তৃণমূল কি পারবে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে
শেষ কয়েকটি নির্বাচনে বামপন্থীদের পিছনে ফেলে পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বিজেপি
- Total Shares
২০১৮,২০১৯, ২০২১। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির প্রেক্ষিত প্রস্তুত। নীতি আর কৌশলের চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত সমস্ত রাজনৈতিক দল। তৃণমূল কংগ্রেসও ক্ষমতায় থাকতে বদ্ধপরিকর। বেড়ে ওঠার রাস্তা খুঁজতে মরিয়া বিজেপি। বামেরা দিশাহারা তাদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় খাবি খাচ্ছে কংগ্রেস। বাংলার রাজনীতি আবার একটা সন্ধিক্ষণে।
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় জাতীয় রাজনৈতিক দলের রাজ্যের প্রতি বঞ্চনা- এই প্রেক্ষাপটে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান। দীর্ঘ কংগ্রেস দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনে দিকে দিকে আঞ্চলিক দলগুলোর বেড়ে ওঠার এবং জনপ্রিয়তার গড়পড়তা কারণ এটাই। পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের সঙ্গে শাসক বামপন্থীদের কৌশলগত সমঝোতা দুর্বল করছে বিরোধী রাজনৈতিক ঝাঁজ। আদর্শগত দিক দিয়ে দীর্ঘ সময় রাজ্যের মানুষের মন যোগাতে ব্যর্থ বিজেপি। এমন সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একবগ্গা জেদের মধ্যে যুক্তির স্বাদ পেয়েছে বাংলার মানুষ, কিন্তু সে পর্যায় এখন অতীত।কেটে গেছে সাতটা বছর। এবার হিসাব নিকাশের পালা, ৩৪ বছরের বাম শাসনের অজুহাত এখন অকেজো। তাই নতুন কৌশল। তৃণমূল কি পারবে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে। বিজেপি কি পারবে সম্মানজনক প্রতিযোগিতার মুখে ফেলতে? বামপন্থীরাও কি পারবে ভিতটা টিকিয়ে রাখতে?
গত সাত বছরে তৃণমূল কংগ্রেস সম্বন্ধে লোকের মনে কয়েকটি নেতিবাচক পরিচিতি লাভ করেছে বাংলার লোকের মনে। প্রথমত, পরিকাঠামোগত ভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত, দ্বিতীয়ত, সংখ্যালঘু তোষণকারী দল। তৃতীয়ত গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে বিদীর্ণ। এবং চতুর্থত, সম্পূর্ণ নীতিহীন, শুধুমাত্র কৌশলপন্থী দল। তা হলে প্রশ্ন হচ্ছে, এই মুহূর্তে তৃণমূলের সাফল্যের চাবিকাঠি কী? প্রথমত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সীমাহীন জনপ্রিয়তা, দ্বিতীয়ত ক্ষমতার শীর্ষে থাকায় সিদ্ধান্তগ্রহণের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রিত রাখা। তৃতীয়ত, বিরোধী রাজনীতিতে সংগঠিত প্রয়াসের অভাব। এবং অবশ্যই মমতার ক্ষুরধার রাজনৈতিক কৌশল। মনে রাখতে হবে, কোনও নীতি নয়, শুধুমাত্র কৌশল।
১৯৯৭ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের কারণ ছিল একমাত্র এবং তীব্র বাম বিরোধিতা। পরিণতি হল, আজও তৃণমূল টিকে রয়েছে বিরোধিতার রাজনীতি হাতিয়ার করেই। সেদিন প্রতিপক্ষ ছিল বামপন্থীরা, আজ মমতা বেছে নিয়েছেন বিজেপিকে। গঠনমূলক রাজনীতির তুলনায় বিরোধিতার রাজনীতিতেই অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ মমতা।তৃণমূলনেত্রীর আরও একটি ইতিবাচক দিক হল, তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ও সিদ্ধান্তে অপ্রত্যাশিত অনিশ্চয়তা। খুব স্বাভাবিক কারণে সারা দেশে বিরোধী রাজনীতি বইছে বিজেপি বিরোধিতার খাতে বইছে এবং অত্যন্ত সঠিক সময়ে এবং সম্ভবত সবার আগে সেই রাজনীতিতে আবার সেই একরোখা গলা মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও প্রথম সারিতে।
