পঞ্চায়েতের হাতে ব্যয় করার মতো অর্থ বেড়েছে, তাই বোর্ড দখলের জন্যে মরিয়া সকলেই

অথচ, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের যে নজির রয়েছে তা ভূ-ভারতে খুঁজে পাওয়া যাবে না

 |  4-minute read |   29-08-2018
  • Total Shares

শাসক দলের হাতে বিরোধী দলের প্রবীণ নেতা ও সাংসদরা মার খেয়েছেন। মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়েছে এক প্রবীণ নেতার। বিজেপি নেতাদের মারের বদলে পাল্টা মারের হুমকি। আর, নিভু নিভু সিপিএম কংগ্রেসের আদালতে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকা। এই আবহে আমাদের রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল।

কুড়ি হাজারের বেশি আসনে প্রতিদ্বন্ধিতা হয়নি। জার জের গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। মামলা চলায় পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন স্থগিত ছিল। চারদিন হল সুপ্রিম কোর্টে মামলা খারিজ হওয়ায় বোর্ড গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যার ফল জেলায় জেলায় রক্তপাত, চারদিনে ন'জনের মৃত্যু। ২০০৩ সাল থেকে এ রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে অবাধ রক্তপাতের সূচনা হয়। যা ২০১৮ সালে এসে বেলাগাম হয়ে উঠেছে। অথচ, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের যে নজির রয়েছে তা ভূ-ভারতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

১৯৭৭ সালে ভোটে জিতে মহাকরণে প্রবেশের আগে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, "বামফ্রন্ট সরকার শুধু মহাকরণ থেকে পরিচালিত হবে না। জেলায় জেলায় প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছবে।" এই লক্ষে ১৯৭৮ সালে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন করে বামফ্রন্ট সরকার। পশ্চিমবঙ্গ প্রথম রাজ্য যেখানে প্রথম সাফল্যের সঙ্গে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা কায়েম হয়। সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের ৬৫ শতাংশ মানুষই গ্রামবাংলায় বাস করতেন। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় গ্রামীণ বাংলাই ছিল এ রাজ্যের মূল ভিত্তি।আর, কৃষি ছিল মানুষের মূল জীবিকা।

body2_082918054311.jpgপঞ্চায়েত নির্বাচনেও ব্যাপক সন্ত্রাস দেখা গিয়েছিল [ছবি: পিটিআই]

পশ্চিমবঙ্গের এই বিশেষ চরিত্র এবং তেভাগা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা মাথায় নিয়ে মার্কসবাদী কমুনিস্ট পার্টি মন্ত্রিসভা গঠন করে ছিল। ৭৭ সালে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারে শিল্পদপ্তর ছিল শরিকদের হাতে। বড় শরিক সিপিএম ভূমি কৃষি গ্রামোন্নয়ন প্রভৃতি দপ্তরগুলি নিজের হাতে রেখে ছিল। সেই সময়ে গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মর্সূচির সফল রূপায়ণ করতে 'পাৰ্টি-লেশ ডেমোক্রেসি' বাতিল করে ১৯৭৮ সালে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিদ্বন্ধিতা করার রাস্তা খুলে দিয়েছিল জ্যোতি বসুর সরকার। সেই সরকার পঞ্চায়েত ভোটে জিতে গ্রামবাংলায় যে উন্নয়নের জোয়ার এনেছিল তা দেশ বিদেশের পন্ডিতদের কাছে গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল এ রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার ছিল। সেই আমলে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন পাস হয়। অনেক পন্ডিতই গবেষণায় দেখিয়েছেন আইন পাস করলেও সফল পঞ্চায়েতি রাজ গড়তে পারেনি তৎকালীন কংগ্রেস সরকার।

যেমন নিল ওয়েবস্টার বলেছেন, "পঞ্চায়েতকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেয়নি সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের সরকার। গ্রামীণ উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ অত্যন্ত কম ছিল। পাশাপাশি পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও ছিল না।"

