মৃত্যু হলে শুধুমাত্র তখনই প্রতিবাদ? প্রশ্ন উঠছে সাংবাদিকদের চেতনা নিয়েও

সমাজ, মন ও জীবনের ব্যবচ্ছেদ করেন বলেই প্রবল চাপ ভিতর ও বাইরে

 |  4-minute read |   16-06-2018
  • Total Shares

সাংবাদিকতা একটা আন্দোলন। এটা যেমন ঠিক, তেমন প্রশ্ন হচ্ছে সাংবাদিক চরিত্রে কোনও ভৌগোলিক সীমারেখা নাকি থাকে না। কমিউনিস্টদের অনেক সময় একটি দাবি করে থাকেন, তা নিয়ে বিতর্ক আছে যে তিনি আগে কমিউনিস্ট, তার পরে তিনি কোনও দেশের নাগরিক। সাংবাদিকও কি তাই যে তিনি আগে সাংবাদিক পরে দেশের নাগরিক? এই বিতর্ক চিরকালীন এবং এই বিতর্ক শাশ্বত।

সাংবাদিকতা যে হেতু এটা একটা আন্দোলন, যে হেতু তাঁরা সমাজের ব্যবচ্ছেদ করেন, যে হেতু তাঁরা ব্যক্তি জীবনের ব্যবচ্ছেদ করেন, যে হেতু তাঁরা মনঃস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ করেন, যে হেতু তাঁরা শরীরী ভাষার ব্যবচ্ছেদ করেন সেই জন্য তাঁদের সীমারেখা নির্ধারণ করা নিয়ে সীমারেখা বিশ্বব্যাপী।

সম্প্রতি শুজাদ বুখারির মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্ন হল এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি কাশ্মীরের সঙ্গে জুড়ে দেখতে হবে, সেখানকার স্থানীয় বিষয়ের মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে নাকি তার সঙ্গে গৌরী লঙ্কেশের মৃত্যু বা ত্রিপুরার সাংবাদিক শান্তনু ভৌমিকের ঘটনা জুড়তে হবে? সাংবাদিকতা একটা আন্দোলন, এই পেশায় ব্যবচ্ছেদের অধিকার আছে, তাই যেখানে যে ক্ষমতাশালী – রাজনৈতিক ভাবে হোক, অসামাজিক কাজকর্মের মধ্য দিয়ে হোক, বা কর্পোরেট জগতের হোক – তার সব সময়ই একটা চেষ্টা থাকে যে সাংবাদিক এবং সাংবাদিক সত্ত্বা এবং সাংবাদিক পেশার উপরে একটা নিয়ন্ত্রণ রাখবার।

body1_061618052346.jpgশুজাত বুখারির ছবি, ফেসবুক থেকে

কোনও কোনও সময় এই নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ভয় দেখানোর পর্যায়ে। কখনও রাজনৈতিক দলগুলো ভয় দেখায়, কর্পোটের দিক থেকে ব্যবসায়িক জগতের লোকেরা ভয় দেখায়, অথবা শুজাত বুখারির ক্ষেত্রে সেখানে আমরা বলতে পারি যে দেশদ্রোহীরা ভয় দেখায়। কারণ তারা সেখানে শক্তিশালী। শুজাত কী লিখলেন বা কী লিখলেন না, গৌরী লঙ্কেশ কী লিখলেন বা কী লিখলেন না এটা আসল কথা নয়, আসল কথা হল, একজন স্বাধীনচেতা মানসিকতাকে গলা টিপে ধরার এটা একটা কৌশল। সেটা যদি আমরা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ধরি, বা অন্য কোনও রাজ্যের ক্ষেত্রে ধরি, তা হলেও দেখব যে, যে সব জায়গা তথাকথিত ভাবে শান্তির জায়গা (কাশ্মীর তো peace zone বা শান্তির জায়গা নয়, সেটি এখন ওয়ার জোন), সেই শান্তির জায়গাতেও যে সাংবাদিকরা শান্তিতে আছেন, এ রকম ভাবার কোনও কারণ নেই।

মৃত্যু হলে তবেই গর্জে উঠতে হবে, তা কিন্তু নয়, মৃত্যু ছাড়াও যদি সাংবাদিকের কলমকে আটকে রাখা হয়, তা হলে সেটিও সাংবাদিকের কাছে মৃত্যুর সামিল। আমরা পড়শি দেশ বাংলাদেশে বার বার দেখছি যে যখনই কেউ স্বাধীন ভাবে ভাবার চেষ্টা করছেন, তখনই তাঁর কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। যখন মৃত্যুর মাধ্যমে হচ্ছে, তখন সেটি প্রকাশ্যে আসছে। কিন্তু মৃত্যুর মাধ্যমে না হলেও তাঁর কলমকে আটকে রাখার যে প্রবণতা বিভিন্ন রাজ্যে দেখা যাচ্ছে, তা কিন্তু সাংবাদিকের মৃত্যুর সঙ্গে তুলনীয় নয়?