সেদিন প্রতিপক্ষ ছিল বামপন্থীরা, আজ মমতা বেছে নিয়েছেন বিজেপিকে
এমন এক ব্যক্তিত্বের সামনে রাজ্য বিজেপির রাজনীতি নেহাত শিশুসুলভ। এটা ঠিক যে বহু রাজ্য কোনও নির্দিষ্ট নেতৃত্ব ছাড়াই ক্ষমতাদখলের লড়াইয়ে সফল হয়েছে বিজেপি। কিন্তু বাংলার রাজনীতির ইতিহাস একেবারেই উল্টো স্রোতে হেঁটে এসেছে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ বিজেপি না পেরেছে নেতৃত্ব ঠিক করতে, না পেরেছে আন্দোলনে তীব্রতা আনতে। বিজেপি এটাও ঠিক করতে পারেনি যে বাংলার রাজনীতিতে ধর্মীয় বিভাজনের সুড়সুড়ি থাকা উচিত্ নাকি উন্নয়ন-নীতি আদর্শ নিয়ে প্রথাগত পথেই চলা উচিত্। মনে রাখতে হবে যে, ত্রিপুরার ইতিহাস আর বাংলার ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বাঙালিত্বের উচ্ছাস একেবারেই অবান্তর। রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৭২টিই হিন্দু প্রধান। সেই আনন্দে আত্মহারা রাজ্যের রাজ্য বিজেপির একাংশ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ নবজাগরণের বাংলা, বাংলার ইতিহাসে আছে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বাংপন্থীদের তীব্র আন্দোলন এবং বামপন্থীদের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তাল আন্দোলন। পশ্চিমবঙ্গে কারও পৃষ্ঠপোষকতার জেরে ১৯৭৭ সালে বামপন্থীরা বা ২০১১ সালে তৃমমূল ক্ষমতায় আসেনি। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিরোদী ভোট এককাট্টা করবার পরিস্থিতি কি বিজেপি তৈরি করতে পারবে? লাখ টাকার প্রশ্ন।
রাজ্যের গত কয়েকটি নির্বাচনে বামপন্থীদের পিছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বিজেপি।বাম ও বিজেপি এই দুই দলের আদর্শগত অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। তাই ভাবতে অবাক লাগে, বামপন্থী ভোট কী ভাবে বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। উত্তরটা খুবই সাধারণ, যে আদর্শের গভীরতা নিয়ে বিজেপি বামপন্থীরা বড়াই করে এসেছে, তা নেহাতই ক্ষমতার গন্ধ। একদল ক্ষমতালোভী দল বেঁধে তৃণমূলে ঘাঁটি গেড়েছে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে। বাকিরা ব্যস্ত বিজেপির বাক্সে তৃমমূল বিরোধিতার যোক্তিকতা জাহির করতে। বামপন্থীদের ঝুলিতে এখন শুধুমাত্র কিছু ঝড়তি-পড়তি লোকজন। না আছে আদর্শের গভীরতা না সংগঠনের জোরালো কাঠামো। আবার সেই নেতৃত্বের সঙ্কট, ঠিক বিজেপির মতো।
প্রফুল্ল ঘোষ বা প্রফুল্ল সেন, বিধানচন্দ্র রায় বা অজয় মুখোপাধ্যায়, জ্যোতি বসু বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বাধীনতার পর বাংলায় নেতৃত্বের ব্যক্তিত্ব একটা বড় চাহিদা।তার সঙ্গে বাম জমানার সাফল্যের একটা বড় কারণ ছিল বিরোধী রাজনীতিকে অকেজো করে রাখা। নিন্দুকরা বলেন, সোমেন মিত্র বা প্রণব মুখোপাধ্যায় ছিলেন সবচেয়ে ক্ষমতাশালী বামপন্থী নেতা। একই অপবাদে বিদ্ধ ছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। রাজ্য আর কেন্দ্রীয় রাজনীতির মাঝে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার কারণে বাম-বিরোধী নেতৃত্বের নিরিখে একশো শতাংশ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী। এই গতিপথের ধারা অনুসরণ করে রাজ্য কংগ্রেস এখন অস্তিস্তহীন।
বাংলা দখলে কেন্দ্রীয় বিজেপির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দুর্গ বাঁচিয়ে জাতীয় স্তরে প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা- এই দুয়ের যাঁতাকলে আটকে বাংলার রাজনীতি। বামপন্থীদের একটুআধটু আস্ফালন যদি যোগ হয়ে যায়, তবে বাংলা আবার রাজনৈতিক হিংসায় শীর্ষ স্থান নেবে সন্দেহ নেই।

