লোকসভা ভোটের কথা ভেবে প্রকল্প ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর, লক্ষ্য মধ্যবিত্তরা
নিজস্বীতে বাড়ি, জানুয়ারিতে মহার্ঘ্য ভাতা। তবে ধাক্কা চিনা বিনিয়োগে
- Total Shares
দু-টাকা কিলো চালে আদিবাসীদের মন ভেজেনি। সড়ক যোজনা ও শস্তায় চাল যে কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প, সে কথাও লোকে জেনে গেছে। তাই ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে অন্য ভাবে পদক্ষেপ করা শুরু করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অস্ত্রে তাঁকে বধ করার কৌশল করে বিজেপি যদি ভোট এগিয়ে আনে, তা মোকাবিলার জন্য অনেক আগে থেকে প্রকল্প ঘোষণা করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে চিন সফর বাতিল হওয়ায় বিনিয়োগ টেনে নতুন কর্মসংস্থানের চেষ্টায় বিঘ্ন ঘটল।
মহার্ঘ্যভাতা ঘোষণা
ডিএ নিয়ে আদালতে যাই চলুক, রাজ্য সরকারের বক্তব্য, এটি অধিকার নয়। আদালতে এ কথা জানালেও, রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য একপ্রস্থ মহার্ঘ্যভাতা (ডিএ) ঘোষণা করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তবে বড্ড আগে। রাজ্য সরকারি কর্মীরা বর্ধিত হারে ডিএ পাবেন ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে, মানে লোকসভা ভোটের বছরের গোড়া থেকে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, এর ফলে রাজ্য সরকারি কর্মীরা ১২৫ শতাংশ হারে মহার্ঘ্য ভাতা পাবেন।
এর আগে জামাইষষ্ঠীতে আধ বেলা ছুটি ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, আর এ বার রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য বাড়তি হারে ভাতা ঘোষণা করলেন সেই জামাইষষ্ঠীর দিনেই। তবে জুন মাসে ঘোষিত এই ভাতা পাওয়ার জন্য রাজ্য সরকারি কর্মীদের অপেক্ষা করতে হবে এখনও ছ-মাস।
সম্প্রতি রাজ্যে এসে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে গেছেন, আগামী বছর লোকসভা ভোট হবে নির্ধারিত সময়েই। কিন্তু কোনও ভাবে কেন্দ্রীয় সরকার যদি তা আগে করিয়ে নেয়? এ রাজ্যে নির্ধারিত সময়েই পঞ্চায়েত ভোট হবে বলে জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নিজেই। তারপরে আচমকাই ভোট ঘোষণা করে দেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেভাগেই ভোটের জন্য মনমোহিনী ডিএ ঘোষণা করে দিলেন। যখনই ভোট ঘোষণা হোক না কেন, ঘোষিত প্রকল্প রূপায়িত করলে নির্বাচন কমিশনের কোপে পড়ার কোনও আশঙ্কা নেই।
নিজশ্রী আবাসন
দু-টাকা কেজি চাল দিয়ে সকলের মন করা যাবে না, তাই রাজ্যের বাসিন্দাদের জন্য নিজশ্রী নামে আবাসন প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন। এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন তাঁরাই, যাঁদের মাসিক আয় ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত। ধরে নেওয়া যায়, শহর-আধাশহরের বাসিন্দাদের কথা ভেবেই এই প্রকল্পের সূচনা। যাঁদের আয় ১৫,০০০ টাকার মধ্যে, তাঁরা এক কামরার ফ্ল্যাটের জন্য এবং যাঁদের আয় ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত তাঁরা দু-কামরার ফ্ল্যাটের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এক কামরার ফ্ল্যাটের কার্পেট এরিয়া হবে ৩৭৮ বর্গফুট, এক কামরার ফ্ল্যাটের কার্পেট এরিয়া হবে ৫৫৯ ফুট।
দেশের সব বাসিন্দার মাথায় ছাদের বন্দোবস্ত করার কথা এক সময় বলেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এখনই হবে, তেমন লক্ষণও নেই। আগামী লোকসভা ভোটের কথা মাথায় রেখে লিফট-ছাড়া পাঁচতলা ফ্ল্যাটের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারের পরিকল্পনা মতে, বছর তিনেকের মধ্যেই বেশ কয়েক হাজার (একটি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে ৫০,০০০) আবাসন গড়ে তোলা হবে।

পরিকল্পনা ঘোষণা এখন করা হলেও, এর লক্ষ্য যে লোকসভা ভোটের পাশাপাশি ২০২১ সালে রাজ্যের বিধানসভা ভোটও, সময়কাল দেখে তা বোঝাই যাচ্ছে।
চাঁদা চাই