প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের পঞ্চায়েতি ব্যবস্থায় এই দুর্বলতাগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। গ্রাম বাংলায় ভূমি সংস্কার, গরিবের হাতে জমি, বর্গাদার প্রথা, রাজ্যে জমি সম্পর্কের চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন এনেছিল। ভূস্বামীদের উদ্বৃত ও বেনামি জমি চিহ্নিত করে যে সমস্ত গরিব কৃষক অন্যের জমিতে চাষ করতেন তাদের হাতে তুলে দিয়ে ছিল সরকার। এর ফলে কৃষিতে ব্যাপক উৎপাদন বেড়েছিল। সামাজিক পরিবর্তনেরও চেহারাটা ছিল ব্যাপক। ভূস্বামী ও গ্রামীণ প্রভাবশালীদের সরিয়ে গরিব কৃষক, বর্গাদার ক্ষেত মজুর ও শিক্ষকরা পঞ্চায়েতে ক্ষমতা পেয়ে ছিলেন। প্রান্তিক মানুষের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা পৌছিয়ে ছিল।

গরিবি দূর করতে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুষম বন্টন দেখেছিল গ্রাম বাংলা। যার ফলে, মানুষের হাতে কাজ এবং তাদের সামাজিক সম্মান তৈরি হয়েছিল।

body1_082918054414.jpgনিভু নিভু কংগ্রেস আদালতে হত্যে দিয়ে পড়ে ছিল [ছবি: পিটিআই]

আটের দশকের প্রথম দিকে সল্টলেকে রাজীব গান্ধী পঞ্চায়েতি রাজ সম্মেলন করে ছিলেন। সেই সম্মেলনে তিনি পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার তুমুল প্রশংসা করে ছিলেন। জ্যোতি বসুরও অকুন্ঠ প্রশংসা করে ছিলেন। তার পরে এই বিষয় সাংবাদিকরা জ্যোতি বসুকে প্রশ্ন করলে জ্যোতি বসু বলে ছিলেন, "এই প্রশংসা আমাদের পার্টি এবং সরকারের প্রাপ্য। তবে এই সাফল্যের জন্যে যদি কোনও ব্যক্তির প্রশংসা করতে হয় তিনি হলেন বিনয় চৌধুরী।" জ্যোতি বসু, বিনয় চৌধুরী, হরেকৃষ্ণ কোঙারের এই সাফল্যের ভিতে দারোয়াই বামফ্রন্ট সরকারের শিখর মাটির গভীরে পৌছিয়ে ছিল।

রাজীব গান্ধীর আমল থেকে গ্রামোন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ বেড়ে ছিল। ফলে, পঞ্চায়েতের হাতে ব্যয় করার মতো অর্থ বেড়ে যায়। এই অর্থের যোগান এবং রাজনৈতিক দলের হাতে পঞ্চায়েতের ক্ষমতার ছিদ্রপথেই নয়ের দশক থেকে কালসাপ ঢুকতে শুরু করে। একদিকে কমুনিস্ট পার্টিতে সর্বস্ব পন করা নেতা কর্মীর সংখ্যা কমতে থাকে। অন্যদিকে, পার্টিতে ঢুকে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাঙিয়ে আখের গোছানোর আধিক্য বাড়তে থাকে।

নীতি আদর্শহীন, ক্ষমতা দখলকারী এই রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের ক্ষমতা দখলের লড়াইতে নির্বাচনে রক্ত ঝরাও শুরু হয়। এই রক্তাক্ত পথ ধরেই আজকের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী চালচিত্র এখানে এসে পৌঁছিয়েছে।

দেশের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্মরণ করা যেইতে পারে উমবের্তো একোর মন্তব্য। ক্রনিকলেস অফ আ লিকুইড সোসাইটি"-তে একো লিখেছেন, "The collapse of ideologist and political parties it has been suggested that political parties have become like taxis taken by vote controlling mob leaders or mafia bosses, who chose them casually, according to what is on offer - politicians can change party alligiance without creating any scandal. its not just people society itself is living in an incresingly precarious condition."

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

BISWAJIT BHATTACHARYA BISWAJIT BHATTACHARYA

Veteran journalist. Left critic. Political commentator.

Comment