body2_061618052428.jpgসাংবাদিক শুজাত বুখারির শেষযাত্রায় মানুষের ঢল

মৃত্যু হলে আমরা গর্জে উঠি, অন্য সময় নিজেরা গুমরে মরি। বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ, কাশ্মীর থেকে কর্নাটক, এমনকী হোয়াইট হাউসে পর্যন্ত! হোয়াইট হাউসে কিছুদিন আগে এক দল সাংবাদিককে বের করে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অফিস থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল এই সাংবাদিকরা ঢুকবেন এই এই সাংবাদিকরা ঢুকতে পারবেন না। তা হলে সেটি কী? সেটিও তো সাংবাদিক সত্ত্বার কণ্ঠরোধ, মৃত্যুর সঙ্গে তুলনীয়!

গাজা ভূখণ্ডে গিয়ে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মৃত্যু হচ্ছে বা আফগানিস্তানে গিয়ে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মৃত্যু হচ্ছে বা একই কারণে সিরিয়াতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে বা শ্রীনগরের মাটিতে সংঘর্ষের সময় দু’দলের মাঝে পড়ে মৃত্যু হচ্ছে সেটা আলাদা বিষয়। পশ্চিমবঙ্গে তো সেই সংঘর্ষ নেই। এই রকম পরিস্থিতি তো বাংলাদেশেও নেই আবার হোয়াইট হাউসে তো নেই-ই। এখানে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরা কী অবস্থার মধ্যে কাজ করছেন? এ নিয়ে ভাবারও দরকার হয়ে পড়েছে। মৃত্যু হলে গর্জে উঠব আর অন্য ক্ষেত্রে সব কিছু মেনে নেব -- এটা যদি সাংবাদিকদের বেঁচে থাকার শর্ত হয়, তা হলে বলতে হবে সাংবাদিকরা সারা বিশ্বে কোথাও আর জীবিত নেই। কোনও না কোনও জায়গায় কোনও না কোনও চাপের অধীনে রয়েছে। তার স্বাধীনতা কোনও না কোনও জায়গায় খর্ব হয়েছে।

body4_061618052459.jpgবুখারির মৃত্যুতে প্রতিবাদ কলকাতা শহরেও। ছবি: সুবীর হালদার

অসির চেয়ে কলম শক্তিশালী, এই কথাটা আমরা লেখবার জন্য বা সাংবাদিকতার পাঠ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে থাকি। বাস্তবে কলম তো মসিশূন্য হয়ে থাকছে। দিনের শেষে যখন সাংবাদিকরা তাঁদের বেদনার কথা সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন, তখন তাঁদের কথা কেউ শুনতে পাচ্ছেন না। সেটা গুমরে মরছে।

শুজাতকে হত্যা করার কারণ হল, শ্রীনগর উপত্যকায় যে সব সাংবাদিক বুক চিতিয়ে কাজ করছেন বা করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের সন্ত্রস্ত করে দেওয়া। ভয় পাইয়ে দেওয়ার পন্থা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম। কোথাও হয়তো কোনও ভাবে শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে কব্জায় রাখার চেষ্টা করা হল, এমনটা হয়ে থাকে। সামগ্রিক ভাবে এ নিয়েও ভাবা উচিৎ। এখন সাংবাদিকতা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রসারিত, এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াও বাদ নেই। এখন সোশ্যাল মিডিয়া শক্তিশালী। তার পরেও মূলস্রোতের গণমাধ্যমে অনেক সংবাদই চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় ক্ষমতাশালী পক্ষের দ্বারা। কী ভাবে এর মোকাবিলা করব, সেটাও ভাবা দরকার। যাঁরা সংবাদ প্রকাশে বাধা দিচ্ছেন তাঁরাও বুঝতে পারছেন যে সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

body3_061618052609.jpgছবি: সুবীর হালদার

এর ফল সুদূরপ্রাসী। কারণ ১৬ জুন ২০৬৮ সালে যিনি আজকের ঘটনা নিয়ে গবেষণা করবেন, তাঁর কাছে এ দিনের অনেক প্রকৃত ঘটনাই অজানা রয়ে যাবে। কারণ তাঁকে জানতে দেওয়া হল না। এখনকার পাঠকের পাশাপাশি ভবিষ্যতের পাঠকদেরও একই ভাবে বঞ্চিত করা হল। নষ্ট করা হল গবেষণার রসদ।

cctv_061618052746.jpgসিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া আততায়ীর ছবি প্রকাশ করেছে পুলিশ

সাংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের সমস্যায় পড়তে হয়। সংবাদপত্রে খবর প্রকাশের চেয়ে সেই খবর নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করার প্রবণতাই বেশি। তার ফলে সাংবাদিকরাও পেশাগত ভাবে ভিতর-বাইরে দুদিকেই সমস্যার মধ্যে রয়েছেন।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

PRASENJIT BAKSI PRASENJIT BAKSI @baksister

The writer is a veteran journalist.

Comment