পিতামহ ফিরোজ গান্ধীর থেকে ঠিক কী শিক্ষা নিতে পারেন রাহুল?

কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচন নিয়ে বিজেপির ব্যাখ্যা ভুল

 |  4-minute read |   29-12-2017
  • Total Shares

২০ শতাংশ ভারতীয়র তোষামোদ করার চেয়ে ৮০ শতাংশ ভারতীয়র মন জয় করা নির্বাচনী কৌশল হিসেবে বেশি কার্যকর - রাজনীতিতে ১৩ বছর কাটানোর পর কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী কি এই সার সত্যটা বুঝতে পেরেছেন?

যদি বুঝে থাকেন তাহলে ধরে নিতে হবে যে প্রায় তিন দশক পর বড়সড় পরিবর্তন আসতে চলেছে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারে। সেই ১৯৮৬ সালে রাহুলের বাবা রাজীব সংসদে তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে শাহ বানো মামলার সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক মামলা বদলে দিয়েছিলেন। শাহ বানোর স্বামী তিন তালাক প্রথায় তার সাথে বিচ্ছেদ ঘোষণা করায় রাতারাতি গৃহহীন ও সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়েছিলেন এই মুসলমান মহিলা। রাজীবের এই আচরণে কংগ্রেসের কাছে মুসলিম ভোট ব্যাঙ্কের গুরুত্ব গোটা দেশের কাছে স্পষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। এই মুসলিম তোষামোদের ফলে দেশের ধর্মনিরপক্ষেতার বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।এই ঘটনার জেরে পরের দশকে বিজেপি ভারতবর্ষে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল।

body_122917032039.jpg

সংসদ কোনও কারণে রাজীবকে দেখলে হিন্দু কম পার্সি বেশি মনে হত। রাজীবের বাবা ফিরোজ গান্ধী একজন অসাধারণ সাংসদ ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি বিরোধী নেতার ভূমিকা পালন করেন তাও এমন একটা সময় সংসদে কংগ্রেসের খুব একটা বিরোধী ছিল না। ১৯৬০-এ মাত্র ৪৮ বছর বয়েসে (রাজীবের বয়স তখন মাত্র ১৬) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অসাধারণ অথচ সর্বদাই প্রচারের আলোর বাইরে থাকা সাংসদ হারাল।রাহুলের উচিত তার পিতামহ ফিরোজের দেখানো পথে চলা। ফিরোজ 'অনেহরু' ছিলেন যিনি সর্বদাই দেশাত্মবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ছিলেন।কংগ্রেসের বর্তমান মতাদর্শের সঙ্গে তিনি কোনওদিন আপোষ করেননি।

বিজেপি কিন্তু রাহুলের এই নয়া রাজনৈতিক কৌশলের একেবারে ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। তারা গোটা গুজরাট নির্বাচনে রাহুলকে আতঙ্ক (যা তিনি সত্যি সত্যি হয়ে উঠেছিলেন) হিসেবে প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করে গেছে, উন্নয়নের উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ না করে। এদিকে রাহুলও যথেষ্ট দৃঢ়চেতা ছিলেন। এই চারিত্রিক দৃঢ়তা কিছুটা তিনি তার মা সোনিয়ার থেকে পেয়েছেন। ১৬ বছর বয়েসে সোনিয়ার বাবা স্তেফানো মাইনো সোনিয়াকে ইংরেজি শিখতে ও নিজের  পায়ে দাঁড়াতে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দেন। সেই কঠিন দিনগুলো দৃঢ়চেতা করে তোলে সোনিয়াকে। এর পর কেমব্রিজশায়ারের একটি রেস্তোরায় রাজীবের সঙ্গে আলাপ এবং প্রেম পরিণয় শুরু।

body1_122917032131.jpg

রাজীবকে দেখতে যেমন লাগত তার চেয়ে অনেকটাই বেশি কঠোর ছিলেন তিনি। ১৯৮৭ সালে একটি সাংবাদিক বৈঠকে তিনি যে ভাবে তৎকালীন বিদেশসচিব এপি বেঙ্কটেশ্বরণকে বরখাস্ত করেছিলেন, দেশের বহু প্রাক্তন আমলাই তাকে "নির্দয়" হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। যদি নরেন্দ্র মোদী যদি এখন জনসমক্ষে দেশের বিদেশসচিবকে (যেমন এস জয়শঙ্কর) অপমান করে তাহলে অনিবার্য কারণেই সংবাদমাধ্যম বিরোধিতা করবেন।

