কুটির ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিয়ে ঘোষণায় সুফল মিলবে, তবে ভোটে সুবিধা হবে না
১২টি নতুন ঘোষণা সাধুবাদযোগ্য, তবে শিল্পে জোয়ার আনবে না এখনই
- Total Shares
মাঝে মোটামুটি ভাবে দু’বছরের ফারাক।
এক বছর ৮ নভেম্বর বিমুদ্রাকরণ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। পরের দিন ব্যাঙ্ক বন্ধ। তার পরের দিন যখন ব্যাঙ্ক পরিষেবা দেওয়া শুরু করল, দেশ অবাক হয়ে দেখল কত সুষ্ঠু ভাবে পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করেছে সরকার। কিন্তু তার পরের দিন থেকেই শুরু হয়ে গেল সমস্যা। মাস গড়াল, সাধারণ লোকের সমস্যা নিয়ে হইচই, বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যে রাজনীতি সরগরম।
বাজপেয়ী সরকারের আমলে ২০০০ সালে পোঁতা একটা বীজও অঙ্কুরিত হল মোদীর জমানায় – পণ্য ও পরিষেবা কর। এতে সুবিধা অনেক।
কুটির ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ১২ দফা ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (সৌজন্য: মোদী অ্যাপ)
তবে সরকারের এই দুই পদক্ষেপে সবচেয়ে বিপাকে পড়লেন কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগীরা (এসএসএমই)। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেই ২০১৫ সালে দেশে কৃষির পরেই সবচেয়ে বড় (এবং অসংগঠিত) ক্ষেত্রকে নরেন্দ্র মোদী যে সব সুযোগসুবিধা দিয়েছিলেন (সংজ্ঞা বদল করে) তা একরকম প্রহসনে পরিণত হল।
সমস্যা কোথায় তা দু’একটা সাধারণ উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে।
ধরা যাক নোটবন্দির কথা। কারেন্ট অ্যাকাউন্টে টাকা তোলার মাত্রা বেঁধে দেওয়া হল। শ্রমিকরা সাধারণ ভাবে হপ্তা (এক সপ্তাহের পারিশ্রমিক) পান প্রতি শনিবার। তাঁদের হপ্তা মেটানোর মতো টাকা তুলতে পারছেন না কারখানার মালিক। যদি বা কিছুটা তোলা যাচ্ছে তাও ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে দু’হাজারি নোট। অতবড় নোট ভাঙাবেন কী করে! তা ছাড়া তাঁরা কাজ করবেন নাকি ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে অতি কষ্টে বিপদের আশঙ্কায় রেখে দেওয়া গোটা দু’তিন ৫০০-১০০০ টাকার নোট জমা করবেন?
মালিকদের অবস্থা আরও শোচনীয়। মাল কিনতে পারছেন না, তৈরি মাল বেচতে পারছেন না। এই সব পাকেচক্রে ব্যবসার বিপুল ক্ষতি।
তারপরে পণ্য ও পরিষেবা কর। নিন্দুকরা বলেন এত সরল একটা পদ্ধতিকে এতটা জটিল করা সম্ভবত অরুণ জেটলির পক্ষেই সম্ভব। স্বাধীনতার প্রায় সাড়ে সাত দশক পরে যে দেশে সব গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি সেখানে কিনা সবকিছু অনলাইন। এর ফল যা হওয়ার তা হল। বহু ছোট ব্যবসায়ী নিজেকে নথিভুক্ত করতে পারলেন না, তাঁদের থেকে কাঁচামাল কেনা বন্ধ করলেন একটু বড় ব্যবসায়ীরা। ব্যবসা মার খেল। ঠিক কত ব্যবসা গুটিয়ে গেছে সেই পরিসংখ্যান কারও পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন দেশের ৯৭ শতাংশ এমএসএমই এখনও অসংগঠিত বলে মনে করা হয়।
নগদ টাকায় যেখানে কেনাবেচা হয়, সেখানে সমস্যা সবচেয়ে বেশি। তাঁদের অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের মতো, পাসপোর্ট-ভিসা কিছুই নেই (অন্তত তাঁদের হাতে)।
বিমুদ্রাকরণ এবং পণ্য ও পরিষেবা কর চালু হওয়ায় সমস্যায় পড়েছিল দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (রয়টার্স)
