রাহুল গান্ধী স্বাধিকার ভঙ্গ করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর আচরণ কেমন ছিল?
অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় কী ভাবে নিয়ম ভাঙলেন সাংসদরা
- Total Shares
সাংসদদের মান কি কমছে? বাদল অধিবেশনের শুরুতেই বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাবের বিতর্ক একটু মন দিয়ে দেখলে সেটি স্পষ্ট হয়ে যাবে। অনাস্থা আনা হয় মন্ত্রিপরিষদের বিরুদ্ধে। সেখানে সরকারের কাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন তাবড় বিরোধী নেতারা। সরকারকে সেই সব বিতর্কের জবাব দিতে হয়। তাই অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রথমবার অনাস্থায় হারার পরে লোকের মুখে একটাই কথা ঘুরত, সংখ্যায় হেরেছেন, তবে মানুষের মন জয় করেছেন বাজপেয়ী।
অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কে দেখা গেল, নিজেদের রাজ্যের কথা বলতে ব্যস্ত সাংসদরা। তাঁরা সংসদের বক্তৃতা করে খুশি করতে চান দলের শীর্ষ নেতাকে। চুলোয় যাক দেশের আইনসভা! দক্ষিণের সাংসদ বলছেন তাঁর রাজ্যের উন্নয়নের কথা, অন্ধ্রের সাংসদ বলছেন কেন তাঁদের রাজ্য থেকে বিজেপি মুছে যাবে, আর তৃণমূল সাংসদ বলছেন ধর্মতলায় শহিদ দিবসের কথা। এ প্রসঙ্গে উঠে আসতে বাধ্য রাহুল গান্ধীর দেশের নেতা হওয়ার পথে কতটা এগিয়েছেন।
রাহুলের ভুল
দীর্ঘদিনের সাংসদ এবং লোকসভায় প্রধান বিরোধী দলের সর্বভারতীয় সভাপতি তিনি। তাঁর বাবা রাজীব গান্ধী, ঠাকুমা ইন্দিরা গান্ধী ও ঠাকুমার বাবা জওহরলাল নেহরু দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বড় সময় ধরে। টানা দশবছর দেশের সরকার তাঁর পরিবারের অঙ্গুলিহেলনে চলেছে বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে। তিনি নিজে দীর্ঘদিনের সাংসদ। তার পরেও ফরাসি প্রেসিডেন্টকে নিয়ে এমন বেফাঁস মন্তব্য করে বসলেন যে দুটি দেশের তরফে বিবৃতি জারি করতে হল। সংসদে বিবৃতি দিতে হল দেশের বিদেশমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণকে। বিদেশমন্ত্রীর নাম করে তাঁকে আক্রমণ করেন বিনা নোটিসে।
সংসদে রাহুলের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বিবৃতি দিচ্ছেন উত্তেজিত সীতারমণ, বিবৃতি দিয়েছে ফ্রান্সও
সংসদে বলার আগে নিজেকে যথেষ্ট প্রস্তুত করেননি রাহুল গান্ধী। তাঁর বক্তৃতা শুনে মনে হয়, হোয়াটসঅ্যাপে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতির যে একাংশ দেখা যায়, তার উপরে ভরসা করেই তিনি জিএসটি নিয়ে সরকারকে খোঁচা দিতে গিয়েছেন, উল্টে দুই ইস্যুতেই তাঁকে জবাব হজম করতে হয়েছে। বেকারত্ব নিয়ে তিনি যে তত্ত্ব দিয়েছেন, সেটা যে মূলত সংগঠিত ক্ষেত্রের উপরে, সেটাও খেয়াল করেননি কংগ্রেস সভাপতি।
দীর্ঘদিনের সাংসদ হিসাবে রাহুল গান্ধীর জানা ও খেয়াল রাখা উচিৎ, সংসদের যিনি সদস্য নন, তাঁর নামে কিছু বলা যায় না। কোনও মন্ত্রী ও সাংসদেদর নামে নির্দিষ্ট অভিযোগ করতে হলে নোটিস দিতে হয় এবং জবাব দেওয়ার জন্য সময় দিতে হয়। বিতর্কিত কিছু বললে, বক্তব্যের শেষে উপযুক্ত নথি সংসদের অধ্যক্ষকে দিতে হয়। কিন্তু তিনি এর কোনওটিরই ধার ধারেননি। অধ্যক্ষ নিষেধ করা সত্ত্বেও জনসভায় বক্তৃতা করার ঢঙে তিনি বলে যান।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরা ও পাশে বসা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে ‘চোখ মারা’। দেশের নেতা হিসাবে তাঁর এই দুই আচরণই নিন্দনীয়। যার জেরে অধ্যক্ষ সুমিত্রা মহাজনকে দাঁড়িয়ে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করে রাহুলকে সংসদের নিয়ম ও আচরণবিধি মেনে চলার কথা বলতে হয়। রাহুলের বক্তৃতার মাঝে ‘পয়েন্ট অফ অর্ডার’ তোলেন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অনন্ত কুমার।