রাহুলের পথ খুব একটা মসৃণ না হলেও দু'টি কারণে তিনি ভাগ্যবান হয়ে যেতেই পারেন। প্রথমত, ২০১৮ সালে ৮টি রাজ্যে (কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও মিজোরাম) বিধানসভা নির্বাচন। এর মধ্যে কর্নাটকে কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা প্রবল। রাজস্থানেও বিজেপিকে পরাস্ত করে সরকার গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে কংগ্রেসের। তার মানে ২০১৮র আগে কংগ্রেসের দখলে পঞ্জাব,কর্ণাটক ও রাজস্থানের মতো তিনটে বড় রাজ্য ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটা ছোট ছোট রাজ্য চলে আসতে পারে। কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর পুরো কৃতিত্বটাই রাহুল পাবেন। কেউই তাঁর কৃতিত্বকে খাটো করতে পারবেন না।

ভাগ্য বিজেপির নিজেদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বও রাহুলের ভাগ্য ফেরাতে পারে। গ্রামাঞ্চলের ভোটাররা যদি গুজরাটের গ্রামাঞ্চলের পথে হাঁটেন তাহলে ২০১৯এর লোকসভা নির্বাচনে বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে বিজেপিকে।

টু-জি দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই আদালতের রায় এমনিতেই বিজেপির ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই মামলায় বিজেপির আইনমন্ত্রী (যার অধীনে দেশের বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি কাজ করেন) ও অর্থমন্ত্রী (যার অধীনে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ও রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স কাজ করেন) যে ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন তার কোনও ক্ষমা নেই।

শেষ সাড়ে তিন বছর ধরে মোদী সরকার বেশ কয়েকটা ভাল কাজ করেছেন। যেমন মুদ্রা (MUDRA) ব্যাঙ্ক। যা কয়েক লক্ষ ব্যবসায়ীদের সাহায্য করেছে।

আরও বেশ কিছু প্রকল্প দেশের ভর্তুকি প্রদান ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কিন্তু সরকার বেশ কয়েকটা শিশুসুলভ ভুলও করেছেন। আমলারা এখনও সব ব্যাপারে দীর্ঘসূত্রী এবং বিভ্রান্ত করে চলেছেন। অর্থমন্ত্রক যেমন পাঁচ মাস ধরে ওয়ান রাঙ্ক ওয়ান পেনশন প্রকল্প ঝুলিয়ে রেখেছিল। তারপর প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পর্রিকর যখন এই প্রকল্প চালুর প্রক্রিয়া শুরু করলেন ততদিনে সেনাবাহিনীর মধ্যে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে দেশের বিজেপি সরকার।

body2_122917032153.jpg

জোট

মোদীর ভাগ্য আর একটি বিষয় নির্ধারণ করে দিতে পারে। ২০১৯ এ তাঁকে একটি জাতীয় মহাজোটের মোকাবিলা করতে হবে যে জোটে দুর্নীতি পরায়ণ, সাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদ ও জাতপাতবাদী দলগুলো থাকবে। কংগ্রেস এই জোট কে নেতৃত্ব দেবেন যে জোটে বামপন্থী, তৃণমূল, এসপি, বিএসপি, আরজেডি, এনসিপি, এআইএমএম এবং এনসির মত দলগুলো শরিক হবে। কিন্তু সীতারাম ইয়েচুরি, মুলায়ম সিং যাদব, মায়াবতী, লালু প্রসাদ, আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, শরদ পাওয়ার ও ওমর আব্দুল্লার রাজনীতি ২০১৪ তে প্রত্যাখ্যান করেছিল ভারত। এবং, খুব সম্ভবত, ২০১৯এ ও করবে। এদের মিশ্রণ ২০১৯এ রাহুলের স্বপ্নের সলতে পাঁকাতে দেবে নাকি দেবে না। মোদী তা খুব ভালোভাবেই জানেন।

মোদী এ ও খুব ভাল করেই জানেন যে ঘণ্টা বাজার সময় আসন্ন। গুজরাটের পর রাজনৈতিক গতি বাড়াবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর উচিত সুশাসনের দিকে মনোনিবেশ করা। অযৌক্তিক কর মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অহেতুক নাক গলিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

মোদীর তো শিরে সংক্রান্তি, ২০১৯ এর প্রচার শুরুর তো এক বছরও বাকি নেই।

(সৌজন্যে: মেল টুডে)

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

MINHAZ MERCHANT MINHAZ MERCHANT @minhazmerchant

Biographer of Rajiv Gandhi and Aditya Birla. Ex-TOI & India Today. Media group chairman and editor. Author: The New Clash of Civilizations

Comment