মোদী-মমতা এক হলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই
২০১৯ নির্বাচনের আগে হন্যে হয়ে জোট-বন্ধু খুঁজছে বিজেপি
- Total Shares
সপ্তাহ জুড়ে চমকপ্রদ ঘটনার কোনও ঘাটতি ছিল না। কর্নাটকে যে ভাবে বিজেপি বিরোধী দলগুলো একজোট হল, তাতে মনে হয়েছিল যে নরেন্দ্র মোদী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার থেকে পাশাপাশি আসনে বসতে অস্বস্তি বোধ করবেন। কিন্তু শান্তিনিকেতনে এই আশঙ্কা ম্লান হয়ে গেল। মঞ্চে বা মঞ্চের পিছনে এই দুই নেতাকে একসঙ্গে বেশ স্বাভাবিক থাকতেই দেখা গেল।
মমতা মোদীকে উত্তরীয় ও হলুদ ফুল উপহার দিয়ে স্বাগত জানালেন। এর আগে মোদী কিছুটা দূরে রাজ্যের বিজেপি নেতাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মমতাকে স্বাগত জানানোর ভঙ্গিমায় দেখতে পেয়েই তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে তৃণমূল নেত্রীর দিকে এগিয়ে গেলেন। হেলিপ্যাড তখন বেশ কর্দমাক্ত ছিল। তাই দেখে মোদী মমতাকে সাবধানে হাঁটবার পরামর্শও দিলেন।
এর পর শেখ হাসিনার সঙ্গে মোদী যখন বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করছিলেন তখন মোদী নিজে থেকেই মমতাকে মঞ্চে ডেকে নিলেন যাতে মমতা দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হতে পারেন। ফটো সেশনের একটা সময় রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর পিছনে আড়াল হয়ে যাচ্ছিলেন মোদী। সেই সময় মমতা কনুই দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে রাজ্যপালকে সামান্য সরিয়ে দিলেন যাতে ছবিতে মোদীকে পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়।
মাত্র কয়েকদিন আগেই জ্বালানির দামবৃদ্ধি নিয়ে মোদীকে রীতিমত তুলোধোনা করেছিলেন মমতা। মমতা এও দাবি করেছিলেন যে বিশ্বভারতীর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মোদী দেশিকোত্তম পুরস্কার প্রদান না করার অন্যতম কারণ 'পদক তালিকায় একজন তৃণমূল নেতাও রয়েছেন'। বাংলায় নামার কয়েক মুহূর্ত আগেও মোদীর সবচাইতে বড় সমালোচক ছিলেন মমতা। অনুষ্ঠানের দিনও টানটান উত্তেজনার মাঝে শান্তিনিকেতন জুড়ে দু'দলেরই পতাকা উড়ছিল।
মোদী মমতাকে মঞ্চে ডেকে নিলেন যাতে মমতা দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হতে পারেন
দলীয় নেতাদের ভিড় দেখে খুশিতে ডগমগ ছিলেন মমতা। উল্টোদিকে, বিজেপির পক্ষ থেকে এক ঝাঁক সমর্থককে ট্রাকে চড়িয়ে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসা হয়েছিল। সকলেই আশা করেছিল যে এই উত্তেজক পরিস্থিতির মধ্যে কিছু একটা ঘটবেই। কিন্তু বাস্তবে একেবারে অন্যরকম ঘটনা ঘটল। অনুষ্ঠান মঞ্চে দুই নেতা কিন্তু শত্রু নয়, বরঞ্চ পরম মিত্র হিসেবে মিলিত হলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে রাজনৈতিক সৌজন্য হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। কিন্তু দু'জনের মধ্যে যে কেমিস্ট্রি লক্ষ করা গেল তা সৌজন্যতার থেকেও বেশি। বিশ্বাস করতে পারেন, শান্তিনিকেতনের অনুষ্ঠানের মাত্র দু'দিন আগেই মমতা সমগ্র ভারত জুড়ে বিজেপি বিরোধী নেতাদের একজোট হওয়ার জন্য তদবির করছিলেন।