বিশ্বের বহু দেশেই নিয়মিত ভাবে বিমুদ্রাকরণ হয়ে থাকে টাকাপয়সা জাল হওয়া আটকাতে। তবে সেই সব দেশের লোকজন তা জানেন বলে টাকা নিজের কাছে না রেখে ব্যাঙ্কে রাখেন। খরচের বেশিরভাগই করেন কার্ডের মাধ্যমে বা অনলাইন। আমাদের দেশ সেই জায়গায় পৌঁছাতে দেরি আছে। তাই বিমুদ্রাকরণের সুফল যাই হোক, এমএসএমই ক্ষেত্রের কাছে তা যে বড় মাপের আঘাত ছিল, সে কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সোনা নিয়ে অবাস্তব কয়েকটি পরিকল্পনা ও ঘোষণা দিনের শেষে অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে। সরকারের অর্থমন্ত্রীর অদূরদর্শিতার জন্য দেশের স্বর্ণশিল্পে সমস্যা কাটতেই চাইছে না।
দু’বছর পরে সেই দীপাবলিকেই বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী, এই ক্ষেত্রের মন জয় করার জন্য। এই ক্ষেত্রের জন্য বারোটি বড় মাপের ঘোষণা করলেন।
১। পোর্টালের মাধ্যমে মাত্র ৫৯ মিনিটে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ মঞ্জুর হচ্ছে, এর সুফল ইতিমধ্যেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পেতে শুরু করেছেন বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
২। যে সব সংস্থা জিএসটিতে রেজিস্টার্ড তাদের জন্য অতিরিক্ত ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের সুদের উপরে ২ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। শুভ উদ্যোগ। সবে জিএসটি-রেজিস্ট্রিকৃত সংস্থার জন্যই এই সুবিধা। নিয়ম অনুযায়ী যে সব সংস্থা জিএসটি-রেজিস্ট্রিকৃত নয়, তাদের এই সুবিধা প্রয়োজন হওয়ার কথাও নয়।
৩। শুধুমাত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে সুদের পুনর্গঠন হবে এবং রপ্তানি করার পরে সেই ছাড় ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হবে। মার্কিন ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম পড়ে যাওয়ায় রপ্তানিতারীদের সুবিধা হওয়ার কথা। তবে যে সব দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে সেই সব দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিশেষ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
দীর্গমেয়াদে লাভই হবে স্বল্পপুঁজির প্রতিষ্ঠানগুলির, তবে এই ঘোষণায় শাসকদলের খুব একটা লাভ হবে না (পিটিআই)
৪। যে সব সংস্থার বার্ষিক লেনদেন ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি সেই সব সংস্থাকে ট্রেড রিসিভেবল ই-ডিসকাউন্ট সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এর ফলে টাকার জোগানে অভাব হবে না ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলির।
৫। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে প্রয়োজনের ২৫ শতাংশ সংগ্রহ করতে হবে এমএসএমইগুলি থেকে। আগে তা ছিল ২০ শতাংশ। তবে সাধারণত মাঝারি মাপের সংস্থা, যারা অনলাইন ব্যবস্থায় নথিভুক্ত, বাস্তবে তারাই এই সুবিধা পেয়ে থাকে। কুটিরশিল্পগুলির কোনও সুবিধা এতে হবে বলে মনে হয় না।
৬। মহিলা উদ্যোগের থেকে অন্তত ৩ শতাংশ সংগ্রহ করতে হবে। মহিলাদের নামে রেজিস্ট্রিকৃত প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পাবে। তেমন সংস্থা কত আছে তা পর্যালোচনা করা দরকার।
৭। গভর্নমেন্ট ই-মার্কেটপ্লেস (জেম)-এ সব প্রতিষ্ঠানের নথিভুক্তি বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। এর ফলে ছোট-বড় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান অভিন্ন বাজার পাবে, সুষ্ঠ প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পাবে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলি। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রক্রিয়ার সুফল যে মিলবে কোনও সন্দেহ নেই, তবে এখনি এর থেকে কোনও সুবিধা কেউ পাবেন না। অন্তত ভোটের আগে শাসকদলের কোনও সুবিধা হবে না।
