স্বস্তিতে নেই বাংলাদেশ, আট মাসে ১৫টি হত্যাকাণ্ড-সহ ১৬৩টি অপরাধে জড়িয়েছে রোহিঙ্গারা

জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে ভারত-বাংলাদেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে

 |  5-minute read |   22-04-2018
  • Total Shares

রোহিঙ্গাদের নিয়ে এখন আর স্বস্তিতে নেই বাংলাদেশ। খাদ্য-বাসস্থানের সংস্থান আর তাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর ইস্যুতে বাংলাদেশের মাথাব্যথার বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরেই স্পষ্ট। হঠাৎ একটি নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে যে মানবিকতা বাংলাদেশ দেখেয়েছিল, তা এখন গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়েই দেখা দিয়েছে, এ কথা বলতে এখন আর দ্বিধা নেই।

এরই মধ্যে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে রোহিঙ্গা নিয়ে আতঙ্কিত হবার মতই আরও একটি সংবাদ।

সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যম খবর দিয়েছে, আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকরা গত আট মাসে ১৫টি হত্যাকাণ্ড-সহ মোট ১৬৩টি অপরাধে জড়িয়েছে বলে হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। খুনের পাশাপাশি ধর্ষণ, অপহরণ, চোরাচালান, ডাকাতির প্রস্তুতির মতো অপরাধও রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ১২টি অস্ত্র মামলা, ৫৮টি মাদক সংক্রান্ত, দুটি ধর্ষণ সংক্রান্ত, ৪০টি মামলা রয়েছে ফরেন অ্যাক্টে, চোরাচালানে পাঁচটি, চুরি সংক্রান্ত একটি, ডাকাতি প্রস্তুতির পাঁচটি, অপহরণ তিনটি এবং অন্যান্য ২২টি। এসব ঘটনায় করা মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩৩৬ রোহিঙ্গাকে।

কয়েক দশক ধরে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া চার লক্ষের মতো রোহিঙ্গার অপরাধ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের। এই রোহিঙ্গাদের অনেকে জালিয়াতি করে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছিল বিভিন্ন সময়।

body4_042218035932.jpgকক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া চার লক্ষের রোহিঙ্গার অপরাধ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী [ছবি: রোহেত আলী রাজিব]

body3_042218040159.jpgমিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১১ লাখ দুই হাজার ৩৭২ জন রোহিঙ্গা এসেছে [ছবি: রোহেত আলী রাজিব]

body5_042218040438.jpgভিটেমাটিহারা উদ্বাস্তুরা অপরাধী চক্রের শিকার হতে পারেন বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে [ছবি: শাহজাহান চৌধুরী সাহিন]

এরপর গত বছরের অগস্টে রাখাইন প্রদেশে সেনা অভিযান শুরুর পর আরও সাত লক্ষ রোহিঙ্গা যোগ হয় বাংলাদেশে। সব শরণার্থীই রয়েছেন সীমান্ত জেলা কক্সবাজারে।

ভিটেমাটিহারা হয়ে দেশছাড়া এই উদ্বাস্তুরা অপরাধী চক্রের সহজ শিকার হতে পারেন বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন বিভিন্ন সময়।

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১১ লাখ দুই হাজার ৩৭২ জন রোহিঙ্গা এসেছে। এর মধ্যে ১১ লাখ দুই হাজার ২৬৪ জনের নাম নিবন্ধন করা হয়েছে।

বৌদ্ধপ্রধান দেশ মিয়ানমার থেকে উৎখাত হওয়ার মুসলিম রোহিঙ্গাদের জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে নানা সময় বিভিন্ন মহল থেকে। বিভিন্ন মোড়কে এরা সন্ত্রাসবাদে জড়িত বলেও খবর এসেছে গণমাধ্যমে।

