ভোটের কথা ভেবে হিন্দুদের আস্থা অর্জনে মরিয়া মমতা, শ্রদ্ধা শ্যামাপ্রসাদকে
পশ্চিমবঙ্গে দেড়শোর বেশি আসনে ফলের নির্ণায়ক হিন্দু ভোট
- Total Shares
দক্ষিণ বসিরহাট থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসাবে শমীক ভট্টাচার্যের বিধায়ক হিসাবে জিতে যাওয়া এখনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এখন ২৯৪টি আসনের মধ্যে এমন ১৭২টি আসন আছে যে আসনগুলিতে হিন্দু ভোট কোনও প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক হতে পারে, মুসলিম ভোট নয়। হিন্দু ভোট একত্রিত হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যাবতীয় আস্ফালন বন্ধ হয়ে যাবে।
হিন্দু ভোট একত্রিত হলে কী হতে পারে তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল উত্তরপ্রদেশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন মনে করেছেন, তাঁর কৃতকর্মের জন্য (যাকে সারা ভারত জুড়ে সংখ্যালঘু তোষণ বলে প্রচার করা হচ্ছে)পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু জনসংখ্যার তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। আগামী বছর লোকসভা ভোট। এই অবস্থায় রাজ্যের সংখ্যাগুরু ভোটারদের মন পেতে ও নিজেকে তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসাবে তুলে ধরতে চান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন কোনও রকম ঝুঁকির রাস্তায় হাঁটতেও চাইছেন না।
ইফতার পার্টিতে মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় ও মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু জনসংখ্যার ভোট তাঁর হাতেই আছে, তা হিন্দু-মুলসলমান নির্বিশেষে। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোটে যে অপকর্ম তাঁর দল করেছে, কী ভাবে মানুষকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রেখেছিল, সে কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ে ভালো আর কেউ জানেন না। যে সব মানুষ পঞ্চায়েতে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, সেই সব মানুষ যদি এখন বিদ্রোহ করে বসেন তা হলে তৃণমূল কংগ্রেস মুশকিলে পড়ে যাবে।
পঞ্চায়েতে যে কৌশলে এ রাজ্যে ভোট করানো হয়েছে, সেই কৌশল বা কারিকুরি লোকসভা নির্বাচনে খাটবে না। সেখানে যাঁরা ভোট দেওয়ার তাঁরা ভোট দেবেন এবং যাঁকে দেওয়ার তাঁকেই দেবেন। সেই রকম নিরাপত্তা-ব্যবস্থা তৈরি হয়। এই অবস্থায়, অর্থাৎ একটি দ্বিমুখী চাপের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিক ভাবে দলীয় স্তরে রামনবমী পালনের কথা ঘোষণা করেন এবং এ বার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে মাল্যদান করা।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে মালা পরাচ্ছেন ফিরহাদ হাকিম
এটা ঘটনা যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রাজনৈতিক ভাবে পশ্চিমবঙ্গে সফল হতে পারেননি। এটাও ঘটনা যে তৃণমূল-বিজেপির সখ্য প্রমাণ করবার নাম করে বামপন্থীরা শ্যামাপ্রসাদের নামে কুৎসা রটনা করা শুরু করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু এটাও ঘটনা যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতি এ রাজ্যের মানুষের একটা আবেগ আছে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনস্তত্ত্বের কোনও একটা গভীর জায়গায় তাঁর আসন রয়েছে। তাই বামপন্থীদের এই কুৎসা রটনা সেই আবেগকে আরও বেশি করে উস্কে দিচ্ছে।
দেশ যখন বিভাজনের রাজনীতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তা ভালো হোক বা মন্দ হোক, সেই রাজনীতির পিছনে দৌড়চ্ছে কংগ্রেস থেকে তৃণমূল কংগ্রেস, সবাই। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী যাচ্ছেন সংখ্যাগুরু ভোটকে বিভাজনের রাজনীতির মধ্য দিয়ে। এ কাজ তিনি গুজরাটে করেছেন, এ কাজ তিনি করার চেষ্টা করেছেন কর্নাটকে। শুধু ধর্মীয় ভাবেই নয়, জাতিগত ভাবেও সংখ্যাগুরু ভোট বিভাজনের চেষ্টা করেছেন রাহুল গান্ধী।
ভোটের নিরিখে বিচার করলে, পশ্চিমবঙ্গে জাতিগত বিষয়টি একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে এখানে ধর্মীয় বিভাজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই বিভাজন কেউ সফল ভাবে ব্যবহার করতে পারে তা হলে ভোটের ময়দানে তার লাভই হবে। পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যার নিরিখে সংখ্যালঘু ভোটদাতার অনুপাত অন্য রাজ্যের তুলনায় বেশি।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে মালা পরাচ্ছেন মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়
এখন প্রচার করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনসমর্থন এ খন নিম্নমুখী। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের সময় নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ যদি এ রাজ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেন এবং বিশেষ প্রচারকৌশল ব্যবহার করেন, সে ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ে এ কথা বেশি কেউ জানেন না যে পুরো ৩১ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট পেলেও, বাকী যে ৬৯ শতাংশ মতো ভোট থেকে যাচ্ছে তা যদি কোনও ভাবে সংহত হয়, তা হলে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন সেখানেই শেষ হয়ে যাবে।
সেই কারণেই এ বছর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে মালা দিতে দেখা গিয়েছে রাজ্যের প্রথম সারির মন্ত্রীদের। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে এখন তাঁরা বাংলার কৃতী সন্তান হিসাবে মালা দেওয়ার কথা বলছেন, কিন্তু এ রাজ্যে ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গড়ার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে তাঁরা শ্রদ্ধা জানাননি।