৮। এমএসএমইগুলিকে আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী যে ৬০০০ কোটি টাকা ঘোষণা করেছেন তাতে সার্বিক ভাবে লাভ হবে, তবে একবারে তৃণমূল স্তরের উদ্যোগের কোনও লাভ হবে না। দেশজুড়ে যে ২০,০০০ তালুক ১০০টি টুলরুমের কথা প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন তা সম্ভবত ২০২৪ সালের কথা ভেবে। যদি বিজেপি আবার ক্ষমতায় আসে তা হলে তারা যদি এর ২৫ শতাংশও বাস্তবায়িত করতে পারে দেশের আর্থিক বৃদ্ধি ঘটবে।
মোট কর্মসংস্থানের নিরিখে কৃষির পরেই রয়েছে এই ক্ষেত্র। তাই এই ক্ষেত্রের সার্বিক উন্নতি ঘটলে তা নিঃসন্দেহে দেশের আর্থিক বৃদ্ধি ঘটাবে।
৯। ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করার জন্য এমএসএমইগুলিকে সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এই ক্ষেত্রে যে সংস্কার তিনি ঘটাচ্ছেন তা থেকে ওষুধ প্রস্তুতকারী ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোগগুলির লাভ বলে মনে করছে সরকার
১০। পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র আরও সহজে পাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এতে সংস্থাগুলি প্রাথমিক ভাবে সুবিধা পেলেও পরে অন্য কোনও সরকার পরিবেশ নিয়ে মাত্রাছাড়া কড়াকড়ি করলে তখন কঠিন সমস্যার মুখে পড়তে পারে সংস্থাগুলি।
মোদী সরকারের পরিবেশমন্ত্রীর নাম জিজ্ঞাসা করা হলে অনেকেই হোঁচট খেতে পারেন, কিন্তু পরিবেশের জন্য একের পর প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া ইউপিএ সরকারের পরিবেশরমন্ত্রী জয়রাম রমেশের নাম অনেক দিন লোকের মনে থাকবে। এখন যাঁরা সেল্ফ সার্টিফিকেশনের সুবিধা নেবেন পরে যে তাঁরা সমস্যায় পড়বেন না এমন কথা কোনও নীতিনির্ধারকই দিতে পারবেন না।
১১। আটটি শ্রমআইন ও ১০টি কেন্দ্রীয় রুলের প্রেক্ষিতে একটি মাত্র রিটার্ন এমএসএমইগুলিকে দিতে হবে বলে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
মহিলা পরিচালিত সংস্থাগুলির উপরে বাড়তি নজর দিয়েছে সরকার (রয়টার্স)
১২। এমএসএমইগুলির আইনি প্রক্রিয়া সরল করতে সরকার কোম্পানি আইন বদল করবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
২০১৮ সালের আর্থিক বাজেটে এমএসএমই ক্ষেত্রের জন্য কর্পোরেট কর ৩০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ কমিয়ে ২৫ শতাংশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। বিমুদ্রাকরণ এবং পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) চালুর জন্য এই ক্ষেত্রটি যে ক্ষতির মুখে পড়েছিল সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতেই যে সব সংস্থার বার্ষিক লেনদেন ২৫০ কোটি টাকার কম তাদের জন্য এই ছাড় ঘোষণা হয়েছিল।
নোটবন্দির সুফল যদি থাকে তা সরাসরি সাধারণ মানুষ ভোগ করেননি। পণ্য ও পরিষেবা কর চালু হওয়ার পরে জিনিসপত্রের দাম বেশ কিছুটা কমলেও সার্বিক ভাবে মূল্যবৃদ্ধির জন্য ক্রেতারা তা বুঝতেই পারেননি। কোনও জিনিসের দাম হয়তো জিএসটির জন্য ২ শতাংশ কমেছে, কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির জন্য ৪ শতাংশ বেড়েছে। ক্রেতারা মনে করছেন দাম বেড়েছে ২ শতাংশ। তাই বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে জিএসটির সুফল জনমানসে তুলে ধরতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
একই ভাবে সরকার দীর্ঘ মেয়াদের কথা ভেবে পদক্ষেপ করায় তাতে লাভ হবে উদ্যোগীদের। কিন্তু আসন্ন ভোটে তা বিমুদ্রাকরণের ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, বিশেষ করে সংবাদমাধ্যম যখন এ নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করছে না।

