ভোটে নিরাপত্তা: ভুল তথ্য যিনি দিয়েছেন আর যিনি মান্যতা দিয়েছেন, ক্ষতিপূরণ দেবেন তাঁরা
সাধারণ ভোটাররা ছাড়া আদালতের রায়ে কোনও পক্ষেরই উদ্বাহু হওয়ার কারণ নেই
- Total Shares
নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, আদালতের নয়। তাই ক’দিন আগে যে প্রতিষ্ঠানকে পক্ষপাতদুষ্ট বলেছিল আদালত, অবাধ, সুষ্ঠু ও হিংসা-হীন নির্বাচনের ব্যাপারে সেই রাজ্য নির্বাচন কমিশনকেই দায়িত্ব দিল তারা, মানে কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট।
তবে কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে ঘুম উড়তে পারে বেশ কয়েকজনের। কলকাতা হাইকোর্টের মুখ্য বিচারপতি জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য এ দিন বলেছেন, নির্বাচনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারে যাঁরা রিপোর্ট দিয়েছেন এবং রাজ্য নির্বাচন কমিশন, যিনি একে মান্যতা দিয়েছেন, ব্যক্তিগত ভাবে তাঁরাও দায়ী থাকবেন নিরাপত্তার ব্যাপারে।
কলকাতা হাইকোর্ট
এই রায়ে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হল ক্ষতিপূরণের ভার। নিরাপত্তার সার্বিক দায়িত্ব রাজ্যের উপরে থাকলেও, এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের উপরে সেই দায়িত্ব আরোপ করেছে আদালত। অর্থাৎ, ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সেই ব্যক্তির বেতন থেকে বা সম্পত্তি বিক্রি করে, যে ব্যক্তি নিরাপত্তার পর্যাপ্ত বলে ঘোষণা করছেন এবং সেই ঘোষণাকে মান্যতা দিয়েছেন। নিতান্তই তাঁর বেতন, অবসরকালীন সুবিধা ও সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ সম্ভব না হলে, তবেই রাজ্য সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে। এই রায়ের ফলে সরকারি আধিকারিকরা হয়ত শাসকদলের নির্দেশ মানার সময় নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যতের কথাটাও মাথায় রাখতে বাধ্য হবেন।
পঞ্চায়েত আইনে এখনও পর্যন্ত বিধিবদ্ধ নয় বলেই ই-মনোনয়নকে মান্যতা দেয়নি দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ই-মনোনয়নে মান্যতা না দেওয়ার অবশ্য অন্য কারণও আছে। ১৪ মে ভোটগ্রহণ হচ্ছে ধরে নিয়ে ব্যালট পেপার ছাপানো হয়ে গিয়েছে। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়া শুরুও করে দিয়েছেন ভোটকর্মীরা। ই-মনোনয়ন অন্তর্ভুক্ত করা মানে পুরো প্রক্রিয়াই অনেকটা পিছিয়ে যাবে, বিপুল টাকা জলে যাবে। তাই এ ব্যাপারে দীর্ঘ শুনানি করে সময় নষ্ট করতে চাননি দেশের প্রধান বিচারপতি।
গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভ বিজেপির
ভোটের তারিখ নিয়ে বৃহস্পতিবার কোনও কথাই কার্যত বলেনি কলকাতা হাইকোর্ট, তাই ১৪ মে ভোট করানোর ব্যাপারে কমিশনের কোনও আইনি বাধা নেই। ভোটে নিরাপত্তার বহর কেমন হবে সেই দায়িত্ব থাকে নির্বাচন কমিশনের উপরে। স্পর্শকাতর ও অতিস্পর্শকাতর বুথ চিহ্নিত করার দায়িত্ব থাকে তাদের উপরেই। কমিশন যদি আদালতে জানায় যে নির্বাচনে নিরাপত্তার বন্দোবস্ত নিয়ে তারা সন্তুষ্ট, তা হলে ভোটগ্রহণ না হওয়া পর্যন্ত আদালতেরও বোঝার কোনও উপায় নেই নিরাপত্তার আয়োজন পর্যাপ্ত কিনা। এ ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশনের বয়ানের উপরেই ভরসা করতে হবে আদালতকে। তবে নিরাপত্তা নিয়ে কলকাতা আদালতের রায়ের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে।
ই-মনোনয়নে মান্যতা সর্বোচ্চ আদালত না দিলেও, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যে সব আসনে প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, সেই সব আসনের ফল প্রকাশ করতে পারবে না নির্বাচন কমিশন। অর্থাৎ ৩ জুলাই সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি পর্যন্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাঁরা জয়ী হয়েছেন তাঁদের জয় নিয়ে সংশয় রয়ে গেল।
বিক্ষুব্ধ বিজেপি
এক কথায়, বিরোধীদের অনেক আবেদন-নিবেদনকে ব্যর্থ করে ১৪ মে ভোটগ্রহণে আপাতত কোনও বাধা রইল না রাজ্যের নির্বাচন কমিশনের সামনে, কিন্তু যে সব আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছে শাসকদল, সেই সব আসনে সরকারি ভাবে কোনও ফল প্রকাশ করতে পারবে না রাজ্য নির্বাচন কমিশন। তাই দুই আদালতের রায় যোগ করলে যা দাঁড়ায় তাতে কোনও পক্ষেরই (শাসকদল, বিরোধী ও নির্বাচন কমিশন) উদ্বাহু হওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং যে পক্ষপাতহীনতার কথা বলা হয়েছে, তাতে খুশি হতে পারে শুধুমাত্র আমজনতা।
ভোটে নিরাপত্তা বলতে কী বোঝায়, তা এ দিন স্পষ্ট হয়ে গেছে আদালতের রায়ে। নির্বাচকদের বুথে যাওয়া, বুথ থেকে ফেরা এমনকী নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরেও যাতে প্রত্যেকে সুরক্ষিত থাকেন—সবটা মিলিয়েই ভোটে সুরক্ষা।
সুপ্রিম কোর্ট
এই রায়ের পরে একমাত্র বিজেপিই সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বাকিদের প্রতিক্রিয়া অন্যরকম। সিপিএম বলছে, যে সব আসনে ভোট হয়নি একজন মাত্র লড়ছেন বলে, সেই সব আসনে ফল প্রকাশ করতে পারবে না নির্বাচন কমিশন। আর তৃণমূল বলছে, ওই ৩৪ শতাংশ আসনের প্রার্থীপদ বাতিল করেনি আদালত। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, ভোট গণনা নিয়ে। এ বার ভোট শেষ হওয়ার পরে বুথে বুথে ভোট গোনা হবে না। সিল করা ব্যালটবক্স চলে যাবে স্ট্রংরুমে। তবে কবে ভোট গোনা হবে, বিজ্ঞপ্তিতে সে কথা উল্লেখ করা হয়নি। রাজ্য নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই তারা এটা স্থির করেছে।