দলের শ্রমিক ইউনিয়ন চাঁদা তোলে, কিন্তু সেই চাঁদা দলের ভাঁড়ার পর্যন্ত আসে না। এ বার তৃণমূল নেত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, ৭৫ ভাগ চাঁদা যেন দলের তহবিলে জমা পড়ে। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনের আগে দলের তহবিলে টাকা দরকার। তবে এত দিন পরে কেন তিনি দলের তহবিলের জন্য টাকা চাইছেন সেটাই প্রশ্ন। এর আগে এক সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি ছবি এঁকে সেই টাকা দলীয় তহবিলে দেন। পরে সারদা-কর্তা সুদীপ্ত সেনের জেল হওয়ার পরে তা নিয়ে বিরোধীরা তাঁকে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি। ২০১৯ সালে নির্বাচনী তহবিল গড়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী যে এখন থেকেই ভাবনা-চিন্তা শুরু করে দিয়েছেন, তা স্পষ্ট তাঁর এই প্রসঙ্গ উত্থাপনেই।
গোষ্ঠী কোন্দল, ছাত্র-জুলুম
এক সময় তৃণমূলে লড়াই ছিল আদি বনাম নব্য তৃণমূলে। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে যুব তৃণমূল ও ছাত্র তৃণমূল (টিএমসিপি) প্রথম দিন গোষ্ঠীর লড়াই দলের মধ্যেই থাকে। তবে ছাত্র তৃণমূল অনেক সময়ই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দলের কোন্দল মেটাতে জেলার নেতাদের ডেকে পাঠানো নতুন নয়। যুবরা যে মূল তৃণমূলের অংশ সে কথা মনে করিয়ে সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কেউ চাইলে বেরিয়ে যেতে পারেন, দরজা খোলা রয়েছে।
তবে ছাত্র তৃণমূলের (তৃণমূল কংগ্রেস ছাত্র পরিষদ) সমস্যা অন্য। তাদের জুলুমবাজিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত কলেজে ভর্তি আসা ছাত্রদের। বিভিন্ন কলেজে ছাত্র-সংঘর্ষও ঘটেছে। সব মিলিয়ে দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরক্ত। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যাতে চাত্রদের সমস্যা না করে তাদের সহযোগিতা করেন ছাত্ররা। কিন্তু ছাত্ররা কতটা তা মেনে চলবেন তা বলা মুশকিল।
এখন আর সিপিএম আমলে এসএফআইয়ের কৌটো নেড়ে কিউবার জন্য আট আনা-এক টাকা চাওয়ার যুগ নেই। এখন অভিযোগ উঠছে মোটা টাকা আদায়ের। সম্প্রতি কলেজে নগ্ন করে ছাত্র-পেটানোর ঘটনাও ঘটেছে। সব মিলিয়ে বিরক্ত মুখ্যমন্ত্রী।

দার্জিলিং ও জঙ্গলমহল
দার্জিলিং জেলার তিন মহকুমায় দীর্ঘদিন একটাই দল ছিল, সেটা গোর্খা। কখনও গোর্খাল্যান্ড লিবারেশন ফ্রন্ট, কখনও আবার গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। কিন্তু এত দিনে সেখানে দ্বিতীয় কোনও দল জায়গা করতে শুরু করেছে, সেটি তৃণমূল কংগ্রেস। অরূপ বিশ্বাস এই জেলায় সংগঠন মজবুত করছেন। রাজ্যের যে ৪২টি আসনে (রাজ্যে মোট লোকসভা আসন ৪২টিই) জয় চায় তৃণমূল, তার মধ্যে মার্চার সমর্থনে জেতা বিজেপির এই আসনও রয়েছে। দু-বার এই কেন্দ্রে জয়ী হলেও বিজেপি এখান থেকে এখনও কোনও রাজনৈতিক সুবিধা আদায় পারেনি, সংগঠন বাড়ানোর চেষ্টাও করেনি।
দার্জিলিং পেতে গিয়ে পশ্চিমাঞ্চলের আসন হারাতে হবে না তো? রাজ্যের জঙ্গলমহলে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে ধ্বস নামা ও জেলা পরিষদের প্রধানের পরাজয় দলকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। তাই এখন বাস দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলেও সেখানে পৌঁছে যাচ্ছেন দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। এই তৎপরতাও ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের জন্য, লোকে অন্তত সেটাই মনে করছে।
চিনের প্রাচীরে ধাক্কা
সোশ্যাল মিডিয়ায় ক’দিন ধরেই ছবি-সহ একটি তির্যক বার্তা ঘুরছে। বিখ্যাত মানুষজন কী কী বন্ধ করেছেন। সেখানে রামমোহন রায়ের পাশে লেখা সতীদাহ প্রথা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাগরের নামের পাশে লেখা বাল্যবিবাহ, মার্ক জুকেরবার্গের পাশে পড়াশোনা ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে সরকারি চাকরি। রাজ্যে এখন সরকারি চাকরি নেই বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা কথা দেখা যায়। বেসরকারি চাকরিই বা কোথায়? প্রসঙ্গক্রমে উঠে আসে রাজ্যে বিনিয়োগের বেহাল ছবি।
এ রাজ্যে বিনিয়োগ টানতে চিন যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, কিন্তু যাত্রা শুরুর কয়েকঘণ্টা আগে তা বাতিল হয়ে যায়। তার কারণ হিসাবে বলা হয়, বিদেশ মন্ত্রকের ছাড়পত্র না পাওয়া এবং চিনের দূতাবাসের পক্ষে সে দেশের শিল্পপতিদের সঙ্গে হতে চলা বৈঠক নিশ্চিত না করা। ভোটের আগে বিনিয়োগ না এলেও অন্তত বিনিয়োগ আসতে চলেছে ও কর্মসংস্থান হতে চলেছে বলে যে প্রচার করা যেত, এই সফর স্থগিত হওয়ায়, এখনই তা করা সম্ভব হবে না মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে।তবে এখন তিনি যে সব ঘোষণা করছেন তা যে লোকসভা ভোটের কথা ভেবে, তা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই।

