বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাড়িতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেখা করতে যাওয়ার আসল কারণ
যখন সিপিএম সাংসদের মুখ দেখাচ্ছে টিভিতে, তখন নজর ঘুরে গেল রাজনৈতিক শিষ্টাচারের দিকে
- Total Shares
যে দিন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সিপিএমের এক প্রাক্তন সাংসদের উপরে হামলার অভিযোগ উঠল, ঠিক সেই দিনই কেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ রামচন্দ্র ডোমের রক্তাক্ত মুখ যখন দেখাচ্ছে টিভি চ্যানেলগুলো, যখন অভিযোগ উঠছে তৃণমূল-আশ্রিত গুন্ডারা পঞ্চায়েত ভোটের জন্য বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দিচ্ছে, ঠিক সেই সময়টাকেই তিনি বেছে নিয়েছেন দেখা করার জন্য।
সমালোচনা ও নিন্দার বন্যা বইতে শুরু করল, বিশেষ করে যখন প্রথমসারির তৃণমূলনেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় পুরো ঘটনাটা অগ্রাহ্য করতে চাতুরির আশ্রয় নিলেন। যখন ওই দুই দৃশ্য দেখানোর তোড়জোড় শুরু করেছে টিভি চ্যানেলগুলি, তখন আচমকাই তাদের নজর ঘুরে গেল।
আচমকাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুভব করলেন অসুস্ত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে তাঁর দেখতে যাওয়া দরকার, এখনও পর্যন্ত বামফ্রন্টের জনসভায় সবচেয়ে বেশি লোক টানতে পারেন এই বুদ্ধদেবই। তিনি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পাম অ্যাভিনিউর বাড়িতে গেলেন, সেখানে আধঘণ্টা কাটালেন, তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য সম্বন্ধে খোঁজখবর নিলেন, বইপত্র নিয়ে কথা বললেলন, বাদ গেল শুধু রাজনীতির প্রসঙ্গ।বাইরে অপেক্ষারত সাংবাদিকদের তিনি বললেন ভিতরে তিনি কী করেছেন। একমাসের কিছু বেশি আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আধিকারিকদের বলেছিলেন, তাঁর পূর্বসূরী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাড়ি মেরামত করে দিতে এবং তাঁর জন্মদিনে মিষ্টির সঙ্গে শুভেচ্ছাবার্তাও পাঠিয়েছিলেন। তখনও তিনি দেখা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তখন অসুস্থ থাকায় এবং সেই সময় কারও সঙ্গে দেখা করার মতো তাঁর শারীরিক অবস্থা না থাকায় সে বার দেখা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
কিন্তু যে দিন তাঁর দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে, ঠিক সেই দিনই বুদ্ধদেবের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পা হল একটি ঘটনা থেকে নজর ঘোরাতে রাজনৈতিক ভাবে একেবারে মাপা সিদ্ধান্ত।

এ ভাবে দেখা করার কারণ হল, লোকের কাছে এমন একটা বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে তাঁর বিশাল হৃদয় যা ক্ষুদ্র রাজনীতির অনেক ঊর্ধ্বে। বাম নেতারা যখন তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন তখন বুদ্ধদেবের বাড়িতে গিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে মূল ঘটনা থেকে নজর ঘুরিয়ে দিতে তিনি সফলও হন।
এবার থেকে কখন তৃণমূলের নিন্দা করবেন, সতর্ক ভাবে সেই সময়টাকেও বেছে নিতে হবে বামফ্রন্টের নেতাদের, কারণ আসল উদ্দেশ্য যাই হোক, কখন যে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিরল রাজনৈতিক শিষ্টাচার দেখাবেন!
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অবশ্য মনে করছেন, যে সব বামফ্রন্ট কর্মী ও সমর্থক যাঁরা দল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার কথা চিন্তাভাবনা করছেন, এটি আসলে তাঁদের উদ্দেশ্যে বার্তা। তাঁর বার্তা হল, যাঁরা বামফ্রন্ট ছাড়ার কথা ভাবছেন, তাঁরা তৃণমূলের শিবিরে আশ্রয় নিতে পারেন, বিজেপিতে নয়। পঞ্চায়েত ভোটের মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে এখনও পর্যন্ত যা দেখা গিয়েছে তা হল, বামফ্রন্ট বা কংগ্রসকে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে বিজেপি, তৃণমূলের সঙ্গে সমানে টক্কর দিতে পারে শুধু তারাই।
এমন কথা প্রায়ই শোনা যায় যে, বামফ্রন্টের ভোট কেটেই বিজেপির ভোট বাড়ছে। তাই এখন এই ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে তিনি বামেদেরও চেয়েও বেশি বামপন্থী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী, আর সে জন্যই তাঁর সঙ্গে বামপন্থী নেতাদের সুসম্পর্ক – এক সময় তাঁর সঙ্গে যেমন জ্যোতি বসুর সুসম্পর্ক ছিল, এখনও সেই ভাবেই তাঁর সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের।

