সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে আরও বিপাকে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রাজ্যের শাসকদলের
প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় যাঁরা জয়ী হয়েছেন, এখন তাঁরাও আনন্দ করতে পারছেন না
- Total Shares
যে বিরোধী দলের অবস্থা সারা বছর পড়া না করে পরীক্ষা বসা পড়ুয়ার মতো, সেই বিরোধীদল, মানে পড়ুয়া যদি দু’চারটে বিষয়ে ভালো নম্বর পেয়ে যায় তখন তার কী ব্যাখ্যা হবে? টুকে পাস করার কোনও উপায় কিন্তু এখানে নেই।
যে সব আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছে শাসকদল, সেই সব আসনে আসনে বিরোধীরা প্রার্থীই খুঁজে পায়নি, এটাই শাসকদলের বক্তব্য। এমনটা হওয়ার একটা বড় কারণ হল রাজ্যের উন্নয়ন। যাঁরা গত পাঁচ বছর পঞ্চায়েতে উন্নয়ন দেখতেই পাননি, এখন তাঁদের কেউ কেউ বিরোধী দলের প্রার্থী হলেও প্রচার করছেন তৃণমূলের হয়ে, আচমকাই তাঁরা উন্নয়ন দেখতে পেয়েছেন। উন্নয়নের জোয়ারে ভোটগ্রহণ হওয়ার আগেই গ্রামপঞ্চায়েতে ৩৪.৫৬ শতাংশ আসনে জয়ী হয়েছে শাসকদল। পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদে এই হার যথাক্রমে ৩৩.১৯ ও ২৪.৬০ শতাংশ। কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় এবং মনোনয়ন পত্র জমা ও প্রত্যাহারের শেষ দিন পার হয়ে যাওয়ায় বহু প্রার্থী ইতিমধ্যেই জয়ের শংসাপত্র হাতে পেয়ে গিয়েছেন। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তাঁরা এখন আর আনন্দ করতে পারছেন না।
গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে সরব বিরোধীরা (ফাইল চিত্র)
এখনও পর্যন্ত কোনও বিধিবদ্ধ আইন নেই বলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ই-মনোনয়নে মান্যতা দেয়নি। কিন্তু যে সব আসনে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি, সেই সব আসনে ফলপ্রকাশ স্থগিত রাখায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক, উভয় দিকের বিচারেই সঙ্কটে পড়ছে রাজ্যের শাসকদল। দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালত কোনও প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেনি, শুধুমাত্র স্থগিতাদেশ দিয়েছে।
দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি ৩ জুলাই। সর্বোচ্চ আদালতে কী পরিস্থিতি হতে পারে দেখে নেওয়া যাক। রায় হয় দ্রুত হবে, না হয় বিলম্বিত। হয় একমাত্র প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা করা হবে, না হলে ভোট হবে।
যদি রায় দ্রুত হয়ে যায় এবং যে সব আসনে একজন মাত্র প্রার্থী আছে, তাদের জয়ী ঘোষণা করা হয়ে গেলে তাতে শাসকদলের জয়ই হবে। কোনও রকম প্রশাসনিক জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা সেখানে কম। রায় যদি বিলম্বিত হয় সে ক্ষেত্রে কী হবে সেটা নিয়ে এখন থেকেই উদ্বিগ্ন হতে পারে শাসকদল। আর দুটি ক্ষেত্রেই ঘর গোছানোর কিছুটা সময় পেয়ে যাবে বিরোধীরা।
রায় বিলম্বিত হলে, যে সব গ্রামপঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলাপরিষদে বোর্ড গঠন করা যাবে না, সেখানে প্রশাসক নিয়োগ করতে হবে। কারণ পঞ্চায়েত আইনে বর্তমান বোর্ডের মেয়াদ বাড়ানোর কোনও সংস্থান নেই। আগেও পঞ্চায়েত ও পুরসভায় প্রশাসক নিয়োগ করেছে রাজ্যের বর্তমান শাসক দল, কিন্তু তখন পরিস্থিতি আলাদা ছিল। এখন মামলার দায় যতই বিরোধীদের উপরে চাপানো হোক না কেন, লোকে বলছে, মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে শাসকদল ১০০ শতাংশ আসনে জেতার চেষ্টা না করলেই এই পরিস্থিতি এড়ানো যেত। তাই এ ক্ষেত্রে প্রশাসক নিয়োগ করার কারণ হবে আদালতের বিলম্বিত রায় নয়, শাসকদলের সন্ত্রাস ও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ। এ ক্ষেত্রে ভোট বিলম্বের জন্য তো বটেও, কোনও কারণে অচলাবস্থা তৈরি হলে শাসকদলকেই দায়ী করবে বিরোধীরা।
সর্বোচ্চ আদালতের রায় দ্রুত হোক বা বিলম্বিত, যদি নতুন করে এক বা দু’দিন মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, এবং কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে তা কিছুটাও অবাধ হয়, সে ক্ষেত্রে বিরোধীরা বেশ কয়েকটি আসনে প্রার্থী দিতে পারবে। যেখানে প্রার্থী দিতে পারবে না, এ বার সেখানে ই-মনোনয়ন দেবে এবার দরকারে নতুন করে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবে। প্রার্থী দেওয়া মানেই ভোট। ভোট মানে যদি শাসকদলের সন্ত্রাসও হয়, তা হলেও বিরোধীরা ততদিনে সেই সন্ত্রাস মোকাবিলায় কিছুটা হলেও প্রস্তুত হয়ে যাবে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পাশাপাশি কলকাতা হাইকোর্টের রায়ের একটি অংশ প্রশাসনকে মনে রাখতে হবে। কলকাতা হাইকোর্ট বলেছে, ‘ভোট যখনই হোক’ নিরাপত্তা দিতে হবে এবং ক্ষতিপূরণের কথাও তারা উল্লেখ করেছে। এর অর্থ, দ্বিতীয় দফায় ভোট হলেও একই রকম নিরাপত্তা দিতে হবে প্রশাসনকে। তাই তখনও নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনকে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটা আসন বিরোধীরা পেয়ে গেলে তখন শাসকদল কী বলবে?
সন্ত্রাসের ক্ষত এখনও দগদগে, উত্তর ২৪ পরগনায়
যে সব আসনে একাধিক প্রার্থী রয়েছে, সেই সব আসনে ভোট ১৪ মে, গণনা ১৭ মে। ভোট প্রক্রিয়া শেষ ২১ মে। মৃত্যুর কারণে ভোট হচ্ছে না ৯টি গ্রামপঞ্চায়েত, ১টি পঞ্চায়েত সমিতি ও ১টি জেলাপরিষদ আসনে। রাজ্যের ৪৮,৬৫০ আসনের মধ্যে ভোট হবে ৩১,৮৩৬ আসনে। রাজ্যের ৯২১৭ পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যে ভোট হবে ৬১৫৮ আসনে এবং ৮২৫টি জেলাপরিষদ আসনের মধ্যে ভোট হবে ৬২২টি আসনে। এই সব আসনে যদি বিরোধীরা টক্কর দিতে পারে শাসকদলকে এবং বেশ কয়েকটি জিতে তিন স্তরের বোর্ডেই শক্তিশালী বিরোধী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে, তা হলে শাসকদলের তাবড় নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়বে।
রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম রাজ্যের বিরোধীদের সঙ্গে তুলনা করেছেন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত না থাকা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। কিন্তু ভোটে বিরোধীরা যদি কয়েকটা আসনে জয়ী হয় এবং অর্ধেকের বেশি আসনে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হয়, তা হলে ২০১৯ সাল তো বটেই, ২০২১ সালের নির্বাচনের জন্যও বর্তমান শাসকদলের কাছে তা হবে অশনিসঙ্কেত।

