জোট রাজনীতিতে কংগ্রেস এখন কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে

বিজেপিকে সরাতে হলে দীর্ঘমেয়াদে কংগ্রেসকে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হবে?

 |  3-minute read |   27-07-2018
  • Total Shares

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর ইউপিএ শব্দটা তাকে তুলে রেখেছিল কংগ্রেস। অন্যদিকে, নির্বাচনে জেতার পর বিজেপিও এনডিএ শব্দটা ভুলে যেতে বসেছিল। এখন লোকসভা নির্বাচনের আগে দু'পক্ষই জোট রাজনীতিতে শান দিতে শুরু করেছে। গত চার বছরে যে দৃশ্য দেখা যায়নি সেই দৃশ্যই সামনে আসতে শুরু করেছে।

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহকে দেখা গেল জোটসঙ্গীকে তুষ্ট করতে মুম্বাইয়ের সেনা শিবির থেকে পাটনায় জেডিইউ-র নীতীশ কুমারের দরবারে দৌড়াদৌড়ি করছেন। এই অবস্থায় জোট রাজনীতিতে কংগ্রেস অবশ্য একটু এগিয়ে রয়েছে। চলতি বছরেই জোট রাজনীতির বার্তা দিয়ে কর্নাটকে এইচডি কুমারস্বামীর জেডিএস সরকারে জুনিয়র পার্টনার হয়েছে কংগ্রেস। উত্তরপ্রদেশে বিজেপিকে আটকাতে সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব-মায়াবতীর জোটকে অন্তরালে থেকে উৎসাহ দিয়েছে। এই সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তা হলেও ২০০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেসকে আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।

সম্প্রতি লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিল চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপি। চন্দ্রবাবুর সঙ্গে কংগ্রেসের মনোমালিন্য থাকলেও বিজেপিকে চাপে ফেলতে তড়িঘড়ি টিডিপির আনা অনাস্থা প্রস্তাবকে কংগ্রেস সমর্থন করেছিল। কংগ্রেসের লক্ষ ছিল অনাস্থা প্রস্তাবকে সামনে রেখে বিজেপি বিরোধী জোটকে ভাঙিয়ে নেওয়া। অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে আলোচনায় বক্তব্য বলার পর প্রধানমন্ত্রীকে আলিঙ্গন করে হইচই ফেলে দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। কিন্তু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে বিরোধী ঐক্যের চেহারাটা খুব মজবুত ভাবে অনাস্থা প্রস্তাবের দিন দেখা যায়নি লোকসভায়। সেদিন কংগ্রেস এবং বিরোধী দলের বক্তব্যের সুর ঐক্যের তারে বাঁধা ছিল না।

সেদিন এই দিকটাতেও নজর দেওয়া উচিৎ ছিল কংগ্রেসের। কংগ্রেসের মনে রাখা উচিৎ সংসদে তাদের আসন সংখ্যা এখন ৪৮ এবং তাদের দেশে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হিসাব শতাংশের নিরিখে ১৮ শতাংশ। আগামী লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস আসন সংখ্যা কিছুটা বাড়াতে পারলেও রাতারাতি নাটকীয় ভাবে খুব একটা পরিবর্তন হবে না। ফলে, ২০১৯ লোকসভায় বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হলে কংগ্রেসকে জোট রাজনীতিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

photo2_052518082009_072718075703.jpgকংগ্রেসকেও জোট সঙ্গীদের আস্থা জোগাতে হবে।

কংগ্রেস নিজেকে জাতীয় দল হিসেবে ভাবলেও বাস্তব হল, আদর্শগত ভাবে এবং নির্বাচনী লড়াইতে তারা একা বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করে বিশেষ কিছু লাভ করতে পারবে না। সম্প্রতি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি এই বোধোদয়ের বার্তাই দিয়েছে। জোট রাজনীতিতে কংগ্রেস কী ভাবে এগোবে তার দায়িত্ব দিয়েছে তাদের সভাপতিকেই দিয়েছে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী জোট সঙ্গীদের সঙ্গে কোন ফর্মুলায় এগোবেন তা তাঁকেই ঠিক করতে হবে।

লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাবের দিন প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সংসদে উপস্থিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবগৌড়াকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কী ভাবে কংগ্রেস তাঁর সরকারকে ফেলে দিয়েছিল। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পর্বান্তরে একের পর এক জোট সরকারের পতন হয়েছিল। দেবগৌড়া, চন্দ্র শেখর,  ইন্দর কুমার গুজরাল সরকারের পতনের পিছনে কংগ্রেসের আনা হাস্যকর কিছু অভিযোগ ছিল। পরিস্থিতি বুঝে এইচ ডি দেবগৌড়াকে সে কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে ততই বিজেপির এই সমস্ত অভিযোগের ডেসিবেল বাড়বে। কংগ্রেসকেও এই সব অভিযোগের উত্তরে জোট সঙ্গীদের আস্থা জোগাতে হবে। ফলে, শুধুমাত্র রাজ্যে রাজ্যে জোটসঙ্গীদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেই কংগ্রেসের কাজ শেষ হবে না। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস বলছে তিন দশক ধরে জোট রাজনীতি দেখার পর দু'বার জোট সরকার চালিয়েও কংগ্রেস জোট রাজনীতিতে খুব একটা স্বস্তি বোধ করে না। কংগ্রেস দলে এখনও অনেক প্রবীণ নেতাই মনে করেন আঞ্চলিক দলগুলি সব সময়ই সমস্যা তৈরি করে। বাস্তব যাই হোক না কেন, তাঁরা এখনও কংগ্রেসের সর্ব ভারতীয় দলের তকমা এবং সুপ্রাচীন ইতিহাসের ঘেরাটোপেই থাকতে ভালোবাসেন।

রাহুল গান্ধীকে সার্থক জোট রাজনীতি পথে চলতে হলে এ সব নেতাদেরও সামলাতে হবে। অনেক রাজ্যেই কংগ্রেসকে আঞ্চলিক দলের জুনিয়র পার্টনার হয়ে থাকতে হবে। দলের এই সব নেতাদের তেতো বড়ি কী ভাবে গেলাবেন তা রাহুলকেই ঠিক করতে হবে। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি যদি শুধুমাত্র কংগ্রেস সভাপতিকে জোট রাজনীতির পক্ষে দায়িত্ব দিয়েই সন্তুষ্ট না থাকেন, তাঁরা যদি পুরোনো ধ্যান ধারণা ছেড়ে বাস্তবকে স্বীকার করে নেন তা হলে রাহুল গান্ধীর কাজ কিছুটা সহজ হবে।

আরও একটা কথা কংগ্রেসকে মনে রাখতে হবে। যদি নির্বাচনী ফলাফলের অঙ্কে বিজেপিকে ঠেকাতে জোট সরকার তৈরি হয়, সে ক্ষেত্রেও কংগ্রেসকে অনেক সহনশীল থাকতে হবে। যদি দেবগৌড়াদের মতো সেই সরকারও পড়ে যায় তা হলে লাভবান হবে বিজেপি। তাই কংগ্রেসের উচিৎ জোট রাজনীতিকে শুধুমাত্র কৌশলী প্রয়োজন হিসেবে নয়,  দীর্ঘ মেয়াদি প্রয়োজনীয় অবস্থান হিসেবে দেখা।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

BISWAJIT BHATTACHARYA BISWAJIT BHATTACHARYA

Veteran journalist. Left critic. Political commentator.

Comment