শান্তিনিকেতনে মোদী-মমতার কেমিস্ট্রি বামপন্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিল। বহুদিন ধরেই মোদী-মমতার 'গোপন আঁতাত' নিয়ে সরব ছিলেন বামপন্থীরা।
কিছুদিন আগেই মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশতবর্ষ নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মমতা। যে বৈঠকটি পরিচালনা করেছিলেন স্বয়ং মোদী।
এর পরও মোদী যখন পঞ্চায়েত ভোটে হিংস্রতা নিয়ে শাসক দলের বিরুদ্ধে সরব হলেন, তখন মমতা কিন্তু সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করেননি। বরঞ্চ, তিনি বলেছিলেন যে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে।
মোদী-মমতা কি আবার জোট বাঁধবেন
তাহলে, এই দু'জনের মধ্যে সম্পর্কটা আদতে কেমন? দু'জনের মধ্যে কি কোনও রকম ছায়া-যুদ্ধ চলছে? গত ছ'মাস ধরে ইউপিএ সংসদে যে সমস্ত সরকার-বিরোধী ইস্যু উত্থাপন করেছে তার একটিতেও তৃণমূল সাংসদরা অংশগ্রহণ করেননি। শুধুমাত্র জনসভা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এনডিএর বিরোধিতা করে গেছেন মমতা।
সিপিএম নেতা রবিন দেব জানিয়েছেন, "একটা স্ট্রাটেজি নেওয়া হয়েছে যাতে ধর্মীয় ভোটব্যাঙ্কের সুবিধা বিজেপিকে পাইয়ে দিয়ে তাদের আসন সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া যায়। মমতা যদি সত্যি সৎ হতেন তাহলে তাঁর দলের অনেকেরই এখন সিবিআই হেপাজতে থাকার কথা।"
বিজেপি নেতা কৈলাশ বিজয়বর্গীয়ও হুমকি দিয়েছেন পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর রাজ্যের অনেক মন্ত্রীকেই জেলে পাঠানো হবে। কিন্তু তা যে পুরোটাই ফাঁকা আওয়াজ ছিল তা এতদিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। গত এক মাস ধরে সিবিআই ও ইডির তদন্তগুলোর খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেই সমন পাঠানো বা আটক করাও হয়নি।
আসলে, বিজেপিও এই মুহূর্তে মমতাকে চটাতে চাইছে না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০১৯ নির্বাচনে বেশ কিছু আসন হারাবে বিজেপি। এই পরিস্থিতিতে বিজেপির নতুন জোটের প্রয়োজন। বরং, বলা ভালো, বিজেপির বেশ কিছু 'শত্রু ছদ্মবেশী' বন্ধুর প্রয়োজন।ইউপিএকে বাইরে রেখে এনডিএর বিরুদ্ধে একটি ফেডেরাল ফ্রন্ট গঠন করবার কথা উঠছে। এতে অবশ্য বিজেপিরই সুবিধা হবে। ইউপিএ জোট ও ফেডারেল জোটের ভোট ভাগ হলে তা থেকে এনডিএই লাভবান হবে।
বর্তমানে চিত্রটা যথেষ্ট গোলমেলে। বন্ধু শত্রুর বিভেদ মুছে যাচ্ছে। বিএসপি নেত্রী মায়াবতী ইতিমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে মহাগঠবন্ধন হলে সমাজবাদী পার্টি কোনও গোপন আঁতাতে সামিল হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকেও তো 'একের বিরুদ্ধে এক' ফর্মুলার কথা বলা হয়েছে। খুব সাবধানে হিসেবে-নিকেশও চলছে। আর, এই পরিস্থিতিতেই দুই শত্রুর বন্ধুর বেশে আবির্ভাব ঘটল।
(সৌজন্যে: মেল টুডে)
লেখাটা পড়ুন ইংরেজিতে

