প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দ্বীপগুলো আত্মসম্মানে ভরপুর

চিনের চাপাচাপিতেও সটান না করে দিয়েছে তেরো হাজারের দেশ নাউরু

 |  3-minute read |   09-09-2018
  • Total Shares

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছোট ছোট অনেক দেশ মাথা তুলে আছে, যে সব দেশের জনসংখ্যা কয়েক হাজার থেকে মেরেকেটে কয়েক লাখ। বিশাল বিশ্বে তাদের নামটুকুও জানে না অনেকে। যেমন ভানুয়াটু। ৮০টি দ্বীপ নিয়ে তৈরি এই দেশে সাকুল্যে পৌনে তিন লক্ষ লোকের বাস। নিউ হেব্রাইডেসেরই নতুন নাম ভানুয়াটু। এমনই আরেকটি ছোট্ট দেশ টুভালু, এখানে বাস মোটে এগারো হাজার লোকের।

এই সব দেশগুলোকেও অবশ্য কোনও দিন তাদের তালিকার বাইরে রাখেনি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা। এই দেশগুলোর পরিকাঠামো বেশ খারাপ। ঋণ নেয়, তবে শোধ করতে কালঘাম ছুটে যায়। তবে আত্মসম্মান তাদের রয়েছে পুরোমাত্রায়। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের যে চিন্তা রয়েছে, তাও স্পষ্ট হয়ে যায় তাঁদের প্রতিবাদের ধরন দেখলে।

nz-baron-060918_090918042439.jpgনাউরুর রাষ্ট্রপতি ব্যারন ওয়াকা (এএফপি)

অতি সম্প্রতি সংবাদে জায়গা করে নিয়েছে এমনই ছোট্ট একটি দেশ, নাউরু। তেরো হাজার মতো মানুষের বাস এই দেশে। আর সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান সটান জানিয়ে দিলেন যে চিনের আচরণ অবমাননাকর। চিন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিধর দেশ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই) হিসাবে মান্যতা পাচ্ছে। তা বলে প্রশান্ত মহাসাগরের দেশগুলো কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, তা চিন ঠিক করে দেবে কেন? তা ছাড়া টুভালুর প্রেসিডেন্টের বক্তৃতা শেষ হওয়ার আগে চিনের প্রতিনিধি দু কিয়োয়েনকে তিনি যে বলতে দেবেন না, সে কথা দ্ব্যর্থহীন ভাবে জানিয়ে দেন নাউরুর রাষ্ট্রপতি ব্যারন ওয়াকা। কিয়োয়েনের আচরণকে উদ্ধত বলে বর্ণনা করেন ওয়াকা।

পরে ওয়াকা ক্ষমা চেয়ে নেন বটে, তবে জানিয়ে দেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের কোনও ঘটনা তিনি ঘটতে দেবেন না।

প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ফোরামে ১৮টি দেশ আছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ছাড়া প্রতিটি দেশই বেশ ছোট। যেমন কুক আইল্যান্ডস, ফিজি, ফ্রেঞ্চ পলিনেসিয়া, কিরিবাটি, নাউরু, নিউ ক্যালিডোনিয়া, নিয়ু, পালাউ, পাপুয়া নিউ গিনি, মার্শাল আইল্যান্ড, সামোয়া, সলোমন আইল্যান্ড প্রভৃতি। দেশগুলি নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে চায়।

যেমন ২০০৯ সালে কোপেনহাগেনে গলা তুলেছিল টুভালু। তাদের বক্তব্য ছিল, কার্বন নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ না হলে তারা বিপদে পড়ে যাবে, অচিরেই সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। বিশ্বের তাবড় দেশগুলির সামনে কোনও মতেই তারা নুয়ে পড়েনি। সে দেশের প্রতিনিধি দ্বর্থ্যহীন ভাষায় জানিয়ে দেন যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য যে সব দেশ সবেচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় তার মধ্যে টুভালু অন্যতম। তাই তাঁরা নতুন চুক্তি চান। ছোট্ট এই দেশের দাবি বড় দেশগুলো মানতে রাজি না হওয়ায় বৈঠকটাই ভেস্তে যায়।

rcs07_climate-copenh_090918042541.jpgকোপেনহাগেনে প্রতিবাদ (ফাইল  চিত্র)

ভারত মহাসাগরের ছোট্ট দেশ মালদ্বীপ একবার অভিনব উপায়ে প্রতিবাদ করেছিল। তারা মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছিল মহাসাগরের নীচে। তারাও বিশ্বকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল উষ্ণায়নের ভবিষ্যৎ।

সম্প্রতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলির বৈঠকে এমন ঘটনার একটি নেপথ্য ঘটনা আছে, যেটি না বললে ব্যাপারটি স্পষ্ট হবে না। প্রশান্ত মহাসাগরে বেশ কিছুদিন ধরেই চিন নিজের আধিপত্য বাড়াতে চাইছে। সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে ঝামেলাও কম হয়নি। এই অঞ্চলের নীচে তেলের ভাণ্ডারই তার কারণ।

তা ছাড়া চিন চায় না এই সব দেশ তাইওয়ানের সঙ্গে কোনও রকম যোগাযোগ রাখুক। চিন (পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না) মনে করে তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না) তাদেরই অংশ। যখন মনে করবে তারা নিজেদের দেশের অন্তর্ভুক্ত করে নেবে। আলাদা আলাদা ভাবে চিন এ ব্যাপারে চাপ দিয়ে আসছে ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে। দ্বীপরাষ্ট্রগুলো এ ব্যাপারে নিজেদের নীতিতে চলে। ফিজির সঙ্গে ১৯৭৫ সাল থেকে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে চিনের, তবে কিরিবাটি, মার্শাল আইল্যান্ড, নাউরু, সলোমন আইল্যান্ডের বেশ কয়েকটি দেশ আলাদা ভাবে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলে। এখানেই চিনের আপত্তি। আর তাদের ব্যাপারে চিন নাক গলাচ্ছে বলে এই সব ছোট ছোট দেশগুলোর আপত্তি।

maldives_090918042615.jpgমালদ্বীপের গিরিফুসি দ্বীপের নীচে ২০০৯ সালে মন্ত্রিসভার বৈঠক (ফাইল চিত্র: এএফপি)

প্রশান্ত মহাসাগরের দেশগুলো নানা ভাবে সুবিধা পায় দুই চিনের থেকে। তবে রিপাবলিক অফ চায়না চায়, এইসব দেশগুলো যেন তাদের কথা শোনে। কোনও দিক থেকেই এই দেশগুলো চিনের সমকক্ষ নয়। ভারতের একটি ছোট শহরের থেকেও এদের জনসংখ্যা কম। তবে আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান আছে পুরো মাত্রায়।

অস্ট্রেলিয়া-নিউ জিল্যান্ডের মতো দেশগুলো চিনের সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে চলে, কিন্তু এই সব ছোট ছোট দেশগুলো কাউকে পরোয়া করে না, স্রোতের বিপরীতে যাওয়া ছোট ছোট মাছের মতো।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment