দশম শ্রেণীর পুনর্মূল্যায়ন: টুজি কেলেঙ্কারির মতো প্রশ্নপত্র ফাঁস কি আদৌ হয়নি?

শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বোর্ড যে প্রহসন করেছে, তা মানা যায় না

 |  4-minute read |   05-04-2018
  • Total Shares

২৮ মার্চ দশম শ্রেণীর গণিতের যে পরীক্ষাটি হয়েছিল তার পুনর্মূল্যায়ন হবে বলে জানায় সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)। কিন্তু ৩ এপ্রিল বুধবার বোর্ড আবার জানায় যে দশম শ্রেণীর গণিতের পরীক্ষা হচ্ছে না

"সবকটি পরীক্ষার খাতা খুঁটিয়ে দেখার পর বোর্ড এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেলেও সেটা পরীক্ষার উপর তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।" তাই বোর্ড জানিয়েছে যে দশম শ্রেণীর গণিতের পুনর্মূল্যায়ণের প্রয়োজন নেই। যদিও পরীক্ষার খাতা "খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে" বলতে বোর্ড ঠিক কী বোঝানোর চেষ্টা করেছে, সেটা খুব একটা পরিষ্কার নয়।

cbse_body_040518052640.jpg

খাতাগুলো যদি ভালো ভাবে বিশ্লেষণ করেও দেখা হয় তা হলে এটা কী ভাবে বোঝা সম্ভব হবে যে একজন ছাত্রী যে সবকটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েছে সে আগে থেকেই পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসবে সেটা জানত। নাকি সে পরীক্ষার জন্য খুব ভালো ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল বলে সবক’টা প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর দিতে পেরেছে?

তা হলে যে সব পরীক্ষার্থী ভুল উত্তর দিয়েছে তাদের খাতা দেখে বোর্ড কি এই সিদ্ধান্তই উপনীত হচ্ছে যে এরা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পায়নি বলেই ঠিক উত্তর দিতে পারেনি?

নাকি সিবিএসই হটাৎই কোন ঐশ্বরিক শক্তি বলে দেখতে পেয়েছে যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও পরীক্ষার্থীদের হাতে সেই প্রশ্ন পৌঁছয়নি? নাকি টুজি কেলেঙ্কারির মতো প্রশ্নপত্র আদৌ ফাঁস হয়নি?আমরা কিছুই জানি না। কিন্তু সিবিএসই বলছে তারা জানে। যদিও সম্প্রতি যে সব ঘটনা ঘটেছে তাতে সিবিএসই-র উপর আর ভরসা করা যায় না। তবুও ভরসা করা ছাড়া কোনও উপায়ও নেই।শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বোর্ড যে প্রহসন করেছে তা মানা যায় না।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে গেলে দশম শ্রেণীর ফলাফলের প্রয়োজন হয় না, তাই শিক্ষা ব্যবস্থার উপযুক্ত বিবেচনার অভাবের জন্য যে চাপ পড়ছে, সেটাকেই একটু কমানোর জন্য দশম শ্রেণীর পুনর্মূল্যায়ন বাতিল করা হয়েছে। যদিও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ভর্তি হতে গেলে দশম শ্রেণীর ফলাফলের দরকারি।

সিবিএসই যদি সবকটা পরীক্ষার খাতা খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করার পর পুনর্মূল্যায়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিত, তা ঠিক কী হয়েছে সেটা স্বীকার করে নিত, তাহলে হয়ত নিয়ামক বোর্ডের প্রতি যে স্বাভাবিক শ্রদ্ধা সকলের থাকে, সিবিএসই-র প্রতিও সেই শ্রদ্ধাটাই বজায় থাকত।

প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব ও সততাকে প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।

ঘটনাটা মনে করে দেখুন।

প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর বলেন যে শুধুমাত্র দিল্লি ও হরিয়ানায় আবার দশম শ্রেণীর গণিতের পরীক্ষা নেওয়া হবে। তাহলে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে কি না বোর্ড সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রীকে কে বা করা কোন কোন জায়গায় পুনর্মূল্যায়ন হবে সে কথা বললেন?

ছোটছোট ছাত্রছাত্রীর যে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে সেটা কী ভাবে সমর্থনযোগ্য হতে পারে? হ্যাঁ, এ যুগে পরীক্ষার জন্য ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট মানসিক চাপে থাকে।

প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা সিবিএসই-র ভুলভ্রান্তিগুলো প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। বোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন গ্রুপে চাউর হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, বাজারে এই প্রশ্ন কিনতেও পাওয়া যাচ্ছিল। এই খবরটা বোর্ডের কাছে থাকা সত্ত্বেও তারা কিছুই করেনি। প্রশ্ন ফাঁসের খবর চাউর হওয়ার পর একজন সিবিএসই আধিকারিককেও অফিস দেখতে পাওয়া যায়নি তখন। তাঁরা পরীক্ষার্থীদের চরম উৎকণ্ঠা ও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজেরা সপ্তাহের শেষে লম্বা ছুটি কাটাতে চলে যান। পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনও রকম খবরের জন্য চ্যানেলগুলোর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনও গতি ছিল না পরীক্ষার্থীদের।

এরপর বোর্ড জানায় যে দশম শ্রেণীর গণিত ও দ্বাদশ শ্রেণীর অর্থনীতির পরীক্ষা আবার নেওয়া হবে। এখন আবার তারা বলছে যে দশম শ্রেণীর গণিত পরীক্ষা নতুন করে নেওয়া হচ্ছে না। সূত্র থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন বলছে, "প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কিনা ধরার জন্য উত্তরপত্রের চুল চেরা বিশ্লেষণ করা হবে ও দেখা হবে কোনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্য বিষয়ের তুলনায় অনেকে অনেকটা বেশি নম্বর কেউ পেয়েছে কিনা। তখনই বোঝা যাবে পরীক্ষার আগে সেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছে গেছে কী না। একজন হয়ত তার স্কুলের পরীক্ষায় খুব একটা ভালো ফল করেনি কিন্তু দেখা গেল, সেই-ই বোর্ড পরীক্ষায় কোনও একটি বিষয়ে খুব ভালো ফল করেছে, তখনই আমরা ওই পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র আরও ভালোভাবে নিরীক্ষণ করব।"

cbse_body2_040518053211.jpg

কিন্তু যদি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে প্রশ্ন ফাঁসের জন্য ছাত্রছাত্রীদের একাংশের ফায়দা হয়েছে? তখন কী হবে জানি না। আমার বিশ্বাস তখন কী হবে সেটা বোর্ডেরও জানা নেই।

কিছু সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর দাবি যে সিবিএসই পরীক্ষার আগে শুধু মাত্র গণিত ও অর্থনীতিই নয়, সবক’টি বিষয়ের প্রশ্নই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ব্যাপারটা স্বীকার করতে হলে সিবিএসই-কে খুব লজ্জার মুখে পড়তে হবে। যদিও সিবিএসই-র নিজেদের সম্বন্ধে গর্বিত হওয়ার তেমন কোনও কারণ নেই। এবং তা প্রমাণ করার অপেক্ষা রাখে না।

শুধু মাত্র প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাটাই নয়, সিবিএসই-র অকর্মণ্যতার আরও অনেক প্রমাণও আছে। কেরলের কোট্টায়মে ২৮ মার্চ পরীক্ষা দেওয়ার সময় দশম শ্রেণীর এক ছাত্রী লক্ষ করে যে পরীক্ষায় তাকে ২০১৬ সালের গণিতের প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে অমিয়া সালিম যখন তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে প্রশ্নপত্র নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন সে এই ব্যাপারটা লক্ষ করে।ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সিবিএসই-র এহেন পরিহাস অত্যন্ত দুঃখজনক।

এ বছর দশম ও দ্বাদশ শ্রেণী মিলিয়ে আঠাশ লক্ষ মতো ছাত্রছাত্রী সিবিএসই পরীক্ষা দিয়েছে। এতজন পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, তাদের উদ্বেগ, ভাবনা এবং জীবনকে এতটা হালকা ভাবে বোর্ড দেখছে, এটা দেখে খুব ব্যথিত হচ্ছি।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

VANDANA VANDANA @vandana5

Author is a Delhi-based journalist.

Comment