১৯৯৩ ও ২০০৫ সালের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন নীতি থেকেই সরে গিয়েছেন
সেই অবৈধ অনুপ্রবেশ: দেখুন মমতা ও বাজপেয়ীকে
- Total Shares
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই ১৩ জন তথাকথিত শহিদ আজ মর্মাহত এবং বিস্মিত। স্বপ্নের নেতৃত্বের ডাকে যে দাবিকে সামনে রেখে তাঁরা সে দিন কলকাতার বুকে পুলিশের গুলির সামনে অকুতোভয় ছিলেন। আজ তাঁর বিস্মৃত। তাঁদের আত্মা এমনিতেই নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আস্থা হারিয়েছে যে দিন থেকে কলকাতার বুকে ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে নীরবতা পালনের রেওয়াজ বন্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু আজ তাঁদের আত্মা আরও বেশি করে বিভ্রান্ত, যখন ৩০ জুলাই নবান্নতে এনআরসি নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরা বিভ্রান্ত যে তা হলে তাঁরা কী উদ্দেশ্যে এবং কী দাবি নিয়ে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই কলকাতার রাস্তায় দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন। পুরোনো তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, যে সেদিন কংগ্রেসের যুবনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি ছিল, নো এপিক, নো ভোট।
সেই দাবির পিছনে অন্তর্নিহিত কারণ কী ছিল? অতি সাধারণ বুদ্ধিতে ২১ জুলাইয়ের প্রয়াত ব্যক্তিরা নো এপিক, নো ভোট-এর সঙ্গে এনআরসি-র কোনও পার্থক্যই খুঁজে পাচ্ছেন না। নির্বাচকের সচিত্র পরিচয় পত্র এবং তার উদ্দেশ্য ছিল যথার্থ ভারতীয় নাগরিকরা যাতে ভারতীয় ভোটদাতা হিসাবে চিহ্নিত হতে পারেন। সেই সময়, সেই মুহূর্তে এই সচিত্র পরিচয়পত্রই ছিল নাগরিকত্ব প্রমাণের প্রতীক। এবং সেই দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অভিযোগের নিরিখে সেই দাবি ছিল সময়ের দাবি। মমতার অভিযোগ ছিল, বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের অবৈধ ভাবে ভারতের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে তৎকালীন বহামফ্রন্ট নেতৃত্ব। সারা ভারতে সাড়া জাগিয়েছিল মমতার এই দাবি এবং আন্দোলন। হিরোধিতা করতে পারেনি বিজেপিও। আজ যখন সেই একই প্রক্রিয়া আরও নিশ্ছিদ্র ভাবে এবং মহামান্য সর্বোচ্চ আদালতের নির্দিষ্ট নির্দেশনামার ভিত্তিতে অসমে বাস্তবায়িত করার প্রক্রিয়া চলছে, তখন সেই একই নেত্রী কেন এক ক্ষিপ্ত, কেন এত বিরোধিতার উগ্রতায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন?
এখন নিরবতা পালনও হয় না তৃনমূলের শহীদ দিবসে
যে কোনও রাজনৈতিক দলের সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৌশল বদলায়। কিন্তু নীতি বা আদর্শ বদলে যাওয়ার ব্যাপার নয়। পূর্ব ভারতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ—এটি অতি নগ্ন বাস্তব। সে বিষয়ে কোনও রাজনৈতিক দলের অবস্থান কোনও কৌশল নয়, একটা নীতি বা আদর্শ।
শুধু ১৯৯৩ সাল নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান একই ভাবে প্রতিধ্বনিত করেছেন, অন্তত তথ্যগত ভাবে, ২০০৫ সাল পর্যন্ত। কারণ আজও অনেক ভারতবাসীর মনে সেই ছবি স্পষ্ট যখন ক্রুদ্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদের ভিতরে অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে ভোটার তালিকা ছুড়েছিলেন অধ্যক্ষের চেয়ারের দিকে। দাবি করেছিলেন তাঁর পদত্যাগ গ্রহণ করার জন্য। সে সময় অধ্যক্ষের আসনে ছিলেন উপাধ্যক্ষ চরণজিৎ সিং অটওয়াল। অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি।
তা হলে যে বিষয়টিকে দলের আদর্শ হিসাবে ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত লালন-পালন করে গেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেটা কেমন করে পালটে গেল ২০১৮ সালে?
সেদিন কংগ্রেসের যুবনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি ছিল, নো এপিক, নো ভোট
এটা ঠিক যে সরকার পরিচালনা এবং তার রাজনীতি বিরোধী রাজনীতির থেকে ভিন্ন এবং অনেক বাধ্যবাধকতার মধ্যে সীমায়িত। কিন্তু দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে যে মমতা এক সময় আপোষহীন ছিলেন, তিনি কী এমন দায়বদ্ধতার কারণে আর এনআরসি-র বিরোধিতা করছেন সেটা তাঁর সহকর্মী শহিদদের কাছে বোধগম্য নয়।
এনআরসি কী এবং কেন এ বিষয়ে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াকিবহাল নন, সেটা ভাবার কোনও কারণ আছে বলে মনে হয় না। ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে অনুপাতের হিসাবে মুসলমান ভোটদাতার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এটা একটা সাধারণ ধারণা ভারতের ভোট রাজনীতিতে, যে মুসলমান জনসমাজ এক নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই ভোটদান করে থাকে। এই রকম একটা ধারনার উপরে ভিত্তি করেই পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলগুলি দীর্ঘ সময় ধরে এই ৩০ শতাংশ ভোটকে নিজেদের ছত্রছায়ায় রাখার চেষ্টা করেছে। অবশিষ্ট ভারতের ধারণা হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই একই রাজনীতিতে গা ভাসিয়েছেন।
কিন্তু এই রাজনীতির কৌশলকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে তিনি তাঁর নীতি এবং আদর্শ এবং সেই সঙ্গে দেশের দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যে ভাবে সমঝোতা করছেন, তাতে ভারতবাসী যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। এই মুহূর্তে তিনি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে সংবাদের শিরোনামে। এটা হয়তো তাঁকে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে একটা অন্য চেহারায় প্রতিফলিত করবে। কিন্তু যে ভাবে অবশিষ্ট ভারত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অবস্থানের কারণে বিরক্ত, তাতে তাঁর পক্ষে বিষয়টি কতটা সুখকর হবে, সেটা বেশ সন্দেহজনক।
এটা ঠিক যে ১ অগস্ট সংসদ ভবনে বেশ সমাদৃত হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে সময় দিয়েছেন সনিয়া গান্ধী। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁর এই নতুন চেহারার রাজনীতি কতটা ফলপ্রসূ হবে, পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে ২০১৯ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা পরিমাপ করার সময় এখনও আসেনি।

