরে পৌছে যেতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাতে দার্জিলিং লোকসভা আসনে কোনও ভাবেই ফুটতে না পারে পদ্মফুল।