কিছুদিন আগে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুর রশিদ ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও ভারত-সহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রোহিঙ্গা ইস্যু সৃষ্টি করেছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। তিনি দাবি করেছিলেন, আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) একটি সন্ত্রাসী (মিলিট্যান্ট) সংগঠন। তারা আইএসআইয়ের সহায়তায় আরাকানে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিপক্ষ দেশগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত আরাকানের সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে রোহিঙ্গা ইস্যু সৃষ্টি করেছে আইএসআই।

জেনারেল রশিদ তখন বলেছিলেন, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে পাকিস্তান ভারত ও বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে সক্রিয় রয়েছে। তারা রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

body2_042218040710.jpgবাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ছাপিয়ে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা এখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রবেশ করছে [ছবি: রোহেত আলী রাজিব]

body_042218040955.jpgখাদ্যসহ বিভিন্ন ত্রাণ-সামগ্রী পাঠিয়ে ভারত সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল বাংলাদেশকে [ছবি: শাহজাহান চৌধুরী সাহিন]

body1_042218041119.jpgরোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে [ছবি: শাহজাহান চৌধুরী সাহিন]

শুধু বাংলাদেশ নয়, রোহিঙ্গা ইস্যু ভারতকেও নাড়া দিয়েছে। সেখানেও চল্লিশ হাজারের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে এবং তারা ভারতের' নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি' বলেও দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। যা সেখানের উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

দিল্লির অভিযোগেও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই কিংবা জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের সঙ্গেও এই রোহিঙ্গাদের অনেকের যোগসাজশ গড়ে উঠার দাবি করা হয়েছে।

এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে পরিস্কার ভাবেই বলা যায়, শুধু ভারতে অবস্থানরত ৪০ হাজার রোহিঙ্গায় সেদেশের জন্য হুমকি নয়, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারাও ভারতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ছাপিয়ে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা এখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ দিনদিন দুদেশের জন্যই রোহিঙ্গা ইস্যু ভয়াবহ সমস্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

নতুন করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশের শুরুতেই মানবিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত। খাদ্যসহ বিভিন্ন ত্রাণ-সামগ্রী পাঠিয়ে ভারত সরকার তাৎক্ষণিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল। তবে প্রথম থেকেই ভারতের কাছে বাংলাদেশের মুখ্য দাবি ছিল, মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করার। ভারত তখন কূটনৈতিক পথে হাঁটায়, মিয়ানমার তখন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে না নেওয়ার ব্যাপারে কড়া অবস্থান নেয়। বাংলাদেশ মনে করে, ভারত তখন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে না নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন অবস্থান নিয়ে আর্ন্তজাতিক চাপ বাড়ালে এতদিনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে যেত।

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পরম বন্ধু হিসাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত। পশ্চিমবঙ্গে এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সর্বাত্মক সহায়তা, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনায় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান এবং মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে ভারতীয় সৈন্যদের সহায়তা যুদ্ধে জয়লাভকে ত্বরান্বিত করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে বন্ধু হিসেবে পাশে থেকেছে বাংলাদেশ। বিপদে-আপদে প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় দিয়ে সব সময়ই এদেশের মানুষের ভালবাসা অর্জন করেছে।

এই মুহূর্তে একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার পযবেক্ষণ, রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন যে অবস্থার সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তা দিন দিন হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা দু’দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুকে নীতিগত ভাবে খুব কাছাকাছি রাখে সব সময়। সঙ্গত ভাবেই বাংলাদেশের জন্য যে বিষয়টি হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে সেটি ভারতের জন্যও হুমকি হওয়াটাই স্বাভাবিক

একজন ভারতবন্ধু বাংলাদেশি হিসাবে তাই দাবি করতেই পারি, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ-নিরাপত্তাশৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনও ছাড় না দিয়ে ভারত-বাংলাদেশকে এখন থেকেই একটি যৌক্তিক সমাধানের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SAHIDUL HASAN KHOKON SAHIDUL HASAN KHOKON @hasankhokonsahi

Bangladesh Correspondent, TV Today.

Comment