অন্য নেতাদের অসংসদীয় আচরণ
কংগ্রেসের সংসদীয় নেতা এখন মল্লিকার্জুন খড়গে। প্রয়োজনীয় আসন তাঁর দলের নেই বলে তিনি বিরেধী দলনেতা হতে পারেননি। তা নিয়ে কংগ্রেসের ক্ষোভ কম নয়। তবে প্রশ্ন হল, বিরোধী নেতা হলে তাঁর এই আচরণ কি শোভন হত? অধ্যক্ষ তাঁর বক্তৃতা চলাকালীন অন্য একজন বক্তার নাম বলতে বাধ্য হন, নতুন বক্তা বলতে শুরু করার পরে তাঁর কোনও কথা রেকর্ড হচ্ছে না জেনেও (নাকি না জেনে!) খড়গে বলে যেতে থাকেন সংসদীয় নীতির তোয়াক্কা না করে।
খড়গের বক্তৃতাও ছিল মূলত অন্তঃসার শূন্য।
প্রধানমন্ত্রী বলার পরে ভোটাভুটি হয়, এটাই রীতি। তারপরেও বলতে ওঠেন তেলুগুদেশমের এক নেতা। তিনি অধ্যক্ষকে পরোয়া না করে যে আচরণ করছিলেন, তাকে সার্কাসের জোকারের সঙ্গে তুলনা করলেও তাঁর সম্বন্ধে কম বলা হয়। তাঁকে কোনও ভাবে থামাতে না পেরে অধ্যক্ষ ভোটাভুটি পর্ব শুরু করে দেন।
আমুলের বিজ্ঞাপনে রাহুলের জড়িয়ে ধরা ও চোখমারা একসঙ্গে
সংসদ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে রসিকতা। উল্টে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার সময় দীর্ঘক্ষণ ধরে পিএম শেম শেম স্লোগান শোনা গেল বিরোধীদের মধ্যে থেকে, মিলিত ভাবে।
প্রধানমন্ত্রীর জবাব!
প্রধানমন্ত্রী যে বাগ্মী, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য রাহুল গান্ধীর তাড়াহুড়ো নিয়ে তিনি এমন অঙ্গভঙ্গি করেন, যা প্রধানমন্ত্রী পদের পক্ষে মানানসই নয়। ২০১৪ সালে সংসদে প্রথমবার বক্তৃতা করতে উঠে তিনি অধ্যক্ষকে সম্বোধন না করে বারে বারে ভাইয়োঁ ঔর বহেনোঁ বলার পরে অনেকেই বলেছিলেন, এতদিন ভোটপ্রচার করার অভ্যাস কাটিয়ে উঠতে পারেননি নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু চার বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলানোর পরে তাঁর এই আচরণ মানানসই নয়।
উঠ উঠ উঠ... নিজের আসনে দাঁড়িয়ে রাহুল গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাসনা নিয়ে ব্যঙ্গ করছেন প্রধানমন্ত্রী
রাহুলের অপিরণত বক্তৃতার জেরে দুই দেশকে বিবৃতি দিতে হয়েছে। এ কথা বলার সময় তাঁর মধ্যে যে বিরক্তি ও দায়িত্ববোধ ও শাসন ছিল, রাহুলের ‘চোখ মারা’ প্রসঙ্গে বলার সময় তাঁর সেই ব্যক্তিত্ব ছিল না, বরং তা ছিল ব্যঙ্গে ভরা।
রাহুল গান্ধীর চোখ মারা নিয়ে ব্যঙ্গ করছেন প্রধানমন্ত্রী, সংসদে নিজের আসনে থেকে
রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে বিজেপি যে স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিস এনেছে তা সঙ্গত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে যে অঙ্গভঙ্গি করেছেন তা ওই পদে থেকে মানায় না। তাঁর ক্ষুরধার বক্তৃতা, যুক্তি, বালখিল্য আচরণের জন্য ভর্ৎসনা করা—সবই ম্লান করে দিয়েছেন তিনি নিজেই। সংসদ ভবন জনসভা নয়, ব্যঙ্গবিদ্রুপের স্থান নয়, তার সম্মান আছে তা ভুলে যাচ্ছেন সাংসদরা। এটা দেশের পক্ষে চিন্তার। তাঁদের এই আচরণ সারা দেশ দেখছে, সারা বিশ্ব দেখছে।
আমরা ইউরোপের নেতাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহী, তাঁদের সংসদীয় জীবনও দেখা উচিৎ। আমাদের দেশের নেতাদের, আইন প্রণেতাদের অজ্ঞতা ও সংসদকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে শেখা উচিৎ।

