সংসদে অনাস্থা ও ধর্মতলায় শহিদ দিবস: বিরোধী ঐক্য কোন পথে?
জাতীয় রাজনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতি এক নয়
- Total Shares
২০ জুলাই সংসদের ভিতর রাহুল গান্ধী, ২১ জুলাই কলকাতার রাস্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধী রাজনীতিকে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে সুসংহত করতে ব্যাপক প্রয়াস দেখল ভারত। ২০১৯ সালের নির্বাচন যে কঠিন চ্যালেঞ্জ, এ বিষয়ে দেশের বর্তমান শাসকদলের মনে কোনও সন্দেহ আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শাসক এবং বিরোধীপক্ষ কেমন ভাবে তাঁদের ঘুঁটি সাজাবেন এবং দেশের মানুষ ঠিক কোন মনস্তত্ত্বকে গুরুত্ব দিয়ে ইভিএমের বোতাম টিপবেন।
শহিদ দিবসের জনসভায় বলছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (সুবীর হালদার)
২০ জুলাই এবং ২১ জুলাইয়ের ঘটনাক্রম একটা বিষয়কে নিশ্চিত করেছে: বিরোধীপক্ষ এই মুহূ্র্তে একটা চরম সঙ্কটের মধ্যে রেয়েছে। প্রথম সঙ্কট অবশ্যই নেতৃত্বের এবং দ্বিতীয় সঙ্কট-- কোন দর্শনের ভিত্তিতে শাসকদলের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানালে ভোটদাতাদের মন জয় করা যাবে। ২০ জুলাই সংসদ একটা বিষয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে যে আঞ্চলিক রাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় বহমান। সেটাকে আরও নিশ্চিত করেছে ২১ জুলাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভা।
সংসদের অনাস্থা প্রস্তাব দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। স্বাভাবিক ভাবেই বিরোধীপক্ষের আক্রমণের দিশা হওয়া উচিৎ ছিল সরকারের জাতীয় নীতির ব্যর্থতার চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু সেই অনাস্থা প্রস্তাবের বিতর্ক শুরু হয়েছে নিছক আঞ্চলিকতাবাদের তরজা দিয়ে। আর তারই প্রতিফলন ২১ জুলাই তৃণমূল কংগ্রেসের জনসভায় পরিলক্ষিত হয়েছে।
তেলুগু দেশম ব্যস্ত থেকেছে অন্ধ্রপ্রদেশে তার সমর্থনের ভিতকে বাঁচিয়ে রাখতে। ধর্মতলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যস্ত থেকেছেন পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসন দখলের স্বপ্নকে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। মমতার উচ্চাশার সঙ্গী মায়াবতীর মতো আঞ্চলিক নেত্রী, অখিলেশের মতো আঞ্চলিক নেতা অথবা অপরাধী হিসাবে প্রমাণিত হওয়া লালুপ্রসাদ যাদবের মতো আঞ্চলিক চরিত্র। এই আঞ্চলিক বিজেপি হঠাও স্লোগানের মাঝখানে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী বিরোধীশক্তির একটি জাতীয় চরিত্র খাড়া করবার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তাঁর দল এবং তাঁর ব্যক্তিগত নেতৃত্বে। এই সংঘাতের উপরে বিজেপি নেতৃত্ব যে নজর রাখছে না, তা মোটেই নয়।
প্রধানমন্ত্রীকে আলিঙ্গন করছেন রাহুল গান্ধী (রাজ্যসভা টিভি)
বিজেপির কৌশল নির্ধারকরা সংসদের ভিতরে প্রথমচোটে তেলাঙ্গনার চন্দ্রশেখর রাওয়ের মতো নেতাকে বিপরীতমুখী করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, যে চন্দ্রশেখর রাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ভরসাস্থল ছিলেন।
বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে অবশ্যই চেষ্টা থাকবে ২০১৯ সালের নির্বাচনের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু তাঁদের ইচ্ছামতো নির্ধারিত হবে। এই প্রচেষ্টায় তাঁরা এখনও পর্যন্ত সফল। কংগ্রেস থেকে আঞ্চলিক দল, প্রত্যেকেই বিজেপিকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে বিজেপিরই ফেলে আসা চটিতে পা গলাচ্ছে। সারা দেশ ব্যাপী তামাম বিরোধীপক্ষ নিজেদের এখন হিন্দু প্রমাণে ব্যস্ত।
এটা ঠিক যে ২০ জুলাই সংসদের ভিতরে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কংগ্রেস সভাপতির শারীরিক ব্যবহার কংগ্রেস দার্শনিক ভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টায় উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে যে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ সংসদের ভিতরে রাহুল প্রকট করেছেন, তার মধ্যে গাম্ভীর্য এবং বৌদ্ধিক উৎকর্ষের প্রকাশ ঘটেছে কতটুকু এবং কতটুকুই বা নিছক ছ্যাবলামো?
About that hug and a wink!High points of Rahul Gandhi's speech#ITPhotoblog #NoConfidenceMotion@RahulGandhi @narendramodi pic.twitter.com/gF46pPSI26
— India Today (@IndiaToday) July 20, 2018
বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার বদনাম বহু পুরোনো। এই বদনামকে ঘাড়ে রেখেই ২ থেকে ২৮২তে পৌঁছেছিল বিজেপি। এই একই বদনাম গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে নরেন্দ্র মোদীকে। নিশ্চিত ভাবে বিরোধীপক্ষ এই একই বদনামকে হাতিয়ার করে ২০১৯ সালের নির্বাচন মোকাবিলার চেষ্টা করে তা হলে জনমত কতটুকু সহায়ক হবে সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু এটাও ঠিক, যে সাইনিং ইন্ডিয়ার মতো আচ্ছে দিনের স্বপ্ন ব্যাপক প্রতিবর্তক্রিয়া তৈরি করেছে দেশের একটা বিশাল সংখ্যক মানুষের মনে।
বিজেপির নীতি নির্ধারকদের এখন প্রবল চেষ্টা যে এই আচ্ছে দিন-এর শব্দবন্ধনী থেকে ভারতের মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে। বিরোধী পক্ষেরও নিশ্চিত ভাবে চেষ্টা থাকা উচিৎ যে এই আচ্ছে দিন-এর শব্দবন্ধনীর জ্বালায় দেশবাসীকে আরও বেশি করে মোহ ভঙ্গের মধ্যে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা। আগামী ৭-৮ মাস এই কৌশলী রাজনীতি তুঙ্গে উঠবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জানুয়ারি মাসের ব্রিগেড প্যারেড জনসভার মতো হয়তো দেশের অন্যান্য প্রান্তে আরও বেশ কয়েকটি জনসভা হবে। দেশবাসীর নজর থাকবে এই জাতীয় জনসভাগুলিতে হাজির থাকা নেতৃত্বের চেহারাগুলির দিকে। এবং সবার শেষে দিন যত এগিয়ে আসবে মানুষের নজর থাকবে বিরোধীপক্ষের আসন সমঝোতার প্রকৃত চেহারাটির দিকে। এবং বিজেপিরও অবশ্যই চেষ্টা থাকবে বিরোধীপক্ষের যে কোনও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসকে ভেঙে দিতে।

